২৩ আগস্ট ২০১৯, শুক্রবার ০৫:০২:৩০ পিএম
সর্বশেষ:

১২ আগস্ট ২০১৯ ১২:২৩:৩৭ এএম সোমবার     Print this E-mail this

বিপ্লবী ছাত্রনেতা সাংবাদিক নজরুল সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন

মো. আবু সাইদ খোকন , বরগুনা থেকে
বাংলার চোখ
 বিপ্লবী ছাত্রনেতা সাংবাদিক  নজরুল সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন

মৃত্যুকে শাসাই-বলি, তোর মরে যাওয়া ভাল, যেমন মরেছে সাদা ঘাসের সকল প্রেম। নিজের লেখা কবিতার মত মৃত্যুকে শাসাতে পারেননি। বরং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে, স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে নিজেই একদিন স্বপ্নের দ্রুবতাঁরা হয়ে গেলেন। হা, আমি বরিশাল বিএম কলেজের একজন বিপ্লবী ছাত্রনেতা এবং আপোষহীন সাংবাদিক দৈনিক ইত্তেফাকের বরিশাল সংবাদদাতা নজরুল ইসলামের কথা বলছি। নজরুল একজন ছাত্রনেতা হিসাবে, একজন সাহসী সাংবাদিক হিসাবে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন এবং ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র জনতাকে সংগঠিত করার জন্য, মুক্তির সংগ্রামে সামীল করার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা দক্ষিনাঞ্চল।
 মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তখন জাসদ ছাত্রলীগের জয়জয়কার,সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী চেতনায় তরুণ প্রজম্ম উজ্জীবিত। তারুণ্যের এ হাওয়া দক্ষিনাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও লেগেছিল। এ অঞ্চলের ছাত্র -জনতাকে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী আদর্শে উদ্দীপ্ত করার অন্যতম সংগঠক নজরুল। নজরুলের জন্ম ১৯৫৩ সনের ২৯ জুলাই বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার চাওড়া চন্দ্রা গ্রামের এক রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবারে। বাবা আলী হোসেন হাওলাদার ছিলেন একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং সৌখিন থিয়েটার অভিনেতা।তখনকার সময়ে আমতলীর আর্থ-সামিজক বাস্তবতায় হিন্দু জমিদার,ব্যবসায়ী এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই ছিলেন শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক এবং এ কারনেই শিল্প-সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল হিন্দু প্রভাবিত। এরমধ্যেও আমতলীর যে কজন মুসলিম পরিবারের সদস্য শিল্প-সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন আলী হোসেন হাওলাদার তাদের অন্যতম। তিনি যুক্ত ছিলেন আমতলীর শিল্প সংস্কুতি চর্চার কেন্দ্র বিন্দু নুরজাহান ক্লাব এবং পাকিস্থান আর্টস কাউন্সিলের সাথে। নজরুল ইসলাম ছিলেন বাবা মায়ের ৬ ছেলে এবং ৪ মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। বড় ভাই শাহজাহান তার সাথেই আমতলী একে হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে এইচএসসি পড়ছিল এবং সেজভাই শওকত আলী চুন্নুকে ভর্তি করিয়েছিল বরিশাল বিএম স্কুলে। কিন্তু নজরুল মারা যাওয়ার পর তারা পালিয়ে আসেন। এমনকি তার মামা আনোয়ার হোসেন আকন বিএম কলেজে অর্থনীতি বিভাগে স্মাতক (সম্মান) শ্রেণীতে পড়তেন এবং একই রুমে থাকতেন। সেও বরিশাল শহর ছাড়তে বাধ্য হন এবং এক বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বর্তমানে সে আমতলী সরকারী কলেজে প্রভাষক হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে আছেন। নজরুলের ৩ ভাই এবং ৪ বোন রয়েছে। ৪র্থ ভাই মো: মহসীন বরিশাল বিএম কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেছেন এবং আমতলীতে আইন ব্যবসা করছেন। সে ১৯৯৭-২০০৩ মেয়াদে চাওড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসাবে এবং বরগুনা জেলা বার এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি (আমতলী) দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫ম ভাই মহিউদ্দিন খোকন বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে অনার্স করেছেন। বর্তমানে চাওড়া নিু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। নজরুলের ছোট ভাই এ্যাডভোকেট শাহাবুদ্দিন পাননাও বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করেন। তার পথ ধরেই দৈনিক ইত্তেফাকে আমতলী উপজেলা সংবাদদাতা হিসাবে কাজ করছে এবং যুক্ত ছিলেন The Bangladesh Observer,Bangladesh Sangbad Sangtha-BSS I The Daily Observer`i ei¸bv  বরগুনা জেলা সংবাদদাতা হিসাবে। সে নজরুলের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত নজরুল স্মৃতি সংসদ-এনএসএস এর নির্বাহী পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে। ৪ বোনের মধ্যে হেলেনা বেগম, জাকিয়া আক্তার বুলা, ইসরাত জাহান কানন আমতলীতেই বসবাস করেন।ছোট বোন ফাইজুন নাহার কিসমতও বরিশাল বিএম কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করে বরিশালেই বসবাস করেন। মা রিজিয়া বেগম ৩রা আগস্ট,১৯৯৬ সনে এবং বাবা আলী হোসেন হাওলাদার ৩রা ডিসেম্বর, ২০০০ সনে ইন্তেকাল করেন। নজরুলের শিক্ষা জীবন শুরু হয় পারিবারিক পরিমন্ডল থেকে। প্রাথমিক শিক্ষা পূর্ব পাতাকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৬২ সনে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৬৩ সনে ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হন আমতলী একে হাই স্কুলে। ১৯৬৮ সনে নজরুল আমতলী একে হাই স্কুল থেকে মানবিক শাখায় ৫৯৪ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। শিক্ষা বর্ষ ১৯৬৬-১৯৬৭, রেজি নং ৫৭১৩, রোল নম্বর ছিলবরগুনা-৩৭৮। ২৪ জুলাই ১৯৬৮ সনে ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ট বরিশাল বিএম কলেজে রোল নম্বর ছিল ৬৭৩ সেকশন বি। ১৯৭০ সনে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে ৫৩১ নম্বর পেয়ে  দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাশ করেন রোল নম্বর ছিল বরি- ৯৫১। ১৭ সেপ্টম্বের,১৯৭০ সনে তৎকালীন অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক মজুমদার এবং অর্থনীতি বিভাগের  প্রফেসর পরে বিএম কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হানিফ এর উৎসাহে অর্থনীতি বিভাগে স্মাতক  (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হন। রোল নম্বর ছিল ৬২৮ । ১৯৬৮ সন। তখন গোটা দেশ টালমাটাল। একদিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে ফুসে উঠছে ছাত্র-জনতা অন্যদিকে ১১ দফার ভিত্তিতে জোটবদ্ধ হচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলো। স্কুল জীবন থেকেই আইউব বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও বিএম কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত হয়ে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অসাধারণ বক্তৃতা, সাধারণ জীবন-যাপন এবং অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির  মানুষটি খুব সহজেই সাধারণ ছাত্র এবং নেতাদের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেন। এই অস্থির সময়ে অনুষ্ঠিত হয় বরিশাল বিএম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্থান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারণ স¤পাদক আসম আবদুর রব স্বাক্ষরিত ২৮ ডিসেম্বর ১৯৬৯ তারিখের চিঠিতে ভিপি খান আলতাফ হোসেন ভুলু, জিএস শংকর চন্দ্র কর্মকার এবং এজিএস হিসাবে নজরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেয়া হয় । ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আলতাফ-শংকর- নজরুল প্যানেল নির্বাচিত হন এবং নির্বাচনের পরপরই শংকর চন্দ্র কর্মকার উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গেলে নজরুল জিএস হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে যে প্রগতিশীল অংশ ৬২র  নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত হয়ে স্বাধীনসমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছিলেন বরিশাল এ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্নার নেতৃত্বে নজরুল এই ধারার সাথে যুক্ত হন। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতাকে সংগঠিত করার জন্য তিনি গোটা দক্ষিনাঞ্চল ঘুরে বেড়ান। ১৯৭০ সনের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর পক্ষে তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ।যদিও প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের কারনে উপকুলীয় অঞ্চলে জাতীয় পরিষদের ৯টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ২১টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সনের ১৭ জানুয়ারী। ১৯৭১ সনের মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে ছাত্র জনতাকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে নজরুল সাহসী ভূমিকা রাখেন। সারাদেশের মত একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে বরিশালেও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় বিএম কলেজের ছাত্রদের ভুমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভিতরে ভিতরে সংগঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)বা মুজিব বাহিনী । নজরুল তখন বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত এজিএস এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত জিএস। ছাত্রনেতা আসম ফিরোজ,খান আলতাফ হোসেন ভুলু,এ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্নার সাথে নজরুলও মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বিএম কলেজ থেকে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। একাত্তরের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করা হলেও হঠাৎ করে ১লা মার্চ বেলা ১টায় রেডিওতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে বেলা ২টায় নজরুলের নেতৃত্বেই বিএম কলেজ থেকে প্রথম প্রতিবাদ
মিছিলটি বের হয় । দেশ স্বাধীন হলে অন্যদের মত নজরুলও ক্যা¤পাসে ফিরে আসেন। ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত হয়ে আবার শুরু করেণ ছাত্র রাজনীতি। তখন ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রায় প্রকাশ্য। ১৯৭২ সনের মে মাসেই মূলত ছাত্রলীগ দুভাগ হয়ে যায়। একদিকে সিরাজুল আলম খানের নেতেৃত্বে আসম আবদুর রব এবং শাজাহান সিরাজ অন্যদিকে শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে নুরে আলম সিদ্দিকী
এবং আবদুস কুদ্দুস মাখন। ১৯৭২ সনের ২১-২৩ জুলাই উভয় গ্রুফ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন আহবান করে । রব-সিরাজ গ্রুপ পল্টন ময়দানে এবং নুরে আলম- মাখন গ্রুপ সোহরাওযার্দী উদ্যানে। উভয় গ্রুপের সম্মেলনে প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। যদিও ২১ জুলাই সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সোহরাওযার্দী উদ্যানের সম্মেলন উদ্বোধন করেন । বরিশালের রাজনীতির পালেও এ হাওয়া লাগে। আবদুল বারেক, এনায়েত হোসেন চৌধুরী, ডা: আজিজ রহিম, এ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না ও নজরুল ইসলাম ছাত্রলীগ রব-সিরাজ এ যুক্ত  হন। পরে নজরুল জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৩ সনে নজরুল বরিশাল বিএম কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ থেকে নজরুল-জাফর-রফিক পরিষদে ভিপি নির্বাচন করেন। এ নির্বাচনে নজরুল-জাফর-রফিক প্যানেল বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষনা করতে পারেনি। তবে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের হৃদয়ে নজরুল বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপির জায়গাটি দখল করে নেন। নজরুল-জাফর-রফিক প্যানেলে জিএস পদে নির্বাচন করেন একেএম রফিকুল
ইসলাম জাফর। তারবাড়ি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার বারোগরিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সনে রণাঙ্গনের সাহসী ও বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭৪ সনের ১৭ মার্চ জাসদ কর্তৃক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসুচিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এজিএস পদে নির্বাচন করেন গাজী রফিকউদ্দিন আহমেদ। তার বাড়ি বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলায়। তিনি সরকারী কর্মকর্তা হিসাবে অবসর গ্রহণ করে বর্তমানে আমতলীতে ঔষধ ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত আছেন। ১৯১৭ সনে রুশ বিপ্লব এবং পরবর্তী সময়ে মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেনিন বাদে উজ্জীবিত হয়ে বিশ্বব্যাপী কৃষক শ্রমিক ছাত্র-যুবকরা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বির্নিমানের স্বপ্ন দেখছিল। বন্দুকের নলই সমাজ পরিবর্তনের মূলমন্ত্র ¯ে¬াগান দিয়ে ১৯৪৯ সনে চিনে চেয়ারম্যান মাওসেতুং এর সশস্র
বিপ্লবের তত্ত্ব, কিউবায় ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও চেগুয়েভারার সশস্র বিপ্লব চারু মজুমদার, নকশাল বাড়িআন্দোলন এবং সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী আদর্শ দেশে দেশে কৃষক শ্রমিক ছাত্র-যুবকদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে। লাল বই হয়ে উঠে তাদের নিত্য সঙ্গী। ৯ অক্টোবর,১৯৬৭ সনে
বলিভিয়ার জঙ্গলে বিপ্লবী চেগুয়েভারাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে বিপ্লবী চেগুয়েভারা হয়ে উঠে বিপ্লবী ছাত্র- যুবকদের আইডল। সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে সশস্র বিপ্লবী ছাত্র-যুবকদের বাধভাংগা জোয়ারের মত এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে উনবিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে জর্জ বার্নাডশ একবার
বলেছিলেন, যৌবনে যে প্রেমে পরে না, আর মার্ক্সবাদে দীক্ষা নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে না-দুজনই অস্বাভাবিক। যৌবনে নজরুলও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৬৮ সনে বিএম কলেজে ভর্তি হয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে স¤পৃক্ত হলেও ধীরে ধীরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে যে
প্রগতিশীল অংশ ৬২র  নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত হয়ে সশস্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছিলেন। ১৯৭০ সনে বলাকা ভবনে ছাত্র লীগের যে সভায় স্বপন চৌধুরী
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রস্তাব করছিলেন নজরুলও সে সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং জোরালো ভাবে স্বপন চৌধুরীর প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন। নজরুল সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, জাসদের তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান এবং ৬২,র নিউক্লিয়াসের অন্যতম নেতা কাজী আরেফ আহমেদের অত্যন্ত ঘনিষ্ট ছিলেন এবং তাদের অনুপ্রেরণায় নজরুল সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার
স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এবং মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেনিনবাদে উজ্জীবিত হন। চেয়ারম্যান মাওসেতুং, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, এন্থনী গ্রামসী, হো চি মিন এবং চেগুয়েভারার বিপ্লবী আন্দোলন তাকেও ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে নজরুলের ঘনিষ্ট বন্ধু সদরুল আলম ভূইয়া ছিলেন অত্যন্ত
মেধাবী এবং তাত্বিক নেতা। সদরুলও অর্থনীতি বিভাগে স্মাতক (সম্মান) শ্রেণীতে পড়তেন এবং যতদুর জানা যায় তার বাড়ি ফেনি জেলার দাগনভুইয়া উপজেলায়। সদরুল জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের বরিশাল জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। সমরেশ কুমার মৃধা ছাত্রলীগের বরিশাল জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। রসায়ন বিভাগে স্মাতক (সম্মান) শ্রেণীতে পড়তেন । তার বাড়ি পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলায়। সদরুল প্রচার বিমূখ এবং নিভৃতচারী হলেও তার বিপ্লবী আদর্শ নজরুলকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। নজরুল মনে প্রাণেই বিশ্বাস করতেন দেশ স্বাধীন হলেও বিদ্যমান পুজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় শ্রেণী বৈষম টিকিয়ে রেখে কোনভাবেই কৃষক- শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তি আসবে না। এ প্রক্রিয়ায় রার্ষ্ট্রীয় স¤পদ লুন্ঠন বাড়বে, শোষন বৈষম্য বাড়বে, ধনী আরো ধনী হবে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনেতিক মুক্তির জন্য প্রয়োজন
কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে একটি সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ।তবে নজরুল সশস্র বিপ্লবের পরিবর্তে গণসংগ্রামকে বেশী গুরুত্ব দিতেন । ১৯ শতকের প্রথমার্ধের কবি সাহিত্যিক  L’art pour L’art wKsev Art for Art’s sake  শিল্পদর্শন তুলে ধরেন, Oskar Wild, Arther Simon. Edgar Allan Poe  এর মত ফরাসী ও ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকরা এ শিল্প দর্শন অনুসরণ করলেও নজরুল কখনো এ শিল্প দর্শনে বিশ্বাস করতেন না। মার্কসীয় ভাষায় সংস্কৃতি উপরিকাঠামো (Superstucture)  এবং এন্থনী গ্রামসী, পাবলো নেরুদা, জর্জ বার্ণাডশ, পাবলো পিকাসো, জন লেনন, বব ডিলান, কাজী নজরুল ইসলাম,সত্যজিৎ রায় মৃণাল সেন, মানিক বন্দোাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য , পাওলো ফ্রেইরী, মাইকেল এঞ্জেলো ও নোয়াম
চমস্কিসহ আধুনিক চিন্তাাবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী সাহিত্যিক,সমাজ বিজ্ঞানীদের ভাষায় সংস্কৃতি হচ্ছে সমাজ বদলের অন্যতম হাতিয়ার। নজরুল রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন, বাঙালী জাতির স্বপ্ন ও
মুক্তির আকাঙ্খা তুলে ধরেন। নজরুল অনেকটা পাবলো নেরুদা, মানিক বন্দোপাধ্যায়,কাজী নজরুল ইসলাম এবং সুকান্ত ভট্টাচার্য দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তার লেখা প্রবন্ধ কবিতা বিএম কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আমতলী থেকে প্রকাশিত সৃষ্টি সুখের
উল্লাসে, শোক নয় শক্তির কয়েকটি সংখ্যায় তার কবিতা এবং ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছে । যদিও নজরুলের লেখা ১৮টি গল্প ও কবিতার বই, ১০টি ডায়রীর কোন হদিস পাওযা যায়নি ।নজরুল একাধারে ছাত্রনেতা, সাংবাদিক-সাহিত্যিক। অবসর সময়ে বসতেন হারমোনিয়াম তবলা
নিয়ে। সবাইকে নিয়ে গাইতেন দেশের গান, নজরুল-রবীন্দ্র সঙ্গীত। তার প্রিয় গান জাতীয় সঙ্গীতের পুরোটা, ডিএল রায়ের ধনধান্য পু®পভরা ও কবিগুরু রবীন্ত্রনাথ ঠাকুরের আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার পরে। দরাজ গলায় সবাইকে নিয়ে আবৃত্তি করতেন কারার ঐ লোহ কপাট ভেংগে ফেল কররে লোপাট রক্ত জমাট শিকল পুজার পাষান বেধী, সুকান্তের বিপ্লব ¯পন্দিত বুকে
মনে হয় আমিই লেনিন।ফটোগ্রাফিতে ছিল নজরুলেরপ্রচন্ড শখ এবং অসাধারণ দক্ষতা। তার তোলা অসংখ্য ছবি দৈনিক ইত্তেফাকে গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়েছে। ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি নজরুল লেখালেখি করতেন এবং জড়িয়ে পরেন সাংবাদিকতায়। নজরুল বিশ্বাস করতেন, শোষিত বঞ্চিত মানুষের দু:খ কষ্টের কথা তুলে ধরে সমাজের শোষন বঞ্চনার
বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হবে।তিনি মনে করতেন, রণাঙ্গনের হাতিয়ারের মত লেখনিও রুখবে পাকিস্থানী হানাদার আর দেশীয় দোসরদের। ১৯৬৮ সনের শেষ দিকে ইত্তেফাকের বরিশাল
সংবাদদাতা ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম উচ্চ শিক্ষার জন্য বরিশাল ত্যাগ করলে নজরুল ইসলাম ইত্তেফাকের বরিশাল সংবাদদাতা হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৭০ সনের ১২ নভেম্বরের প্রয়লংকারী বন্যায় সাংবাদিক হিসাবে নজরুল উপকুলের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের কথা তুলে ধরেন এবং ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব:) এম.এ জলিলের
সাথে থেকে রণাঙ্গনের সংবাদ সংগ্রহ করেণ। ইত্তেফাক তখন অনিয়মিত প্রকাশনা থাকায় বিভিন্ন সংবাদপত্রে তা প্রকাশ করেণ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাকের বরিশাল জেলা সংবাদদাতা হিসাবে কর্মরত ছিলেন এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন। বরিশাল প্রেসক্লাব প্রতি বছর ১৯ জুন স্বজন স্মরণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নজরুলসহ হারিয়ে যাওয়া সাংবাদিকদের স্মরণ করেন, শ্রদ্ধা জানান। ১৯৭৩ সনের ১০ আগস্ট রাত অনুমান ১০ টা। বাইরে ঘুট ঘুটে অন্ধকার, অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে।
একজন পরিচিত যুবক সদরুল আপনাকে ডাকে বলে বিএম কলেজের ডিগ্রী হোস্টেলের ২০৫ নম্বর রুমথেকে নজরুলকে ডেকে নিয়ে গেলেন। নজরুলের কথা বলে ইন্টারমিডিয়েট (মুসলিম ) হোস্টেল থেকে সদরুলকে এবং কলেজ রোড থেকে সমরেশকে ডেকে নিয়ে একদল দুস্কৃতিকারী
তাদেরকে গুম করে। যদিও কেউ কেউ বলেন ঐদিন রাত ৮ টার স্টীমারে সদরুলের নোয়াখালী যাওয়ার কথা। তাকে স্টীমার থেকেই ধরে নিয়ে আসা হয় ।১১ আগস্ট সকাল ১০ টা। ক্যা¤পাস বা কেন্টিনে না পেয়ে হঠাৎ করেই নজরুলের খোজ পরে। ক্যা¤পাস থেকে বন্ধু বান্ধব, কলেজ কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক ও সাংবাদিক মহলে জানাজানি হলে সবাই ছুটে আছেন বিএম কলেজ ক্যা¤পাসে । অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক মজুমদার বার বার মাইকে উত্তেজিত ছাত্র-জনতাকে শান্ত হওয়ার আশ্বাস দিলেও পরিস্থিতি ক্রমশ অশান্ত হতে থাকে ।
এরমধ্যে খবর আসে নতুল্লাবাদ বাস স্টান্ডের কাছে বাম পায়ের একটি চামরার স্যান্ডেল ও একটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট পাওয়া গেছে । উত্তেজিত ছাত্র-জনতা ছুটে যান নতুল্লাবাদ । নজরুলের মামা আনোয়ার হোসেন আকন সনাক্ত করেন স্যান্ডেলটি নজরুলের । গ্যাসট্রিকের সমস্যা থাকায় নজরুল প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেতেন। ঐদিন রাতেও খাওয়ার জন্য একটি ট্যাবলেট হাতে নিয়েছিলেন । কিন্তু পরিচিত এক যুবকের ডাকে না খেয়ে ট্যাবলেট হাতে নিয়েই বের হয়েছিলেন। নজরুল -সদরুল -সমরেশকে না পেয়ে মিছিল স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে বিএম কলেজ ক্যা¤পাস।কান্নায় ভেংগে পরেন ছাত্র -ছাত্রীসহ সাধারণ মানুষ প্রিয় নেতা হারানোর আশংকায়
ছাত্র-জনতার উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে কলেজ ক্যা¤পাস থেকে গোটা বরিশাল শহরে। শুধু বিএম কলেজ কিংবা বরিশাল শহর নয়, নজরুল-সদরুল-সমরেশ ছিল তখনকার সময়ে দক্ষিনাঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে সবচেয়ে উচ্চারিত নাম। নজরুলের স্মৃতি রক্ষার জন্য তার রাজনৈতিক অনুসারী, বন্ধু-বান্ধব এবং শুভাকাঙ্খীরা ১৯৭৭ সনে নজরুলের স্মৃতি সংসদ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের প্রয়োজনে ২০০০
সনে People Participation for Social Change স্লোগান নিয়ে নজরুল স্মৃতি সংসদ সংক্ষেপে এনএসএস বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৪ সনে সংস্থাটি এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন লাভ করে এবং কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ঘটে। বর্তমানে এনএসএস বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়দুর্যোগ ও জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত ঝুকিতে থাকা মানুষ
এবং কক্সবাজার, খুলনা, যশোর,বাগেরহাট ,নওগা,নাটোর, জামালপুর,সিরাজগঞ্জ,সিলেট এবং সুনামগঞ্জ জেলার দরিদ্র -হতদরিদ্র নারী পুরুষ
এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে এবং নজরুলের সমতা ভিত্তিক সমাজ বিনির্মানের স্বপ্ন দেখছে। নজরুলের  একটি স্বপ্ন ।সমসাময়িক বাস্তবতায় একটি বিপ্লবী  চেতনা ।ব্যক্তি নজরুলকে হত্যা করলেও একটি আদর্শ একটি স্বপ্নকে মেরে ফেলা যায়না । কখনো কেউ পারেনি । নজরুলও বেচে থাকবেন তার স্বপ্নে,এনএসএস`র কার্যক্রমে আর সাধারণ মানুষের ভালবাসায় ।চির অ¤¬ান থাকবেন বিপ্লব  আর বিদ্রোহের চেতনায় উজ্জীবিত তারুণ্যের জ্বল জ্বলে চোখের তারায় ।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মমতাজ বেগম
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2019. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close