১৩ আগস্ট ২০২০, বৃহস্পতিবার ১২:২১:৫০ পিএম
সর্বশেষ:

১১ ডিসেম্বর ২০১৯ ০১:১৭:২৯ এএম বুধবার     Print this E-mail this

মর্টার শেলের আঘাতে সব কিছু ঝাজড়া করে দেয় -সম্মুখ যোদ্ধা এসএম মাহবুবুল আলম

সাইমুন রহমান এলিট, গলাচিপা(পটুয়াখালী) থেকে
বাংলার চোখ
 মর্টার শেলের আঘাতে সব কিছু ঝাজড়া করে দেয় -সম্মুখ যোদ্ধা এসএম মাহবুবুল আলম

গলাচিপার পানপট্টি সেন্টার বাজারের (বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের হাট) পশ্চিম পাশ দিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন বৃষ্টির মতো মটার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে তখন কেউ বেঁচে ফিরতে পারবো কিনা এ নিয়ে শংশয় ছিল। সেন্টার বাজারের পাশে খালের পূর্ব পাশে ‘পাতাবনে’ অবস্থান করছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ। এ গ্রুপটির ২০-২২ গজ দূরে একাধিক মর্টার শেল কাদা মাটিতে পড়ে অবিষ্ফোরিত অবস্থায় দেখে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকে তাঁরা। মুক্তিযোদ্ধারা একটা গুলি করলে পকবাহিনী পাল্টা শত শত বুলেট আর মর্টার শেলের আঘাতে গাছ-পালা ঝাজড়া করে দেয়। সেদিন প্রশিক্ষিত পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনি। সম্মুখ যুদ্ধের স্মৃৃতিচারণ করতে করতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ’৭১ এর রণাঙ্গনের  বীর সম্মুখ যোদ্ধা এসএম মাহবুবুল আলম দুধা। সেদিন সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা যুদ্ধ শেষে হঠাৎ করেই পিছু হটে পাকবাহিনী। পরে গলাচিপার আগুনমুখা নদী দিয়ে পালিয়ে যায় পাকবাহিনীর মেজর ইয়ামিন ও তার সৈন্যরা।

শৈশব কাল

গলাচিপা উপজেলার  পানপট্টি গ্রামে বেড়ে ওঠেন মাহবুবুল আলম দুধা মিয়া। ১৯৫২ মালের ১৭ অক্টোবর জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। বাবা হাজী আনোয়ার হোসেন ও মা জয়নব বিবির ঘরে তাঁর জন্ম। চার ভাই-চার বোনের মধ্যে সবার ছোট এসএম মাহবুবুল আলম দুধা। গলাচিপার উলানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে  ১৯৭০ সালে। এসএসসি পাস করে তৎকালীন ঢাকা জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায় তাঁর। ছাত্র জীবন থেকে ছাত্রলীগের একজন কর্মী ছিলেন তিনি।

যেভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত হওয়া

১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর খালাতো ভাই মো. আব্দুল হাদী দারোগার সাথে ঢাকা চলে যান এসএম মাহবুবুল আলম দুধা। তার সাথেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনে থাকা শুরু করেন। ১৯৭১ সালে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের ভাষণ শুনে বিবেকবোধ জাগ্রত হয়। ওই সময় মাঠে উত্তর-পূর্ব দিকে লাখ লাখ মানুষের ভীড়ে মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনেই বিমোহিত হয়ে পড়েন। সিদ্ধান্ত নেন গ্রামের বাড়ি ফিরে আসার। যুদ্ধে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১১ মার্চ গ্রামের বাড়ি ফিরে আসি। গ্রামে এসেই যোগাযোগ করি তৎকালীন গলাচিপা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি বারেক মিয়া এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মিয়ার সাথে। তাদের সাথে এমএ রব মিয়াও ছিল। আমাদেরকে এমএ রব মিয়ার নেতৃত্বে নিয়ে যাওয়া হয় গলাচিপা গালর্স স্কুলের মধ্যে। সেখানে সালাম ওস্তাদ আমাদেরকে প্রথমে বাঁশের লাঠি দিয়ে ট্রেনিং করান। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা শুনে আমরা চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য  ছড়িয়ে যাই।’

যুদ্ধের কৌশল ও রণাঙ্গণ

এসএম মাহবুবুল আলম বলেন, ‘গলাচিপার  পানপট্টি এলাকার বারকানিয়া গ্রামের কালাম মো. ঈসাদের বাড়ি রাজাকাররা পুড়িয়ে দেয়। এ খবর নিয়ে শাহাজাহান ফারুকী, কাজী আলমগীরের কাছে বাউফলের গছানি কাজির বাড়ি যাই। রাজাকারদের খবর পৌঁছে দিতে গিয়ে সেখানে রণকৌশলের ট্রেনিং নেই। এর পর আবার গলাচিপা চলে আসি। তখন আমি চিঠি পত্র আনা নেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলাম। যুদ্ধকালীন সময় বড়বাইশদিয়ার এমএলএ করিম মিয়া চাচা আমার কাছে যে চিঠি পত্র দিতো সেগুলো বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের কাছে দিতাম। এর কিছুদিন পর নভেম্বরের প্রথম দিকে নুরুল হুদা আমাদেও কেএম নুরুল হুদা ভাই তার ছদ্মনাম ছিল রেজা এবং হাবিবুর রহমান শওকত ভাইর নাম ছিল শওকত  তাদের সঙ্গে যুক্ত হই। তাদের সাথে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা পানপট্টি সেন্টার বাজারে আসি। হুদা ভাই আমাকে শাহজাহান নামের একজন তার ছদ্ম নাম ছিল খোকন তার সাথে গলাচিপা থানা রেকি করতে পাঠান। থানায় মুরগি বিক্রির জন্য থানা ভবনের ভিতরে ব্যারাকে ঢুকে রেকি করে আসি। পুলিশ কিছু বোঝার আগেই আমরা রাতেই থানা আক্রমণ করে দখল করে পরের দিন সকালে ঈদের নামাজ পড়বো বলে ভাবছিলাম। পরিকল্পনা মাফিক গলাচিপা হাই স্কুল বর্ডিং এর কাছে একটি গ্রুপ তার একটু পশ্চিম পাশে টিএন্ডটি অফিসে একটি গ্রুপ। গলাচিপা টিএ-টি অফিসের গ্রুপটির কাজ হচ্ছে ওয়ারলেস অকেজো করে দেওয়া। থানার সামনে একটি বাঙ্কার আছে। সেখানে গ্রেনেড চার্জ করার দায়িত্বে ছিল গোলাম মোস্তফা টিটো ও সফিজ উদ্দিন বাকুর। পরিকল্পনা মাফিক কাজ চলছিল। পাকবাহিনীর সাথে টানা কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধ হয়। কিন্তু ওরা সারেন্ডার করেনি। তখন আমরা পিছু হটে আবার পানপট্টি চলে যাই। সেখানে ক্যাম্প করে থাকি। এর মধ্যে ছোট ছোট বাজারগুলোতে জনসাধারণকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে উদ্বুদ্ধ করতাম। এর মধ্যে পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের দোসরদের খবর নেওয়ার জন্য বরিশালের আলম যে আদলে বিচ্চু বাহিনী গঠন কওে, সেই আদলে আমরাও গলাচিপায় আমিসহ বাবুল, কুদ্দুস মেলকার, হারুন, হানিফ আকনকে নিয়ে একটি বিচ্চু বাহিনী তৈরি করা হয়। আমাদের কাজ ছিল বিভিন্ন খোঁজ খবর এনে দেওয়া। এবার ৪-৫দিন পর আবার গলাচিপা থানা আক্রমণের পরিকল্পনা করি। থানার পূর্ব ও উত্তর দিক দিয়ে আক্রমণ করি। কিন্তু সেদিনও আত্মসমর্পণ করাতে পারিনি। আবার কয়েকদিন পর ১৭ নভেম্বর তৃতীয় বারের মতো থানা আক্রমণের পরিকল্পনা করি। এবার পশ্চিমে নদী পথ খোলা রেখে তিনদিক থেকে আক্রমণের পরিকল্পনা। কিন্তু আমাদের সহযোদ্ধা পূর্বদিকে অবস্থান করে থাকা খলিলুর রহমান ডাকনাম খলিফা নামের এক যোদ্ধা হাতে থাকা এসএলআর থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ভুলবশত ফায়ার হলে সেদিন আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। সেই রাতেই থানা থেকে পটুয়াখালীর পাকবাহিনীর মেজর ইয়ামিনকে খবর পাঠানো হয়। খবর পেয়ে মেজর ইয়ামিন পাকবাহিনীর সকল সদস্য নিয়ে পটুয়াখালী থেকে গলাচিপা চলে আসে। কিন্তু এ খবর আমাদের কাছে ছিল না। আমরা ক্লান্ত থাকায় পানপট্টি এসে যে যার মতো করে ঘুমিয়ে পড়ি। ১৮ নভেম্বর ভোর রাতে পানপট্টির হারুন ও গেদু মুসুল্লি তার ক্ষেতে চাষ করতে গেলে দেখতে পায় পাকিস্তানী আর্মিরা বারকানিয়া বাড়ির কাছে জড়ো হচ্ছে। পানপট্টির মাঝি বাড়ির হারুন-আলমকে দিয়ে গেদু মুসুল্লি ক্যাম্পে খবর পাঠায়। এরা দৌড়ে এসে আমাদেরকে খবর দেয়। খবর পেয়ে হুদা ভাই বাঁশির ছিটি দিয়ে আমাদেরকে ফলিং করান। সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং শেষে যুদ্ধের জন্য প্র¯‘িত শুরু হয়। আমাদের পানপট্টি ক্যাম্পের পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে পাকবাহিনী আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসে। আমরাও মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হই। আমাদের সবচেয়ে ঝুঁকি ছিল উত্তর ও পশ্চিম দিকে। আমাদের ক্যাম্পে বরিশালের জাহাঙ্গীর নামের এক যোদ্ধা মেশিনগান চালাত। নুরুল হুদা ভাই তাকে বিভিন্ন দিক থেকে মেশিনগানের গুলি করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমারা সেন্টারের পশ্চিম দিকে পূর্ব পাশে অবস্থান করি। খালের পাড়কে আড়াল করে আমরা অবস্থান নেই। উত্তর দিক থেকে খাল দিয়ে আমাদের ক্যাম্পে আসতে হলে তখন একটি ছোট বাঁশের সাঁকো ছিল। পাক বাহিনী সেই সাঁকো পারাতে গিয়ে আক্রমণের মুখে পড়ে। আবার পাকবাহিনী জড়ো হয়ে এবার পশ্চিম দিক দিয়ে আসা শুরু করে। ছোট খালের দুই পারে দুই গ্রুপ অবস্থান নেয়। পূর্ব পাশে আমরা মুুক্তিবাহিনী এবং পশ্চিম দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। তুমুল গোলাগুলি চলছে। সমানে গালাগালও চলছে। পাক বাহিনী বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষন করতে থাকে। দুই আড়াই ঘণ্টা গোলাগুলির পর ৩জন রাজাকারের লাশ পাওয়া যায়। ৫-৬ জন পাকিস্তানী সৈন্য আহত হয়। অবস্থা খারাপ দেখে পাকবাহিনী আমাদের ক্যাম্পের দক্ষিণ দিকের একটি খালি ভিটা (তালুকদারের ভিটা) বাড়িতে মর্টার ফিট করে। মর্টারের ফায়ারে আমাদের সহযোদ্ধা রবীন্দ্র নাথ হালদার খোকন ধান ক্ষেতে আহত হয়। বৃষ্টির মতো মর্টার চার্জ করছিল পাকিরা। তখন আমরা তওবা পড়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হই। আমাদের ভাগ্য সহায় ছিল। ক্যাম্পের কাছে প্রচুর হোগলপাতার বন ও ছৈলা গাছ থাকায় মর্টার লক্ষ্য ভেদ করতে পারেনি। এদিকে আমরাও তুমুল বেগে গুলি করতে থাকি। বিকেলের দিকে হঠাৎ করে পাকবাহিনীর মেজর ইয়ামিন পালিয়ে যায়। ইয়ামিন চলে যাওয়ায় রাজাকারেরাও পালিয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ওরা আবার সংঘটিত হয়ে ক্যাম্পের দক্ষিণ পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে আক্রমন চালায়। তিনদিক দিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ করতে থাকে। কিন্তু থেমে থাকেনি পাকিস্তানী বাহিনী। সন্ধ্যার পরেও গুলি করতে থাকে। এক পর্যায় সন্ধ্যা সাতটার দিকে রণাঙ্গন ছেড়ে পাক বাহিনী পানপট্টি থেকে পালিয়ে যায়। এসময় স্থানীয় লোকজন জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে আমাদের কাছে আসে। পরে আমরা ওই রাতেই ১৮ নভেম্বর গলাচিপা-চরকাজল নদী পার হয়ে চরকাজল ক্যাম্পে যাই। আবারো গলাচিপা থানা আক্রমণের পরিকল্পনা করি। এরই মধ্যে ২৪ নভেম্বর শুনি থানা ছেড়ে সবাই পালিয়ে গেছে। ২৫ নভেম্বর থানা দখল করে অস্ত্র নিয়ে নেই এবং থানাতেই আমরা মুক্তি যোদ্ধাদের ক্যাম্প তৈরি করি। মুক্ত হয় গলাচিপা থানা।’

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্মৃতির স্মারক রেখে যাওয়ার ইচ্ছা

এসএম মাহবুবুল আলম দুধা বলেন, বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে হবে। আর পটুয়াখালী জেলায় পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল একমাত্র গলাচিপা পানপট্টিতেই। কিন্তু এ  ইতিহাসকে ধরে রাখার মতো এখন পর্যন্ত শুধু একটি স্মৃতি স্তম্ভ করা ছাড়া তেমন কোন উদ্যোগ নজরে পড়ে না। তিনি আরো বলেন, দেশের জন্য মাটির জন্য ওই সময় জীবন বাজি রেখে যাদের নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধ করেছি বীর যোদ্ধা ট্রুপ কমান্ডার নুরুল হুদা ও ডেপুটি কমান্ডার হাবিবুর রহমান শওকত ভাইর ছবি সম্বলিত ফলক স্থাপন করা থাকলে আগামী প্রজন্ম জানতে পারতো যুদ্ধ সম্পর্কে। আর এটাই এখন সময়ের দাবি হিসেবে চাওয়ার।’


 

 

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
আইটি উপদেষ্টা
সোহেল আসলাম
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2020. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close