১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, বুধবার ১১:১৭:৪০ এএম
সর্বশেষ:

২৩ অক্টোবর ২০১৮ ০২:৩৩:১৬ পিএম মঙ্গলবার     Print this E-mail this

গুরুতর অসুস্থ এশিয়ান গেমসের বক্সার মোশারফের খোঁজ রাখে না কেউ

রাজশাহী থেকে সোহরাব হোসেন সৌরভ
বাংলার চোখ
 গুরুতর অসুস্থ এশিয়ান গেমসের বক্সার মোশারফের খোঁজ রাখে না কেউ

কেটে গেছে পাঁচ মাস। কেউ রাখে না খোঁজখবর। তিন তলা ভবনের নিচ তলায় পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে কাটছে দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়ের ওপর ভর করেই চলছে চিকিৎসা আর পরিবারের খরচ। আবেদন করা হয়েছে একাধিক। এখন পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার কোনো আশ্বাস নেই। মৃত্যুর আগে সুস্থ হয়ে খেলার ময়দানে ফেরার আশাটাও ক্রমশই নিভিয়ে যাচ্ছে। আর মাথায় কেবল চিন্তার গতিবেগ বাড়ছে দিনের পর দিন। এসব কিছুর মধ্য দিয়েই বাম দিক অচল হয়ে যাওয়া শরীরটাকে বাড়ির গণ্ডির মধ্যে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছেন দেশের হয়ে এশিয়ান গেমসের বক্সিংয়ে একমাত্র পদক অর্জনকারী মোশারফ হোসেন।
এক সময়ের দাপুটে বক্সার মোশারফ এখন গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মহানগরীর তালাইমারীতে নিজ বাড়িতেই ধুঁকছেন। এক সময় বক্সিংয়ের রিংয়ে যার দু’পায়ে লাফালাফি আর হাত চলেছে অদম্য গতিতে। এখন তার বাম হাত ও বাম পা কাজ করেছে না। কখনও সন্তানদের আবার কখনও সহধর্মিনীর কাঁধে ভর করেই চলাফেরা করতে হচ্ছে। হ্রাস পেয়েছে বাকশক্তিও।

আর্থিক দৈন্যতায় চিকিৎসাও এগোচ্ছে না বললেই চলে। এইভাবে দিনের পর দিন কেটে যাবার কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক পদক অর্জনকারী মোশারফ তার কষ্টের কথা শেয়ার করতেও চান না কারও সাথে। মনঃকষ্ট নিয়ে কেবলি হাজারো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে তার মনে। কিন্ত উত্তরের পাতাটা শূন্যই থেকে যাচ্ছে।
ক্রীড়াজগতে তার প্রবেশ মূলত অ্যাথলেটিক্স দিয়ে। ১৯৭৬ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদানও করেন অ্যাথলেট হিসেবেই। শিক্ষাজীবনে শটপুট ও ডিসকাস ইভেন্ট ছিল তার। কর্মজীবনে নিজের আগ্রহ এবং ওস্তাদ কেরামত আলীর উৎসাহে পা রাখেন বক্সিং জগতে। সাফল্য পেয়ে যান প্রথম বছরেই। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম সেরা বক্সার। একের পর এক স্বর্ণ আর ব্রঞ্জ পদক আর্জন করে ১৯৯০ সালে ক্যারিয়ারের ইতি টানেন এশিয়াড জয়ী দেশের এই একমাত্র বক্সার।
মোশারফের কর্মজীবনের ১৪ বছরের ক্রীড়া জীবনে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ ও ব্রোঞ্চ পদক অর্জন ত্রিশের অধিক। যে পদকগুলো এক সময় আলমারি, ঘরের দেয়াল আর শোকেসে শোভা পেয়েছে। সেইগুলোর এখন ঠাঁই হয়েছে বাজার করা নীল ব্যাগ আর কার্টনের বক্সে। অযতেœ পদকগুলোতেও মরিচা ধরার উপক্রম হয়েছে। মনের কোণে জমাট বাঁধা ক্ষোভ আর দুঃখে এই অর্জনগুলো আর কাউকে দেখাতেও চান না। কৃতিত্বগুলো এক রকম ভুলেই থাকতে চাচ্ছেন তিনি।
মোশারফ বলেন, এ বছরের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ যুব গেমস পরিচালনার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন। ১০ মার্চ ঢাকার হোটেল সামস নূরে অবস্থানকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তার রুমমেট অনুজ তুহিন ও বেশ কয়েকজন সহকর্মী তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করেন। সেখানে আট দিন চিকিৎসার পর বাড়ি ফেরেন। সেই থেকে এখন বাড়িতেই সারাক্ষণ শুয়ে শুয়ে দিন কাটছে তার।
তিনি অনেকটা প্রশ্ন ছুড়েই বলেন, দেশের হয়ে এত অর্জন আজ কোন কাজে লাগছে? নিজে অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিবারের জন্য কিছুই করতে পারছেন না। সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। সন্তানদের মধ্যে মাহাবুব হোসেন সিউল (২৮) বড়। ১৯৮৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত দশম এশিয়ানে সাফল্য অর্জনের পরের বছর ১৮ জুলাই স্ত্রী হনুফা হোসেন লাবনির কোলজুড়ে আসেন মাহবুব।
স্বপ্ন দেখতেন, বড় হয়ে সিউলও বাবার মতোই বক্সার হবে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধী একমাত্র ছেলেকে এখন চলাফেরা করতে হয় হুইলচেয়ারে। বিদেশে নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই তার। তাকে পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে হলে জাপান নয়তো অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা করাতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। যা এখন তার সাধ্যের বাইরে। বড় মেয়ে ডা. মাহমুদা হোসেন (২৬) রাজশাহী মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের ইনচার্জ ও ডায়াবেটিস হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। ছোট্ট মেয়ে মাহাফুজা হোসেন (২০) বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে লেখাপড়া করছেন। মূলত বড় মেয়ের ওপরেই সংসারের পুরো চাপ।
পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাবা ও ভাইয়ের চিকিৎসা এবং ছোট্ট বোনের লেখাপড়ার খরচ তাকেই বহন করতে হচ্ছে। ফলে আর্থিক কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন দেড় হাজার টাকা করে তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। এতে করে হতাশা চেপে বসেছে তার পরিবারে। আর হতাশ নিজেও।
মোশারফের পর এশিয়ান গেমসে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিগত পদক জিততে পারেননি কেউ। দক্ষিণ কোরিয়ার এশিয়ান গেমসের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাস। প্রথম খেলাতে নেপালের এক বক্সারকে মাত্র ৩৮ সেকেন্ডে নকআউট করে সেদিন রেকর্ড গড়েছিলেন। এরপর ব্রোঞ্জ পদক জিতলে ৭২ জন বাংলাদেশি খেলোয়াড় অনেক রাত পর্যন্ত আনন্দ করেন। কোরিয়ার এক পত্রিকা পরদিন তার ছবিসহ বড় একটা প্রতিবেদন ছেপেছিল। এশিয়াডের ব্যক্তিগত ইভেন্টে এটিই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র প্রাপ্তি। তার অর্জনের খাতায় আছে এসএ গেমসেরও স্বর্ণপদক। বাকি চারটি এসএ গেমস খেলায় এ বক্সারের ঝুলিতে আছে একটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জ। জাতীয় বক্সিংয়ে টানা এক দশক দাপট ছিল, সবকটিতেই জিতেছেন স্বর্ণ!
মোশারফ বলেন, সুচিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশন, মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি জায়গায় আবেদন করেছেন আর্থিক সহায়তা পাবার জন্য। কিন্ত এখন পর্যন্ত কোনো দিক থেকে কোনো ধরনের সাড়া পাননি।
দেশকে মুঠোভরে দেয়ার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই বক্সার পেয়েছেন ক্রীড়া পুরস্কার ও জাতীয় পুরস্কার। ঝুলিতে আছে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে একাধিক পুরস্কার। হাল আমলে ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্যের পর ভাগ্য বদলে যায় অ্যাথলেটদের। মোশারফের বেলায় অবশ্য তা ঘটেনি। এ নিয়ে কোনো সময় আফসোস ছিল না। কিন্ত বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে চিকিৎসা-সংক্রান্ত ও পরিবারের ভাবনায় মনের মধ্যে আক্ষেপ কাজ করে। নিজের কাজটা সর্বোচ্চ যতœ দিয়ে করার চেষ্টা করেছেন। বিনিময়ে কী পাবেন সুস্থ থাকা অবস্থায় কখনও তা নিয়ে ভাবেননি। তার বিশ্বাস ছিল চাইতে হবে না, যা পাওয়ার এমনিই পাবেন।
কিন্তু সে বিশ্বাসে এখন না পাওয়ার প্রশ্নই তাড়া করে ফিরছে সর্বক্ষণ। ১৯৯০ সালে খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর নতুন কোনো ‘মোশারফ’ বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। ব্যক্তিগত নৈপূণ্যের ঝলক দেখিয়ে আর কেউ এশিয়ান গেমস থেকে আনতে পারেননি অন্তত একটা পদক। এসব দেখেও খুব আফসোস হয় বক্সার মোশারফের। তার উপলব্ধি, খেলাধুলা করে প্রাপ্য সম্মান জোটেনি। মাঝে মধ্যেই আন্তর্জাতিক গেমস থেকে পাওয়া পদক আর সার্টিফিকেটগুলো নেড়েচেড়ে দেখেন।
এসব দেখে দীর্ঘশ্বাস ঝরে তার। বাবার মতো খেলোয়াড় হতে কখনোই আগ্রহ দেখাননি তার দুই মেয়ে। আর অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে তার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আগামী প্রজন্ম বক্সিং বা অন্য কোনো অ্যাথলেটে আগ্রহ দেখাবে কি না তা নিয়েও সন্দিহান তিনি।





সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মমতাজ বেগম
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2018. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close