১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার ১১:৫৯:৫৬ এএম
সর্বশেষ:

০৬ ডিসেম্বর ২০১৭ ১১:০৮:৩২ পিএম বুধবার     Print this E-mail this

অদম্য প্রতিবাদী কিশোরী শারমিন

সাইমুন রহমান এলিট, গলাচিপা
বাংলার চোখ
 অদম্য প্রতিবাদী কিশোরী শারমিন

অপরাজিতা শারমিন। সামাজিক শত প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেনি।  একদিকে করেছেন প্রতিবাদ। অপরদিকে চালিয়ে গেছেন পড়াশুনা। অদম্য এ প্রতিবাদী কিশোরী গলাচিপার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চরকাজল ইউনিয়নের চরকপালভেড়া গ্রামে তার বাড়ি। দুই বোন এক ভাই। ভাই-বোনের মধ্যে শারমিন সবার বড়। কৃষক পিতা হারেচ রাঢ়ী মা গৃহিণী আকলিমার ঘরে তার জন্ম। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের ভালোই কাটছিল। গোল বাধে ২০০০ সালে দাদা রশিদ রাঢ়ী মৃত্যুর পরই। দাদা মৃত্যুর পর যৌথ সংসার আলাদা হয়ে যায়। হারেচ রাঢ়ী ও তার বড় ভাই রাজ্জাক রাঢ়ীর মধ্যে জমি জমার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় শালিস দরবার হলেও কোন নিষ্পত্তি হয়নি। এই বিরোধের জের ধরে বড় চাচার ছেলে মিজানুর শারমিনকে প্রতিনিয়ত উত্যক্ত করতে থাকে। টানা পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন কুপ্রস্তব দিয়ে যাচ্ছে তাকে।  শারমিনকে প্রতিদিন উত্যক্ত করাই যেন মিজানুরের নিত্য-নৈমিত্তিক কাজ হয়ে দাড়িয়েছে। এ নিয়ে চাচা রাজ্জাক রাঢ়ী বা স্থানীয় গন্যমান্যদের কাছে অভিযোগ করেও কোন লাভ  হচ্ছে না। উল্টো মিজানুর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মিজানুরকে পিছন থেকে মদদ জোগাচ্ছে বাবা রাজ্জাক রাঢ়ী ও ভগ্নিপতি মাসুদ খান। এমন অভিযোগ শারমিনের।
আলাপচারিতায় শারমিন জানায়, রাস্তায় হাত ধরে-ওড়না ধরে টান দেয়া, অশ্লিল কথা বলা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ঘটনার পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও কলেজে যেতে পারে না মিজানুরের ভয়ে। এ নিয়ে একাধিকবার গ্রাম্য শালিস বিচার চেয়েও রহস্যহনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে শারমিন ও তার পরিবার।  এলাকার লোকজন মিজানুরের ভয়ে কোন কথা বলতে চায়না।  
শারমিনের মা আকলিমা বেগম জানান, গত ২০১৫ সালে শারমিন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। রসায়ন বিজ্ঞান পরীক্ষার আগের দিন শুক্রবার দুপুরে শারমিন বাড়ির উঠানে ঘোরা ফেরা করছিল। এসময় কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে মিজানুর এসেই শারমিনের গলাটিপে ধরে বেধরক মারধর, এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। এক পর্যায় পেট-বুকের উপর উঠে দাড়িয়ে লাথি মারতে থাকে। বাঁচার জন্য চিৎকার করলে মিজানুর হুমকি দেয়-‘যে ধরতে আসবে তাকে খুন করা হবে’। নির্যাতনে শারমিন পায়খানা-প্রসাব করে দিলেও থামেনি পাষ- মিজানুর।’ তিনি আরও বলেন,  ’এতেও মিজানুর থেমে থাকেনি। শারমিনকে হাত ধরে টেনে ধান ক্ষেতে নেওয়ার চেষ্টা করে।’ এঘটনার পর প্রতিবেশিদের বাধার মুখে আধ মরা শারমিনকে উঠানে ফেলে মিজানুর চলে যায়। শারমিনকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্ের নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম ট্রলারে যাওয়ার সময় একই ট্রলারে মিজানুরও থাকে। ওই সময় মৃত্যুর ভয়ে কুকড়ে যায় শারমিন। ট্রলারেও মিজানুর হুঙ্কার দেয়- ‘গলাচিপা গিয়েও লাভ নেই-ওপারে (বদনাতলী) আমার ভগ্নিপতি বাড়ি। থানা কোর্ট আমাকে কিচ্ছু করতে পারবে না।’ ভয়ে শারমিনকে ভর্তি করা হয় পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে। দীর্ঘ আটদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে জয়ী হয় শারমিন। জ্ঞান ফেরার পর আফসোস বেড়ে যায় এসএসসি পরীক্ষা না দিতে পারায়। অপরদিকে শারমিন বেঁচে আছে এ শান্তনায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় শারমিনের বাবা-মা। সুস্থ হয়ে  গ্রামে ফিরে আসে শারমিন।
শারমিনের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে এলাকার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ব্যবসায়ীসহ সকল স্তরের মানুষ। এ কাজের প্রতিবাদে এলাকাবাসী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করেছে প্রশাসন। এঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে প্রভাবশালীদের প্রভাবে মামলা নেয়নি থানা কর্তৃপক্ষ। এমন অভিযোগ শারমিনের। পরে কোর্টে মামলা করলে জামিনে মুক্ত হয়ে আগের চেয়ে কয়েকগুন মাত্রায় উত্যক্ত শুরু করে।
এসময় বেসরকারি সংস্থা ‘আভাস’ শারমিনকে মানষিকভাবে সহাস ও আইনী সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেয়। এনজিওটির মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় লিডারশিপ ট্রেনিং করায়। সেখানে শারমিন শিখতে-জানতে পারে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী শিক্ষার গুরুত্ব। মনোবল বেড়ে যায় তার। এলাকার ইউথ দলের একজন সদস্য হয় সে।
নিজের মনের মধ্যে চেপে থাকা ক্ষোভ-লজ্জা সামাল দিয়ে পরের বছর আবার (২০১৬) এসএসসি পরীক্ষা দেয়। বিজ্ঞান বিভাগে ৩.৮৩ জিপিএ পেয়ে ভর্তি হন চরকাজল কেআলী কলেজে। এখন আর মিজানুরের ভয়ে থেমে থাকতে হয়নি। নিজের বলিষ্ঠ ভূমিকা দিয়ে কেড়ে নেয় কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ।
এব্যাপারে শারমিন বলেন, ‘ভয়কে আমি জয় করতে শিখেছি। আমি বুঝতে পেরেছি একজন মিজানুরের জন্য আমি থেমে থাকতে পারি না। মনে ভয় তো আছেই। মিজানুর বখাটে হিং¯্র পুরুষ। কেউ আমাকে সহযোগিতা না করলেও আমার এলাকার ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ তো আমার সঙ্গে আছে। তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই আমি মিজানুরের বিচার চাই।’
এদিকে এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে মিমাংসার জন্য গত প্রায় দুসপ্তাহ আগে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউপি চেয়ারম্যান ও মো. সাইদুর রহমান রুবেল মোল্লা ও মো. তোফজ্জেল হোসেন বাবুল মুন্সিসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা শালিস বৈঠকে বসেছেন যা চলমান।
এ বিকষয় জানার জন্য মিজানুরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। তবে এ ঘটনা সম্পর্কে মিজানুরের ভগ্নিপতি মাসুদ খান বলেন, ‘শারমিন ঘটনাটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটেনি। আমি শারমিনকে উত্যক্ত করার জন্য কখনই মিজানুরকে উসকে দেইনি।’
এ প্রসঙ্গে চরকাজল ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান রুবেল মোল্লা বলেন, ‘শারমিনের বাবা হারেচ রাঢ়ীর ও চাচা রাজ্জাক রাঢ়ীর মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে যে বিরোধ শুধু সেটুকই কাগজপত্র দেখে মিমাংসার চেষ্টা করছি। এছাড়া আদালতে যে মামলা রয়েছে তা আইনীভাবে সমাধান হবে।’
এ ব্যাপারে গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা তদন্ত করেছি। ঘটনাটি জমিজমার বিরোধ নিয়ে শুরু হয়েছে। শারমিনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছি।’  
এ প্রসঙ্গে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌছিফ আহম্মেদ বলেন, আমি এ উপজেলায় সদ্য এসেছি। এখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
কার্যালয়
চৌধুরী কমপ্লেক্স, ৫০/এফ, ইনার সার্কুলার (ভিআইপি) রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-৭১২৬৩৬৯
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2017. All rights reserved by Banglar Chokh
Developed by eMythMakers.com
Close