১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার ১১:৪৪:৫৭ এএম
সর্বশেষ:

২৯ আগস্ট ২০১৯ ১১:৩৯:৩১ পিএম বৃহস্পতিবার     Print this E-mail this

টিপু সুলতানের দূর্গে একদিন; ইতিহাসের একটা অংশ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর মৃত্যু ছিল বীরোচিত

এডভোকেট মোঃ সাইফুদ্দীন খালেদ
বাংলার চোখ
 টিপু সুলতানের দূর্গে একদিন;  ইতিহাসের একটা অংশ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর মৃত্যু ছিল বীরোচিত

১৭৫০ সালে ব্যাঙ্গালুরুর ডেবেন হালি এলাকায় টিপু সুলতানের জন্ম। তার পুরো নাম সুলতান ফতেহ আলী খান টিপু। কিশোর বয়সে তার মধ্যে দেখা যায় সামরিক জ্ঞানের অফুরন্ত সম্ভাবনা। সময়ের ব্যবধানে তিনি পরিণত হন বিরাট যোদ্ধায়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার অসীম বীরত্বের কারণে মালাবার শাসক তার পিতা হায়দার আলীর কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হন। অতঃপর দ্বিতীয় মহীশুর যুদ্ধকালে হায়দার আলী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে ১৭৮২ সালে মহীশুরের শাসনকর্তায় অধিষ্ঠিত হন টিপু সুলতান। এরপর ক্রমান্বয়ে নিজের রাজ্য-পরিধি বাড়াতে থাকেন। আর যদি জানতে চান ইতিহাসের পাতায় কি নিয়ে তার অবস্থান? তবে একবাক্যে যে কেউ বলবে ইতিহাসের পাতায় সর্বপ্রথম স্বাধীন দেশপ্রেমিক ও ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে  যে শাসক নিয়েছিলেন সবচেয়ে শক্ত অবস্থান, মহীশুরের বাঘ হিসেবে খ্যাত সেই “টিপু সুলতান”। বাঘ আর টিপু সুলতান যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। তার আমলে রাজ্যের পতাকায় কানাড়ি ভাষায় লেখা থাকতো ”বাঘ ই ইশ্বর“। তিনি বলতেন, আমি শেয়ালের মত হাজার বছর বাচতে চাই না, বাঘের মত এক মুহুর্ত বাচতে চাই“।
টিপু সুলতান ইংরেজদের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মুখে ১৭৮৬ সালে একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ২০টি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেন, যাতে ৭২টি কামান বসানো হয় এবং ৬২টি কামান বসানো ২০টি ফ্রিগেট তৈরি করেন। ১৭৯০ সালে সেনাপতি কামালুদ্দিনকে ‘মীর বাহার’ বা নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। নৌবাহিনীর উন্নয়নের জন্য জামালাবাদ ও মাজিদাবাদে দুই ডকইয়ার্ড স্থাপন করেন। টিপু সুলতান ১১ জন সেনা কর্মকর্তাকে ‘মীর ইয়াম’ হিসেবে নিয়োগ দেন; যাঁদের প্রত্যেকের অধীনে ছিল ১১ জন অ্যাডমিরাল। প্রত্যেক অ্যাডমিরালের অধীনে ছিল দুটি জাহাজ। ভারতবর্ষের ইতিহাসে টিপু সুলতানই প্রথম শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে টিপুর নাম ছিলো এক বিভীষিকা। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ভয় ছিলো যে, টিপু সুলতান নেপোলিয়নের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করতে পারেন। এটি একেবারে অমূলকও ছিল না। এজন্য অটোমান এবং ফরাসি সাম্রাজ্যের প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেনও টিপু সুলতান। তাই ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তমে টিপুর মৃত্যু ছিলো তাদের বহুল প্রত্যাশিত সংবাদ। মূলত টিপু সুলতানের শাহাদাতের পর তাঁর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে লুটতরাজের এক মহোৎসব শুরু হয়। উইলিয়াম উইল্কি কলিন্সের লেখা বিখ্যাত ‘দ্য মুনস্টোন’ উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যটি শুরু হয় এই লুটতরাজের বর্ণনা দিয়ে। উপমহাদেশীয় ইতিহাসে টিপু সুলতানকে বরাবরই জাতীয় বীরের মর্যাদাই দেয়া হয়েছে। কারণ, প্রায় গোটা ভারত বর্ষই যখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর করতলগত হয়েছিল; তখন টিপু সুলতানই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সম্রাজ্যবাদের ও বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন। তাই ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে তিনি ‘মহীশূরের বাঘ’ হিসেবেই স্বীকৃত। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, টিপু সুলতান শুধু একজন  বীর যোদ্ধাই ছিলেন না বরং তিনি একজন সুশাসকও ছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলেও আপাদমস্তক ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি একজন শিক্ষানুরাগী শাসক ছিলেন। একজন দক্ষ কুটনীতিকও ছিলেন মহীশূরের টিপু সুলতান। উপমহাদেশ থেকে ইংরেজদের চিরতরে বিদায় করার জন্য ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের সাথে সখ্যতা গড়েছিলেন। ইস্তাম্বুল সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে দূত পাঠিয়েছিলেন তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য। তিনি মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রবক্তা ছিলেন। বিদেশীদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতিও দিয়েছিলেন তিনি। প্রায় গোটা ভারতই যখন ইংরেজদের করতলগত হয়েছিল। তখন একমাত্র ব্যক্তিক্রম ছিলেন মহীশূরের টিপু সুলতান। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইংরেজদের অধীনতা মেনে নেন নি। জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন পরাধীনতার চেয়ে শাহাদাতই শ্রেয়। ১৭৯৯ সালের ৪ মে চতুর্থ মহীশুর যুদ্ধে তিনি ইংরেজ বাহিনীর হাতে নিহত হন। টিপুর এক সেনাপতি মীর সাদিক বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মেলান৷ ১৭৫৭ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দোল্লার পতনের পর ইংরেজরা যখন একের পর এক রাজ্য দখল নিতে শুরু করে। দুর্বল রাজ্য প্রধানরা ইংরেজ আক্রমণে খড়কুটোর মত ভেসে যেতে লাগলো। তখন প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ব্যাঘ্র খ্যাত মহীশুরের টিপু সুলতান। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ও শেষ মহীশুর যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত টিপু সুলতানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। টিপু সুলতানের এ পরাজয়ের পর পুরো দক্ষিন ভারত ইংরেজদের করায়ত্ব হয়। তার পরিবারের লোকজনকে ভেলোরের এ দূর্গে বন্দী করে রাখে ব্রিটিশ শাসকরা৷ সময় পেলে দেখে আসতে পারেন এ দূর্গ। যেখানে আছে সুলতানের পরিবারের রক্তের ইতিহাস। যেভাবে যাবেন- বিমানে গেলে চেন্নাই (পূর্ববর্তী নাম মাদ্রাজ) হয়ে ভেলোর। এছাড়া কলকাতা থেকে ভেলোরে ট্রেন চলাচল করে। কিন্তু সময় বেশি লাগবে। আমি আগরতলা বিমানবন্দর হয়ে চেন্নাই তারপর ওখান থেকে তিন ঘন্টায় ভেলোরে। তামিলনাড়ু রাজ্যের শহর। ভেলোরে টিপু সুলতানের দুর্গের পাশাপাশি সেখানকার গোল্ডেন টেম্পল (সোনার মন্দির) দেখতে পারবেন। এই গল্প আরেকদিন। অবশেষে বলবো, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে টিপু সুলতানের মৃত্যু ছিল বীরোচিত। স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গকারী এ বীরের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক- আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মমতাজ বেগম
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2019. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close