১২ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার ০২:১৫:৪৩ এএম
সর্বশেষ:

১৪ অক্টোবর ২০১৯ ১২:১১:৪৮ এএম সোমবার     Print this E-mail this

যশোরে বছর জুড়ে ফুলের চাষ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা

এম.জামান কাকা, যশোর থেকে
বাংলার চোখ
 যশোরে বছর জুড়ে ফুলের চাষ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা

ফুলের নগরী যশোর। বছর জুড়েই এখন ফুল চাষ হচ্ছে যশোরের উপজেলা গুলোতে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের মধ্যে ৫২ জেলায় যাচ্ছে এখানকার উৎপাদিত ফুল। দেশের গন্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হয় বিদেশে। ফুল চাষিরা বলছেন, ফুল রপ্তানির জন্য সরকার পৃথক নীতিমালা করলে বিদেশে ফুল রপ্তানি ব্যাপক ভাবে বাড়বে। আগামি ডিসেম্বর থেকে ফুলের উৎপাদন মৌসুম শুরু। চলবে মার্চ পর্যন্ত।
যশোর শহর থেকে ১৮ কিলো মিটার দূরে যশোর-বেনাপোল সড়কের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী এলাকায় ১৯৮২ সালে শুরু হয় বাণিজ্যিক ফুল চাষ। দিনদিন বাড়ছে তা। এক পর্যায়ে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্য উপজেলাগুলোতে। এখন যশোরের ঝিকরগাছা, শার্শা, কেশবপুর, মনিরামপুর, চৌগাছায় উৎপাদিত হচ্ছে নানান জাতের ফুল। আগে কয়েক মাসে ফুল চাষ হলেও এখন সারা বছরই হচ্ছে ফুলের উৎপাদন।
এখানকার উৎপাদিত ফুল দেশের সত্তর থেকে পচাত্তর  ভাগ চাহিদা পূরণ করে এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির দেওয়া তথ্যমতে, যশোরে শুধু ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে ফুলচাষ হচ্ছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রায় ৫০ লাখ মানুষ জড়িত। এর মধ্যে নারী রয়েছে লক্ষাধিক।
যশোর জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর ১২০ কোটি পিস ফুল উৎপাদন হয় এ জেলায়।
ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম জানান, গদখালীতে উৎপাদিত রজনীগন্ধা,  গ্লাডিওলাস, জারবেরা ফুল আর্ন্তজাতিক মানের। গ্লাডিওলাস ও রজনীগন্ধার মান ভারতের চেয়েও উন্নত। এখানকার জারবেরার মান চায়নার চেয়ে ভালো। সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ আরও বেশকিছু দেশে এসব ফুল রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
এখন সবজি ও পানের সঙ্গে অল্পকিছু ফুল রপ্তানি করা হয়। প্রতিবছর গদখালীতে চাষিরা নতুন নতুন জাতের ফুল চাষ করছেন। এ বছর প্রথমবারের মতো গদখালীতে বিশেষ ধরণের গোলাপ লং স্টিক  রোজ চাষ হচ্ছে। এটি করেছেন গদখালী এলাকার ইমামুল হোসেন। ভারতের পুনে থেকে চারা এনে দেড় বিঘা জমিতে এর চাষ করেছেন তিনি।
গদখালীতে উৎপাদিত রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা ফুল আন্তর্জাতিক মানের। গ্লাডিওলাস ও রজনীগন্ধার মান ভারতের চেয়ে উন্নত। এখানকার জারবেরা মানে চায়নার থেকে ভালো বলে দাবি করেন ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম।
তিনি বলেন, সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ আরো বেশকিছু দেশে এখন সবজি ও পানের সঙ্গে অল্পকিছু ফুল রপ্তানি করা হয়। শুধু ফুল রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকার যদি পৃথকা নীতিমালা করে, তাহলে ফুল  রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
এ জন্য যেসব  দেশে ফুলের চাহিদা রয়েছে, সেসব দেশের বাজারের সঙ্গে ফুল চাষিদের সংযোগ করিয়ে দিতে হবে। এ জন্য দূতাবাসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। আর ফুল রপ্তানির  বিষয়ে পৃথক নীতিমালা করা হলে এ বিষয়গুলোর সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে বলে মত দেন তিনি।
যশোর শহর থেকে যশোর রোড বেনাপোলের দিকে ১৮ কিলোমিটার দুরে গদখালী বাজার। বাজার কেন্দ্রিক চারিপাশে পানিসারা, হাড়িয়া, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, পটুয়াপাড়া, সৈয়দপাড়া, মাটি কুমড়া, বাইসা, কাউরা, ফুলিয়াসহ  আরো অনেক গ্রামে মাঠজুড়ে কেবলই ফুলের বাগান। রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, রথস্টিক, জিপসি, গ্যালেডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ দেশি-বিদেশি নানারকম ফুল। এখন ফুল চাষ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের শার্শা, মণিরামপুর, কেশবপুর উপজেলার গ্রামে গ্রামে। এই গ্রামগুলোতে আধুনিক পদ্ধতিতে সারা বছরই নানা জাতের ফুল উৎপাদন করা হলেও সবচেয়ে ভালো মানের ফুল পাওয়া যায় ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে। সব থেকে বেশি ফুল বিক্রি হয় ফেব্রুয়ারি মাসে। এ মাসে বিশ্ব ভালো বাসা দিবস ও আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারী। দেশে তাজা ফুলের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ গদখালী থেকে সরবরাহ হয়। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় ৫২টি জেলায় যায় গদখালীর ফুল। সীমিত আকারে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা ও আশপাশের এলাকায় সাড়ে ১৬০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করছেন প্রায় ৬,০০০ চাষি। যশোর জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী এখানে প্রতি বছর ১২০ কোটি পিস ফুল উৎপাদন হয়ে থাকে। ফ্লাওয়ার সোসাইটির হিসাব অনুযায়ী এ চাষের সঙ্গে এখন দেশের ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
ফুলের রাজ্য গদখালীতে একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিলেন ফুলচাষিরা। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম জানান, সরকার ইতিমধ্যেই তাদের এ দাবি মেনে এর জন্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। গদখালীর রজনীগন্ধা কোল্ড স্টোরেজের পাশে ৫০ একর জমি বাছাই করা হয়েছে এ জন্য। তাড়াতাড়িই এর কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফুল ও ফুলবীজ সংরক্ষণের জন্য স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজের যে দাবি তাদের সেখানেও সাড়া দিয়েছে সরকার। গদখালীর পানিসারা গ্রামে ফ্লাওয়ার প্রসেসিং ইউনিট অ্যান্ড মার্কেট নামে একটি প্রকল্প পাশ হয়েছে। এ জন্য এক একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। টেন্ডার হয়ে গেছে। আবদুর রহিম বলেন, এগুলো হয়ে গেলে এ অঞ্চলে ফুল চাষে অভাবনীয় অগ্রগতি হবে।
প্রতি বছর নতুন নতুন ফুল অথবা পুরনো ফুলের নতুন কোনো জাতের চাষ শুরু করেন গদখালীর চাষিরা। এবার নতুন চাষ করা হয়েছে বিশেষ গোলাপ লং স্টিক রোজ। কেবল গদখালী নয়, বাংলাদেশে এই গোলাপের এ জাতটির চাষ করেছেন গদখালী এলাকার ইমামুল হোসেন। ইমামুল জানান, ভারতের পুনে থেকে চারা এনে ৪০ শতক জমিতে তিনি লং স্টিক রোজের চাষ করেছেন। এ ফুল বিক্রি করে এক বছরের মধ্যেই তার সব বিনিয়োগ উঠে এসেছে। ঠিকমতো পরিচর্যা করলে এই খেত থেকে একটানা ১০ বছর ফুল পাওয়া যাবে। এই জাতের গোলাপের বিশেষত্ব সম্পর্কে ইমামুল বলেন, অন্য জাতের গোলাপ ফুল গাছ থেকে তোলার পর যেখানে ৪-৫ দিনের বেশি রাখা যায় না, সেখানে লং স্টিক গোলাপ দুই সপ্তাহ পর্যন্ত তরতাজা থাকে। এর স্টিক শক্ত এবং লম্বা, ফলে সহজে ভাঙ্গে না। ফুলের পাপড়ি বেশ শক্ত। এসব কারণে অন্য জাতের গোলাপ যেখানে পাঁচ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে লং স্টিক রোজ বিক্রি হচ্ছে ১২-২০ টাকায়।
কার্নিশন নামে নতুন আরেকটি ফুলের চাষ গদখালীতে করছেন কয়েকজন চাষি। ভারত ও চায়নায় এ ফুলের চাষ আছে। এ ফুলটির চাহিদা রয়েছে সারা বিশ্বেই। ফুলচাষি শের আলী বলেন, লিলিয়াম নামের সুন্দর একটি ফুলের চাষ কয়েক বছর আগে তিনি শুরু করেছিলেন। কিন্তু লিলিয়ামের ওই জাতটি টেকসই ছিল না। পরে হল্যান্ড থেকে লিলিয়ামের একটি ভালো জাতের বীজ আনা হয়েছে।
ফুল চাষে নারীরা
পুরুষের পাশাপাশি গদখালী এলাকায় ফুল চাষে রয়েছেন নারীরা। পানিসারা গ্রামের ইসমাইলের স্ত্রী হাফিজা খাতুন হ্যাপী ১০ বিঘা জমিতে নানারকম ফুলের চাষ করছেন। পাশাপাশি করেছেন কমলালেবুর বাগান আর দেশি মুরগির খামার। জমি কিনে প্রায় কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি করেছেন ইতোমধ্যে। ভারত ও কম্বোডিয়া থেকে ফুল চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে তিনি এখন জবরদস্ত ফুল চাষী।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, গদখালী এলাকায় হ্যাপির মতো শতাধিক নারী এখন সরাসরি ফুল চাষে সম্পৃক্ত। এ ছাড়া ফুল প্যাকেজিং, গ্রেডিং ও মালা গাঁথায় আরও ৪০০ শত নারী কাজ করছেন। রয়েছে নাভারন, বেনে আলী, ফতেপুরসহ গ্রামের অনেক গৃহবধূ। শিক্ষিত মেয়েরাও এই চাষে এগিয়ে আসতে শুরু করেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা মা বা বাবাকে সহেেযাগিতা করছেন। ফুল চাষে আরও বেশি উৎসাহিত করতে নারীদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। যদিও সে উদ্যেগ এখনো নেওয়া হয়নি।
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপঙ্কর দাস বলেন, ফুল চাষে সংশ্লিষ্ট নারীদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রেও নারীদের বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
যশোরে ফুলের যিনি প্রবাদ পুরুষ তার নাম শের আলী সরদার। যশোরসহ সারা দেশে তিনি শের আলী নামে পরিচিত। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষের পথিকৃৎ তিনিই। পিতা আবদুর রহমান সরদারের নার্সারি ব্যবসা ছিল। ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের সরদার নার্সারির মালিক। একপর্যায়ে বাবার এ ব্যবসার হাল ধরেন শের আলী। ফলদ ও বনজ বৃক্ষের চারা উৎপাদন করে সুনাম কুড়ান। নার্সারি ব্যবসাকে আরও প্রসারিত করেন। যশোর-বেনাপোল সড়কের গদখালীতে তৈরি করেন আরও একটি নার্সারি। বাড়াতে থাকেন ফুল চাষ। সিঙ্গেল স্টিক রজনীগন্ধার পর নিয়ে আসেন ডাবল স্টিক রজনীগন্ধা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, গাঁদা, লিলিয়াম। তার দেখাদেখি গদখালীর অনেক চাষিই ঝুঁকে পড়তে থাকেন ফুল চাষের দিকে। শের আলীও তাদের সবরকম সহযোগিতা দিতে থাকেন অকাতরে। ফুল চাষ ছড়িয়ে পড়ে ঝিকরগাছার গ্রামে গ্রামে। এক শের আলী থেকে তৈরি হাজার হাজার শের আলী। ছোট্ট নার্সারি ব্যবসা থেকে কেবল ফুল চাষের মাধ্যমে শের আলী এখন কোটিপতির ফুল চাষি। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তার লাভ থাকে সর্ব নি¤œ ২০ লক্ষ টাকা। ফুল চাষের অভিজ্ঞতায় ঘুরেছেন বিশ্বের ১৮ দেশ। দেশ-বিদেশের আরও নতুন নতুন ফুলের জাত এনে দেশে ফুল চাষের ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে চান তিনি। দুই বিঘা জমির ওপর শের আলীর জারবেরা শেড। খেত পরিচর্যা করতে করতে তিনি বলেন, জারবেরা ফুল চাষের জন্য শেড নির্মাণ, চারা ক্রয়, সার, সেচ, পরিচর্যায় প্রতি বিঘায় খরচ হয় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চারা রোপণ করা হয়। তিন মাস পর থেকেই ফুল বিক্রি শুরু করা যায়। তবে ৪ থেকে ৬ মাস পর ভালো ফলন হয়। এক বিঘা জারবেরা খেত থেকে প্রথম বছরই ২০ লাখ টাকা আয় করা যায়। পরের বছর থেকে আয় বাড়ে। শের আলী বলেন, ঠিকমতো পরিচর্যা করতে পারলে এক বিঘার একটি শেড থেকে একটানা ৫ বছর ফুল পাওয়া সম্ভব।


সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মমতাজ বেগম
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2019. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close