০৩ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার ১০:২৪:৩৮ এএম
সর্বশেষ:

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০২:৪৫:৩৯ পিএম রবিবার     Print this E-mail this

উড়াল গ্যাসের গ্রামের নাম বাকাইল

ইফতেয়ার রিফাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে
বাংলার চোখ
 উড়াল গ্যাসের গ্রামের নাম বাকাইল

রাস্তার দুই পাশে গাছের উপরে ঝুলছে গ্যাসের প্লাস্টিকের পাইপ। সেই পাইপ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ঘর-বাড়িতে। এই চিত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের বাকাইল গ্রামের। কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছের উপরে এই গ্যাসের পাইপের কারণে গ্রামটিকে এখন উড়াল গ্যাসের গ্রাম হিসেবেই বেশি চেনে মানুষ। মাঝে-মধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব উড়াল গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও পরবর্তীতে আবারও সংযোগ দেয়া হয়। ফলে গ্যাসের এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার রোধ করতে না পারায় যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরণের কোনো দুর্ঘটনা।

জানা গেছে, এক যুগেরও বেশি সময় আগে বাকাইল গ্রাম সংলগ্ন তিতাস নদীর কয়েকটি স্থানে গ্যাসের উদগিরণ শুরু হয়। মূলত তিতাস গ্যাস ফিল্ডের ৩নং কূপ খননের সময় লিকেজের কারণেই এই গ্যাসের উদগিরণ হয় বলে জানা গেছে। কূপের গ্যাস মাটির উপরের স্তরে চলে আসে এবং মাটির ফাঁক-ফোকর দিয়ে নলকূপ, নদীর পাড়, জমির আইল এবং বাড়ির আঙিনা দিয়ে গ্যাস উদগিরণ হতে থাকে। গ্যাসের এই উদগিরণ বন্ধ করতে ব্যার্থ হয়ে ২০০৭ সালে ৩নং কূপটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস্ কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। এরপর থেকে গ্যাসের উদগিরণও কমে আসে।

বাকাইল গ্রামের বাসিন্দারা উদগিরণ হওয়া এই গ্যাস তাদেরকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেয়ার দাবি জানালেও নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস প্রবাহ না থাকায় বিজিএফসিএল এই গ্যাস সংরক্ষণ বা উত্তোলনে প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেনা।

বিজিএফসিএল সূত্র বাংলার চোখকে জানায় , উদগিরণ হওয়া এই গ্যাস কূপের গভীরের লিকেজ হওয়া পকেট গ্যাস। এই পকেট গ্যাস এক সময় শেষ হয়ে যাবে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এই গ্যাসের ব্যবহার বৈধ নয়। আর এই গ্যাস দিয়ে বাণিজ্যিক কোনো প্ল্যান্টও করা সম্ভব না। কারণ নিরবিচ্ছন্ন গ্যাস প্রবাহ না থাকলে কোনো প্ল্যান্ট করা যাবে না। যেখানে নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস থাকবে সেখানেই প্ল্যান্ট হবে। বাকাইল গ্রামে নিরবিচ্ছন্ন গ্যাসের প্রবাহ নেই। উদগিরিত গ্যাস সাধারণত নলকূপ স্থাপনের জন্য যতটুকু গভীরতা প্রয়োজন সেটুক গভীরের গ্যাস। আর বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে বিজিএফসিএল’র উৎপাদিত যে গ্যাস সরবরাহ করা হয় তা অনেক গভীর এবং প্রেশারের।

সরেজমিন বাকাইল গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে তিতাস নদীর যেসব স্থানে গ্যাস উদগিরণ হচ্ছে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ড্রামে করে পানিসহ গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এরপর একটি পাইপ দিয়ে পানি বের করে আরেকটি পাইপ দিয়ে উত্তোলিত গ্যাস বিভিন্ন ঘর-বাড়িতে সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্রামের কয়েকশ ঘর-বাড়িতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। কয়েকটি চুন ও চুড়ি কারখানাও চলে বিজিএফসিএল’র এই পকেট গ্যাস দিয়েই। তবে এই গ্যাসের প্রেসার উঠা-নামা করে।

যেখানেই পকেট গ্যাসের অস্তিত্ব রয়েছে সেখানেই নলকূপ বসিয়ে পানিসহ গ্যাস উত্তোলন করে ড্রামে সংরক্ষণ করছে একটি চক্র। এরপর ড্রাম থেকে প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করছে ওই চক্রটি। উদগিরণ হওয়া এই গ্যাস দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রমরমা বাণিজ্য করে আসছে ওই চক্রের সদস্যরা। তবে গ্রামের বাসিন্দা অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে মুখ না খোলায় তাদেরকে সনাক্ত করতে পারছেনা প্রশাসন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া যাচ্ছেনা। তবে প্রায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে দেয়া গ্যাস সংযোগগুলো বিচ্ছিন্নসহ গাছের উপর দিয়ে নেয়া পাইপগুলো অপসারণ করে থাকে। কিন্তু অভিযানের পর রাতের আঁধারে আবারও গ্যাস সংযোগ দেয় চক্রটি। এভাবে গ্যাসের ব্যবহারে ঝুঁকি আছেও জেনেও গ্যাস সংযোগ নিচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষ। মূলত সরকারিভাবে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখার কারণে ঝুঁকি নিয়েই গ্যাস ব্যবহার করছে মানুষজন। তবে তারা এভাবে গ্যাস ব্যবহার না করে সরকারিভাবে বৈধ উপায়ে গ্যাস সংযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বাকাইল গ্রামের বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বাংলার চোখকে  জানান, আমাদের গ্রামে চতুর্দিকে গ্যাস রয়েছে। গ্রামের অনেকেই এই গ্যাস ব্যবহার করছে। কিন্তু আসলেই এই গ্যাসের ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ।  যে কোনো সময় বড় ধরণের কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু সরকারিভাবে গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে অবৈধভাবে এই গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে।

গ্রামে গৃহবধূ তাহমিনা আক্তার বাংলার চোখকে জানান, গ্যাস ছাড়া তো আর চলা যায়না। রান্না করার সময় অনেক সতর্ক থাকি, এরপরও ভয়ে থাকি কখন আগুন লাগে। যে কোনো মুহূর্তে আগুন লেগে সবকিছু পুড়ে যেত পারে। সরকারিভাবে গ্যাস দিলে তো আমাদের আর ঝুঁকি নিয়ে গ্যাস ব্যবহার করতে হতো না।

আলমগীর মিয়া নামে আরেক বাসিন্দা বাংলার চোখকে জানান, আগে আমরা সবসময় এই গ্যাস ব্যবহার করতাম। প্রশাসনের লোকজন বিভিন্ন সময় এসে গ্যাসের সংযোগ কেটে দিয়ে যায়। তখন বাড়ির মহিলারা রান্না করতে গিয়ে কষ্ট করতে হয়। আমরা চাই আমাদের এলাকায় যেন সরকারিভাবে গ্যাস দিয়ে আমাদের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা হয়।
গ্যাসের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার বন্ধের ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পঙ্কজ বড়ুয়া বাংলার চোখকে বলেন, অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দিতে গ্রামে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। কিন্তু গ্রামের লোকজন সেই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মুখ না খোলায় তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছেনা। আমরা নিয়মিত সেখানে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে নেয়া গ্যস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছি। অচিরেই অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া সিন্ডিকেটের সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং গ্যাসের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার রোধ করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে সতর্কতামূলক সভা করা হবে।

বিষয়টি নিয়ে বিজিএফসিএল কর্তৃপক্ষ অফিসিয়াল কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। তবে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল হক বলেন, বিজিএফসিএল’র একটা কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করতে গিয়ে কোনো ধরণের দুর্ঘটনা ঘটেছে। পরে তারা পরিত্যক্ত ঘোষণা করে চলে এসেছে। তবে উদগিরণ হওয়া এই গ্যাস কারো নিয়ন্ত্রণে নেই। কোথায় কোন দিক দিয়ে গ্যাস বেরুচ্ছে সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাবেনা। তবে এটার প্রেশারে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
কাউসার হোসেন সুইট
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2020. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close