১১ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার ১২:৩৮:৩৪ এএম
সর্বশেষ:

০২ ডিসেম্বর ২০১৯ ১১:০০:১৮ পিএম সোমবার     Print this E-mail this

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২বছর পূর্তি পালন

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
বাংলার চোখ
 পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২বছর পূর্তি পালন

 

 

 

বেলুন উড়িয়ে ও বর্নিল র‌্যালি শোভাযাত্রায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২বছর পূর্তি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। সোমবার সকাল ৯টায় পাজেপ প্রাংগনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২বছর পূর্তি উদযাপন কমিটি এ আয়োজন করে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ’র চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী, পুনবার্সন ও অভ্যন্তরীন টাস্কফোর্স’র চেয়ারম্যান(প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা সম্পন্ন) কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সংরক্ষিত আসনে সংসদ বাসন্তি চাকমা, খাগড়াছড়ি ২০৩ রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: ফয়জুর রহমান এসজিপি এএফডব্লিউসি পিএসসি, জেলা প্রশাসক প্রতাব চন্দ্র বিশ্বাস, জেলা পুলিশ সুপার মো: আহমার উজ্জামান, পাজেপ সদস্য খগেশ্বর ত্রিপুরা, মো: জাহেদুল আলম, মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু, জুয়েল চাকমা, পার্থ ত্রিপুরা জুয়েল, নিগার সুলতানা, শতরুপা চাকমা, পৌর মেয়র মো: রফিকুল আলম, উপ-প্রচার কমিটির আহবায়ক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো: শানে আলম, খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবের সভাপতি জীতেন বড়–য়া, দৈনিক অরন্য বার্তার সম্পাদক মো: চৌধুরী আতাউর রহমান রানা, খাগড়াছড়ি রিপোটার্স ইউনিটি’র সভাপতি চাইথোয়াই মারমা, দৈনিক সবুজ পাতার দেশ’র সম্পাদক মো: জুলহাস উদ্দিন, সাপ্তাহিক আলোকিত পাহাড়ের সম্পাদক মুহাম্মদ সাজু, সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্পাদক কানন আচার্য্য।

এ সময় জেলা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মরত সরকারি-বে-সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বে-সরকারি উন্নয়ন মূলক সংস্থা, স্থানীয় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।    
এ উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য র‌্যালি, ডিসপ্লে ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় প্রধান অতিথি টাস্কর্ফোস চেয়ারম্যান(প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি বলেন, আওয়ামীলীগ সরকারের সম্পাদিত এই শান্তি চুক্তির অধিকাংশ ধারা ইতো মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে সরকার। অবশিষ্ট কিছুধারা বাস্তবায়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক।
বিকেলে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তি কনসার্ট নামে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদেও অংশ গ্রহনে বর্নাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও সেনা রিজিয়ন। তা ছাড়া টাউন হল প্রাঙ্গনে ১ ডিসেম্বও হতে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ দিনব্যাপী শান্তি চুক্তি মেলাও চলছে।

অপরদিকে দিবসটি উপলক্ষে সরকারের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একাংশ(পিসিজেএসএস/এমএন লারমা) আলাদাভাবে বর্নাঢ্য র‌্যালী শেষে পান খাইয়া পাড়াস্থ মারমা সংসদের অডিটরিয়ামে বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক শ্রী সুধাকর ত্রিপুরা সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সহÑসভাপতি ও মহালছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কান্তি চাকমা।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গনসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য হাসান মারুফ রুমী, জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদ ফেরদৌস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহম্মদ আমির উদ্দিন, বাংলাদেশের ফেডারেশন সভাপতি গোলাম মোস্তফা।

বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম শরনার্থী কল্যান সমিতির সাধারন সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল, মহালছড়ি সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান কাকলি খীসা, অবস্বরপ্রাপ্ত বুদ্ধলাল চাকমা প্রমূখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, সরকার শান্তিচুক্তি করে জুম্ম জনগনের সাথে তামাশা করেছে। চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সরকারের কোন আগ্রহ নাই। চুক্তি দীর্ঘ ২২বছর অতিবাহিত হলেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তাবায়িত করেনি সরকার। কিন্তু সরকার চুক্তির মূলধারা গুলো এখনো বাস্তবায়ন করেনি বরং পাহাড়িদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। তাই সরকারকে চুক্তি পূর্নাংগভাবে বাস্তবায়নের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। সরকার যদি চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন না করে তা হলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তাবায়ন করতে সরকারকে বাধ্য করাবো। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চুক্তির যথাযথ ও পুর্নাঙ্গ বাস্তবায়নই সরকারের প্রতি অপেক্ষায় তাদের বৃহত্তর আন্দোলন দাবী বলে উল্লেখ করেন নেতারা।

পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি ও পার্বত্য আজঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু বলেন, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। যদি আন্তরিক হত তাহলে নেতা কর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করত না। চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে সরকার প্রমাণ করেছে তারা চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। চুক্তি বাস্তবায়নের পূর্বে পাহাড়ে যে পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল বর্তমানে পার্বত্যাঞ্চলে সে পরিবেশ বিরাজ করছে। চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। তাই পার্বত্যঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষে সরকারকে অবিলম্বে শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবী জানান। অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে জানান তিনি।

এমএন লারমা পিসিজেএসএস খাগড়াছড়ি জেলা শাখার তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্য সরকার হাত দেয়নি। ৩৬টি বিভাগের মধ্য ১১টি পূর্ণাঙ্গ, ৬টি আংশিক বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া সরকার আঞ্চলিক পরিষদের বিধিবিধানে কোন কাজ করেনি। একারণে জেলা পরিষদগুলো আঞ্চলিক পরিষদের নেতৃত্ব মানছে না। বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে শান্তি চুক্তি কোথাও সাংঘর্ষিকতা নেই। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারই প্রধান বাধা দিচ্ছে। এছাড়া দেশীয় ও বিদেশী চক্রান্ত রয়েছে।

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, চুক্তিকালে বিএনপি বিরোধিতা করেছিল। বিএনপির দু-বারের শাসনামলে চুক্তির আটটি বিভাগ জেলা পরিষদে হস্তাস্তর করেছে। চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন করা হলে পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস পাহাড়ি-বাঙ্গালী গ্রহণ করতে পাবে।
খাগড়াছড়ি জেলা শাখার ইউপিডিএফ’র প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা বলেন, শান্তিচুক্তি দিয়ে পাহাড়ীদের অধিকার আদায় হবেনা। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হলেও পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ছোট ছোট সম্প্রাদায়গুলো বিলীন হয়ে যাবে। শান্তিচুক্তি করে সন্তু লারমা রাষ্ট্রীয় চেয়ারে বসে ভোগ বিলাস একা করছেন না তার সাথে কতিপয় কতিপয় সাঙ্গপাঙ্গরাও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন।

তিনি বাঙ্গালীদের অধিকার আন্দোলন নিয়ে বলেন, আমরা আমাদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করছি। তাদেরও আন্দোলন করার অধিকার আছে। পার্বত্য এলাকায় সেটেলার সমস্যার জন্য সরকারই দায়ী।

বাঙালীদের প্রতি বৈষম্য করে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা হলেও পার্বত্য অঞ্চলে কাংক্ষিত শান্তিপ্রতিষ্ঠিত হয়নি এমন অভিযোগ করে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের বান্দরবান জেলার সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, সরকার যে উদ্দেশ্যে শান্তি চুক্তি করেছিল সে উদ্দেশ্য সাধিত হয়নি। কেন না পাহাড়ে গুম খুন চাঁদাবাজি এখনো বিরাজমান রয়েছে। একটি পক্ষ পাহাড়ে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, চুক্তি লংঘন করে আসছে। সে হিসেবে চুক্তিটি বাতিল করে পিসিজেএসএসসহ পাহাড়ীদের নতুন সংগঠন ও বাঙ্গালীদের অধিকার আদায়ের সংগঠনগুলোর সাথে সরকার গঠনমূলক আলাপ করে নতুন চুক্তির দাবী জানান তিনি।

অন্যদিকে রোববার বিকেল থেকে খাগড়াছড়ি পৌর টাউন হল প্রাঙ্গণে মেলাটি শুরু হয়। যা চলবে আগামী ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত। মেলার উদ্বোধন করেন শরণার্থী পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা।

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন-খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: ফয়জুর রহমান, পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাউদ্দিন, পৌর মেয়র রফিকুল আলম প্রমুখ। মেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুফলের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৯৭সালে ২রা ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(পিসিজেএসএস) মধ্যে এ ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শান্তিচুক্তির বছর না ঘুরতেই চুক্তির বিরোধীতা করে পূর্নাঙ্গ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ নামে একটি সংগঠন পার্বত্যঞ্চলে আন্দোলনে সক্রিয় হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে পিসিজেএসএ্স’র দলে মত পার্থক্যেও কারনে চুক্তির যথাযথ ও পুর্নাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবীতে পিসিজেএসএস(এমএন লারমা) নামে আরো একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। অতঃপর ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) নামে অপর একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।
পাহাড়ে দীর্ঘ তিন দশক ধরে আন্দোলনের পর ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সই হয়। যেটি ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’ নামে বেশি সমাদৃত।

 

 

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মমতাজ বেগম
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2019. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close