জলে ভাসা ভেনিসে এক দিন
১৮ আগস্ট ২০১৮, শনিবার ০৫:০৩:৪১ এএম
সর্বশেষ:

১৯ জুলাই ২০১৮ ০৩:১৮:৪৫ এএম বৃহস্পতিবার     Print this E-mail this

জলে ভাসা ভেনিসে এক দিন

ইতালি থেকে ইসমাইল হোসেন স্বপন
বাংলার চোখ
 জলে ভাসা ভেনিসে এক দিন

পানির ওপর ভেসে থাকা দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ, তার গা ঘেঁষে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির লেক। পুরো শহরের বুকজুড়ে থাকা পানিতে প্রাসাদের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট, আকাশের মেঘগুলোও লেকের জলে লুটোপুটি খাচ্ছে। ভেনিস ভেনেতো অঞ্চলে আড্রিয়াটিক সাগরের উপর অবস্থিত একটি প্রধান বন্দর এবং একটি জনপ্রিয় পর্যটক আকর্ষণস্থল। শহরটি ১১৮টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত।  রাস্তার বদলে এখানে আছে খাল। আর এই খালগুলো ছোট বড় ৪০০ ব্রীজ দিয়ে সংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া খালগুলো দিয়ে  ভেনিসবাসীরা  চলাচলের জন্য এক-বৈঠাওয়ালা গণ্ডোলা ব্যবহার করে। ভেনেতো অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে আছে ভেরোনা, পাদুয়া এবং ত্রিয়েস্তে। মিলান লোমবার্ডিয়া রাস্তার পাশে ফুটে আছে রক্তাক্ত পপি। গত বছর মে মাসেও ফুটেছিল। এবারও ফুটেছে। গতবার দেখেছিলাম চর্মচক্ষে। এ বছর খবর পাই ক্ষুদে বার্তায়। পলাশ পাঠায় পপির খবর। সেদিন আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ছিল দুপুর থেকে বৃষ্টির সংকেত। তাই বলে সকালটা মোটেও গোমড়া ছিল না। বরং রোদ জ্বলজ্বল হাসিখুশি একটা দিন। ছঁধৎঃড় ফ’ধষঃরহড় নামের ছোট মফস্বলীয় স্টেশন থেকে প্রায় ৪০ মিনিটের যাত্রা ভেনিসের মূল স্টেশন ভেনিস সান্তা লুগিয়ায়। ট্রেনে ওঠার পর প্রথম প্রথম সাধারণ দৃশ্যমালা। ছোট ছোট কটেজ বাড়ি, আঙ্গুর ক্ষেত, রেল লাইনের দুইপাশে পপি আর গোলাপের সারি। ঝকঝকে নীল আকাশ। এরকমই ছিল প্রায় পুরোটা পথ। হঠাৎই দৃশ্য বদল। ১০ বছর আগেও ঢাকা থেকে সাভার যাওয়ার পথে যেমন দেখা যেত পানি, পানি আর পানি। মাঝে মাঝে উঁকি দেয় কিছু কিছু বাড়িঘর। সারা বছরই একটা বন্যার আমেজ। একবারে হুবহু প্রায় সেরকম এলাকা। বিস্তীর্ণ জলাজমি, সমুদ্রের অংশ। একটা কেমন যেন সমুদ্রের ঘ্রাণও যেন পাই। অনেক বড় একটা প্রায় প্রাগৈতিহাসিক ব্রিজ পার হয় আমাদের ট্রেন। পাশ দিয়ে বিলাসবহুল বাস। ব্রিজ পেরোতেই ভেনিসের মূল স্টেশন। আগের দিন রাতে এসে পৌঁছেছি ভেনিস মেস্ত্রেতে। জুরিখ থেকে মিলান হয়ে মেস্ত্রে। কবেকার কোন কৈশোরের কোনো এক গোলাপি রঙা শ্রাবণী বিকেল থেকে আমার ধ্যানে জ্ঞানে ইতালি। ছোটবেলার বন্ধুরা পর্যন্ত জানে আমার ইতালির প্রতি পক্ষপাতের কথা। তো সেই ইতালিতে আগের দিন সন্ধ্যাযাত্রায় তেমনটা চোখে পড়েনি কিছু। আজ সকালে তাই দু’চোখ মেলে যতটা দেখে নেয়া যায়। রেলগাড়ির ঘষা কাঁচ, স্টেশনে মালদিনি চেহারার ফিটফাট পুলিশ। কিছুই নজর এড়ায় না। চোখ খোঁজে পনিটেলের ব্যাজ্জিও। সুন্দর মানুষ, সুন্দর প্রকৃতির ভুবনে ভেনিস আমাদের প্রথম গন্তব্য। সঙ্গী পলাশ ভাই, সারা বিশ্বের মানুষের পরম আগ্রহের শহর ভেনিস, যার কাছে নিতান্তই অফিস বাড়ি। আমার কাছে শেক্সপিয়ারের ভেনিস, পোর্শিয়া আন্তনিও বা সাইলকের ভেনিস আর দূর সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়ে বাণিজ্যে যাওয়া সওদাগরের শহর ভেনিস। ভেনিস নিয়ে অনেক শুনেছি। অনেক কল্পনা। মানুষ কীভাবে থাকে, কীভাবে হাঁটে, কীভাবে চলে, কোনোমতেই মাথায় ঢুকত না। পানির মধ্যে একটা শহর! সেই শহরের মূল স্টেশনটা থেকে বাইরে আসতেই দেখি লোকে লোকারণ্য। আর কোথায় সাইলক, কোথায় পোর্শিয়া? বেশিরভাগই তো দেখি আমার বাংলাদেশের ভাই বেরাদার। আমাদের পুরনো ঢাকা যেমন ৫২ গলি ৫৩ বাজারের শহর। ভেনিসও প্রায় তা-ই। অলিগলি, দোকান, বাজার, পুরনো আদি অকৃত্রিম ছাঁচে যতেœ রেখে দেয়া গায়ে গা লাগানো বাড়িঘর। আর একটা-দু’টো সারি বাড়ির পরই কাকচক্ষু জলের খাল। সমুদ্র থেকে সরাসরি এসে ভেনিস শহর এফোঁড়-ওফোঁড় করে মিলেছে আবার সমুদ্রে। এরকম কয়েকশ’ খাল বা ক্রিকের ফাঁকে ফাঁকেই গড়ে উঠেছে কিংবদন্তির ভেনিস। সেই ভেনিসের পথঘাট ব্যবসা বাণিজ্য প্রায় পুরোটাতেই বাঙালির প্রাধান্য। রাস্তার ধারে রংবেরঙের ফলের দোকান বা ভাসমান মুখোশের টং, জমজমাট ওয়ান স্টপ পিৎজা শপ থেকে বড় বড় হোটেল রেস্টুরেন্ট, সবখানেই বাঙালির পদচারণ। এক ঝলক ভেনিস দেখায় মনে হয় এখানে দু’রকম মানুষ। একরকম বাঙালি আরেকরকম টুরিস্ট। সারা বিশ্ব থেকে টুরিস্ট আসে ভেনিস দেখতে আর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী মানুষ ভেনিস দেখায়। আমরাও সেদিন ভেনিস দেখি। সকাল থেকে গা ভাসানো মিষ্টি রোদ, দুপুরের পর ঝিরঝিরে বৃষ্টি। রোদ বৃষ্টিতে মাখামাখি হয়ে পার হয়ে যাই গলির পর গলি তস্য গলি। ছোট্ট ছোট্ট পুল। কেউ কেউ ৪০০ বছরের পুরনো। খালের ধারে গাছের নিচে অনেকটা জায়গা রেখে একটা পিৎজার দোকান। মালিক দুই বাংলাদেশি ভাই। প্রমাণ সাইজ রিয়েল ইতালিয়ান পিৎজায় লাঞ্চ। বিকেলের আগে এসে পৌঁছনো একটা খোলা চত্বরে। পিয়াৎসা সান্তা মার্কো বা সেন্ট মার্কস স্কয়ার। চারিদিকে অনেক পুরনো রয়্যাল ক্যাসেল টাইপ বিল্ডিং। একটু দূরে একটা বনেদি গির্জা। পুরো চত্বরে ছুটি কাটানো মানুষের হই-হট্টগোল। এর থেকে কিছুটা দূরে এগিয়ে গেলেই সমুদ্র, উদার। ঘাটে বাঁধা একেকটা গোন্ডলা একাই দোলে ঢেউয়ের তালে। মাঝ দরিয়ার ভেতর কিছু একলা বসতবাড়ি। কি জানি কে থাকে, কারা থাকে দূরে পানির ভেতর ওইসব ঘরে। আকাশ থেকে পানি পড়ে, পায়ের নিচে পানি, নিঃসঙ্গ ওই বসত দেখে আমার চোখেও পানি। ভেনিস মেস্ত্রেতে আমাদের তিন দিনের যাপিত জীবনে আমি সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি মানুষের নিঃসঙ্গতা। মাইলের পর মাইল লোক নাই, জন নাই। হঠাৎ পথের ধারে একলা একটা রেস্টুরেন্ট। মনে হয় কোন সুদূর থেকে হঠাৎ মাথা তুলে বের হয়েছে। উঠোনজুড়ে ঝরাপাতার দল। এক বিকেলে ওখানটায় গিয়ে আরেকবার মোচড় দেয় ভেতরটা। অদ্ভুত গাঢ় সবুজ রঙের ধান আর গমের ক্ষেত প্রায় পুরোটা মেস্ত্রে জুড়েই। বরফ গলার পর থেকে আবার বরফ পড়া পর্যন্ত যেটুকু সময় পাওয়া যায় তার মধ্যে তিনটা ফসল উঠবে। ধানগাছ বা গমগাছ তাই সময় পায় খুব কম। চোখের সামনে ধেই ধেই করে বড় হয়ে ওঠে। এইরকম একটা দিগন্তজোড়া ধানের ক্ষেতের কাছে, কুয়ার্তো ডি আলতিনো নামে ছোট্ট একটা রেল স্টেশনের পাশে হাতে গোনা কয়েকটা ভিলা নিয়ে একটা লোকালয়। প্রায় সবগুলো বাড়িই খালি থাকে বেশি সময়। বেশিরভাগই শহুরে লোকের ছুটি কাটানোর ঠিকানা।

এই স্বপ্নের শহর ভেনিস সম্পকে প্রবাসী মেজবাউদ্দিন জানান ভেনিসে এবার পযটকের সংখ্যা অনেক বেশী। মূলত  ভেনিসের আয় দিয়ে অঞ্চলটির খরচ মেটানো হয়। পৃথিবীর সকল দেশ থেকে শহরটি দেখতে আসেন নানা  শ্রেনী পেশার মানুষ।
আমরা সানমারকো ঘুরতে ঘুরতে দেখা মেলে লিমা চৌধুরী নামের এক বাংলাদেশীর। বৃত্তশালীর কন্যা লিমা জানান তিনি এই ভেনিস দেখার জন্যই ঢাকা থেকে এসেছেন। বলেন, ভেনিস না এলে চোখ জুড়ানো এ সৌন্দয থেকে বঞ্চিত হতাম। সুযোগ পেলে রোমেও যাবেন তিনি।
ভেনিসের ইতিহাস বলে জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য এখানে প্রবাসীরা বসতি গড়ে তুলে। পরে লোক সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং পানির উপর গড়ে উঠে এ শহর। সবশেষ জরীপ অনুযায়ী ভেনিসের লোকসংখ্যা ২ লাখ ৬৫ হাজার। এখানে বিভিন্ন ধরণের রেস্টুরেন্ট এবং নানা ধরনের স্যুভেনিরের দোকানগুলো আকরষন করে পরযটকদের।


সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
কার্যালয়
জামান টাওয়ার (৮ম তলা), ৩৭/২ কালভাট রোড, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2018. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close