২৯ মে ২০২০, শুক্রবার ১০:০৭:১৩ পিএম
সর্বশেষ:
পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে কাউকে ঘরে ঢুকাবেন না, কোনো সন্দেহ হলে নিকটস্থ থানাকে অবহিত করুন অথবা ৯৯৯ কল করুন: পুলিশ সদর দপ্তর           

০৬ এপ্রিল ২০২০ ০৪:০০:৩১ এএম সোমবার     Print this E-mail this

করোনার প্রভাবে থমকে গেছে যশোরের অর্থনীতি

এম.জামান কাকা, যশোর থেকে
বাংলার চোখ
 করোনার প্রভাবে থমকে গেছে যশোরের অর্থনীতি

 কোভিড ১৯ তথা করোনা ভাইরাসের প্রভাবে যশোর জেলার অর্থনীতি থমকে গেছে। একমাত্র নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া আর কোন ব্যবসায় গতি নেই। পোনা মাছ খাতে ক্রেতা নেই। মৎস্য হ্যাচারী গুলো যেন মৃত্যু দ্বীপের নিরবতায়। ফুলের বাজারে ক্রেতা নেই। বাধ্য হয়ে ফুল চাষীরা গরু ছাগল দিয়ে উৎপাদিত ফুল খাওয়ানো শুরু করেছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলো। বর্ডার শূন্য হওয়ায় বন্ধের পথে আবাসিক হোটেল। কল-কারখানায় উৎপাদন কমেছে বহুল অংশে। কমেছে বেনাপোল তথা ভারত থেকে পণ্য আমদানি।
যশোরের ভাই ভাই মৎস্য নার্সারীর মালিক খলিলুর রহমান জানান, মাছের ক্রেতা আগের মত নেই। পরিবহন খাত বন্ধ থাকায় এই মন্দা দশা। তিনি পাবদা, দেশী জিয়ল, মাগুও, গুলশা ও দেশী ট্যাংরা মাছের পোনা বিক্রি করেন। প্রতি বছর যশোরে হাজার কোটি টাকার পোনা মাছ বেচা বিক্রি হয়।
যশোর হাইব্রীড মাগুর বাজার ব্যবসায়ী চাষী সমিতির ক্যাশিয়ার খুরশিদ আলম বলেন, মাগুর বাজার বন্ধ। ২/১টি হ্যাচারীর হাউজে এবং বলাডাঙ্গা কাজীপুরে কিছু মাছ উৎপাদন হচ্ছে। শতকরা দুই ভাগ ব্যবসাও নেই।
তরি তরকারির বড় মোকাম যশোর। মনিরামপুর পাইকরি বাজার, চুড়ামনকাঠি, সাতমাইল, গদখালী, চৌগাছা, পুড়াপাড়া বাজার তরি তরকারির মোকাম। কিন্ত এখন খরিদ্দার নেই বাজারে। চাষীদের মাথায় হাত।
শঙ্করপুরর বাবলা তলা পোনা মাছ ব্যবসায়ি আলম বলেন, সারা দেশের যে অবস্থা তার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে যশোর। পোনা মাছ বাজার প্রায় বন্ধ। এ কারনে ক্ষতিগ্রস্থ লাখ মাছ চাষী ও হ্যাচারী মালিক। এটি যশোরের জন্য বড় একটি ধাক্কা।
গদখালীর ফুল ব্যবসায়িরা বাধ্য হয়ে ও মনের রাগে উৎপাদিত ফুল গরু ছাগল দিয়ে খাওয়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া তাদের আর কিই বা করার আছে।
চায়ের স্টল বন্ধ। যশোরে হাজার টি স্টল যেখানে মানুষ চা বিস্কুট খায়। এই খাতে জড়িত মানুষেরা এখন অলস সময় কাটাচ্ছেন। তাদের পরিবারেও হতাশা।
যশোরের গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মালিকরা জানান, গত ২০দিন ধরে তাদের কোন ক্রেতা নেই। অর্ডার না থাকায় যন্ত্রাংশ উৎপাদন করতে পারছেন না। যশোর বিসিকের প্রতিষ্ঠান এমইউসিইএ ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস জানান, আমরা হিমায়িত চিংড়ি রফতানি করি ১৪টি দেশে। এর মধ্যে সম্প্রতি জার্মান ও ফ্রান্স থেকে অর্ডার বাতিল করেছে। অন্য দেশগুলোও অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন।
যশোরে বড় অর্থনীতির খাত মোটরপার্টস। শহরের ক্লোডস্টোর এলাকার ফারিয়া মোটরসের মালিক রেজোয়ান আহমেদ মুরাদ জানান, আমি বড় গাড়ির ইঞ্জিন ভারত থেকে আমদানি করে বিক্রি করি। সারা দেশের ক্রেতারা আসেন আমাদের এখানে। আগে প্রতিদিন এক বা দুইটি করে ইঞ্জিন বিক্রি হতো। কিন্তু গত প্রায় এক মাস ধরে কোন ক্রেতা নেই। কর্মচারীদের বেতন ও ব্যাংকের ঋণের কিস্তি চলতি মাসে কিভাবে পরিশোধ করব সেটা নিয়ে চিন্তিত।
যশোর মোটরপার্টস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাহিনুর হোসেন ঠান্ডু জানান, দেশের মধ্যে মোটর পার্টসের সবচেয়ে বড় বাজার যশোর। এখানে দেশের বিভিন্ন জেলার গাড়ির মালিকরা আসেন ইঞ্জিন ও খুচরা যন্ত্রাংশ কিনতে। বছরে এখানে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বর্তমানে কোন ক্রেতা নেই। দোকানীরা ব্যাংক ঋণ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
লাইট পিকআপ টিকিং গাড়ির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-আমিন এন্টার প্রাইজের পরিচালক আনিছুর রহমান খান বলেন, আমাদের গাড়ি মূলত চীন থেকে আমদানি করে থাকি। গত তিন মাস ধরে গাড়ি আমদানি করতে পারছি না। আবার দেশের বাজারেও গাড়ি বিক্রি থেমে গেছে। এতে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। ব্যাংক ঋণ আমাদের ভাবাচ্ছে।
করোনা ভাইরাস আতঙ্কে যশোরের আবাসিক হোটেলগুলোতে চলছে চরম মন্দাবস্থা। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে হোটেল বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন গ্রাহক থাকতেন, সেখানে এখন ২ থেকে ৩ জন থাকছেন। আর কয়েকদিন পরে তাও থাকবে না বলে তারা আশংকা করছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুলনা বিভাগের মধ্যস্থল হিসেবে যশোর জেলা পরিচিত। এখানে রয়েছে বিমানবন্দর, দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দর, নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর, পাশে মংলা সুমদ্রবন্দর ও ভোমরা স্থলবন্দর। আছে ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা। যশোর থেকে ১৮টি রুটে চলে পরিবহন।
এছাড়া যশোর বিমানবন্দর ব্যবহার করছে খুলনা, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। সেই সুবাদে যশোরে পাঁচ তারকামানের আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। অথচ শুরুতেই তারা হোঁচট খাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে হোটেলগুলো তাদের কর্মীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
শহরে বর্তমানে ৫টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। হোটেলগুলো হলো জাবের হোটেল ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল ওরিয়ন, হোটেল হাসান ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল সিটিপ্লাজা ও ম্যাগপাই হোটেল।
জাবের হোটেল ইন্টারন্যাশনালের জেনারেল ম্যানেজার রাকেশ কুমার জানান, খুলনা বিভাগের একমাত্র পাঁচ তারকা হোটেল জাবের। ১৬ তলা বিশিষ্ট হোটেলে ৯৬টি আধুনিক রুম রয়েছে। যার ভাড়া ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৯ হাজার টাকা। এখানে আগতদের জন্য রয়েছে সুইমিংপুল, সকালের নাশতা, বার, রুফটপ, স্প্যা ও বারবিকিউ রেস্টুরেন্ট। রয়েছে সর্বাধুনিক ফায়ার সিকিউরিটি সিস্টেম।
খাবারের মান ভালো হবার কারণে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে হোটেলটি। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে এখন। যেখানে প্রতিদিন ৪৫-৫০ জন গ্রাহক থাকতেন, সেখানে বর্তমানে থাকছেন পাঁচ থেকে সাত জন। এছাড়া সেমিনার কক্ষ ভাড়া ও রেস্টুরেন্টের ব্যবসাও ভালো ছিল। সেখানেও কোন ব্যবসা নেই। এমন অবস্থা চলতে থাকলে হোটেল বন্ধ করা ছড়া উপায় থাকবে না। কেননা বিদ্যুৎ বিল এবং কর্মীদের বেতনের টাকা উঠবে না।
হোটেল ওরিয়নের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদুর রহমান সুজা জানান, সাড়ে চার বিঘা জমির উপর পাঁচ তারকা মানের আবাসিক হোটেল গড়ে তুলা হয়েছে। ১৫ তলা ভবনের হোটেলটিতে রয়েছে ১২১টি রুম। যার মধ্যে ৩০টি ডাবল রুম ও ৩০টি কাপল রুম রয়েছে। এখানে রয়েছে পাঁচটি সভা কক্ষ, তিনটি রেস্টুরেন্ট, সুইমিং, হেলথ ক্লাব, স্প্যা, একশ গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, ফায়ার স্টেশন ও লন্ড্রি ব্যবস্থা। এখন হোটেল ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া উপায় দেখছি না। কেননা কর্মীদের বেতন চলতি মাসে দিতে পারব কিনা জানি না। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন গ্রাহক থাকত সেখানে এখন থাকছে মাত্র দুই জন।
একই অবস্থা উৎপাদন শিল্পে। বিসিকে অবস্থিত মদিনা মেটালের স্বত্বাধিকারী ফারুক হোসেন জানান, তাদের উৎপাদিত বাইসাইকেলের রিম সারা দেশে বিক্রি হয়। এখানে শতাধিক মানুষ কর্মরত। অথচ গত এক মাস ধরে চলছে চরম মন্দাভাব। ক্রেতারা মাল নিচ্ছে না। এভাবে চললে কর্মচারীদের বেতন দিতে পারব না আমরা।
যশোরের ছিটকাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হোসেন আলী জানান, গত ২০ বছরেও এমন খারাপ অবস্থা দেখিনি। মানুষ বাজারমুখি হচ্ছে না। গত বিশ দিন ধরে আমরা কাপড় বিক্রি করতে পারেনি।
বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি দিন দিন কমছে। বেনাপোল আমদানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, ভারত থেকে পণ্য আমদানি করতে হলে ব্যবসায়ীদের যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু ভিসা স্থগিত করায় কেউ ভারতে যেতে পারছে না। এতে করে পণ্য আমদানি কম হচ্ছে। বেনাপোল বন্দরের পরিচালক আবদুল জলিল বলেন, বন্দর দিয়ে যেখানে প্রতিদিন পণ্য আমদানি হয়ে থাকে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ ট্রাক। সেখানে পণ্য আসছে ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক।
এ ব্যাপারে যশোর চেম্বার অব কমার্সের নেতৃবৃন্দ জানান, যশোর জেলায় গত ২০ বছরে তেমন উল্লেখযোগ্য বেসরকারি বিনিয়োগ গড়ে উঠেনি। দুইটি পাঁচতারকা মানের হোটেল নির্মিত হওয়ায় সেই মন্দা খানিক কেটেছিল। কেননা এখানে বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও নৌ বন্দর থাকায় শিল্প উদ্যোক্তা ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যাতায়াত করেন। তারা আবাসিক হোটেলে থাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন। সে আলোকে যশোরে ভালোমানের আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাব সব সেক্টরে পড়েছে। সব ব্যবসায় চলছে মন্দাভাব। হোটেল ব্যবসা এর বাইরে নয়।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
আইটি উপদেষ্টা
সোহেল আসলাম
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2020. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close