১৩ জুলাই ২০২০, সোমবার ০৩:১৫:৪৫ এএম
সর্বশেষ:

৩১ মে ২০২০ ০৯:২৮:৫৫ এএম রবিবার     Print this E-mail this

যেভাবে লিবিয়ায় লোমহর্ষ হত্যাকাণ্ড ঘটায়ে ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়

ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলার চোখ
 যেভাবে লিবিয়ায় লোমহর্ষ হত্যাকাণ্ড ঘটায়ে ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়

ভাগ্য বদলের আশায় দরিদ্র সংসারে একটু আশার আলো ফোটাবার জন্য মাদারীপুরের সাইদুল ইসলাম ডিসেম্বরের দিকে ভারত হয়ে লিবিয়া যাত্রা করেছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল, কয়েক মাস লিবিয়ায় থেকে সুযোগ বুঝে ইতালি যাবেন জীবিকার জন্য। ঠিকঠাক তো ত্রিপোলিতেই পৌঁছানো হলো না, ইতালি তো অজানা গন্তব্য। উল্টো মানবপাচারকারীদের হাত থেকে দফায় দফায় অপহরণকারীদের হাতে পড়ে সঙ্গীদের নির্মম মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন। দুই দিন আগের দুর্বিষহ স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে ফিরছে। কত দ্রুত আপনজনের কাছে ফিরবেন, সেটাই এখন ২২ বছর বয়সী এ তরুণের একমাত্র চাওয়া।

শনিবার (৩০ মে) দুপুরে মুঠোফোনে এ চাওয়ার কথা জানালেন ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশ পাড়ি দেওয়া সাইদুল ইসলাম।

তিনি জানালেন, লিবিয়া পৌঁছানোর পর বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের হাত বদল করে পাচারকারীরা। এরপর তাদের জিম্মি করে স্থানীয় অপহরণকারীরা। ওই অপহরণকারীরা টাকার জন্য লোকজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। এমনি এক ঘটনায় বাংলাদেশ ও সুদানের লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে অপহরণকারীদের হোতাদের। এরই জেরে বাংলাদেশ ও সুদানের ৩০ নাগরিক প্রাণ হারান অপহরণকারীদের গুলিতে।

লিবিয়ার মিজদা শহরে সেখানকার অপহরণকারীরা গত বৃহস্পতিবার এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ২৬ বাংলাদেশি ও ৪ সুদানিকে হত্যা করে। আহত করে অন্য ১১ বাংলাদেশিকে। ঘটনাস্থলে থাকা ৩৮ বাংলাদেশির মধ্যে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান সাইদুল। যদিও এক সারিতে দাঁড় করিয়ে অপহরণকারীরা পৈশাচিক উল্লাসে গুলি চালায় সবার ওপর। বেঁচে যাওয়ার পর গত দুই দিন লিবিয়ার স্থানীয় এক নাগরিকের জিম্মায় ছিলেন সাইদুল।

মাত্র দুই দিন আগে অনেকটা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান সাইদুল ইসলাম। চোখের সামনেই নিজের দেশের ২৬ জনের নিহত আর অন্য ১১ জনের আহত হওয়ার দৃশ্য ভুলতে পারছেন না তিনি। তাই মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে যাওয়া সাইদুল আজ দুপুরেও স্বাভাবিক হতে পারেননি। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার থমকে গেছেন।

বাংলাদেশ থেকে প্রথম কবে দেশের বাইরে পা রাখলেন জানতে চাইলে সাইদুল জানালেন, পাশের গ্রামের আরেক তরুণসহ তাদের দুজনকে দালালেরা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কলকাতায় পাঠায়। চার দিন কলকাতায় রাখার পর তাদের নেওয়া হয় মুম্বাইয়ে। মুম্বাই বিমানবন্দরে সাত থেকে আট ঘণ্টার যাত্রাবিরতি শেষে তাদের কুয়েতে নেওয়া হয়। কুয়েতের বিমানবন্দরে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রাবিরতির পর তাঁদের পরের গন্তব্য ছিল মিসরে। মিসরে ১৮ ঘণ্টা অবস্থানের পর তাঁরা দুজন পা রাখেন লিবিয়ার বেনগাজি শহরে। ত্রিপোলি থেকে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের ওই শহর দিয়েই মানবপাচারকারীরা বিভিন্ন দেশের লোকজনকে লিবিয়ায় আনে। এরপর ভূমধ্যসাগর হয়ে তাঁদের পাঠানোর চেষ্টা চলে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

সাইদুলের বর্ণনা অনুযায়ী ডিসেম্বরেই তার লিবিয়া পৌঁছানোর কথা। যদিও মাদারীপুরের ওই তরুণ বলছেন, `করোনা শুরুর অনেক আগে লিবিয়া এসেছি।`

সাইদুল জানান, বেনগাজিতে পৌঁছানোর পর মানবপাচারকারীদের টাকাপয়সা পরিশোধের পর অন্য আরেক শিবিরে পাঠানো হয়। অর্থাৎ মানবপাচারকারীদের প্রথম দলটি টাকাপয়সা বুঝে পাওয়ার পর আরেক দল মানবপাচারকারীর হাতে তাঁদের তুলে দেয়। দলটি বাংলাদেশের লোকজনকে নিয়ে যাবে ত্রিপোলিতে।

তিনি বলেন, `একদল অপহরণকারী আমাদের জিম্মি করে পরে অন্য একদল মাফিয়ার হাতে বিক্রি করে দেয়। ওই মাফিয়ারা আমাদের বেধড়ক পেটাতে থাকে। ১২ হাজার ডলার চায়, যার মানে হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। আমাদের সঙ্গে থাকা লোকজনের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। দরিদ্র বললেও কম বলা হবে। কাজেই এত টাকা দেওয়ার সাধ্য কোথায়!`

নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাইদুল জানান, হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে তাদের ছাদের সঙ্গে উল্টো ঝুলিয়ে রেখে বেধড়ক পেটায় অপহরণকারীরা। যারা টাকাপয়সা দিতে পারছেন না, তাদের মোটা প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে অনবরত পেটানো হয়।

দালালকে কত টাকা দিয়ে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন জানতে চাইলে সাইদুল বলেন, `বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার সময় সাড়ে তিন লাখ আর বেনগাজি পৌঁছানোর পর ত্রিপোলি যেতে আরও এক লাখ টাকা দিই। আমি কিন্তু ইতালি যেতে চাইনি। আমার ইচ্ছা ছিল, কয়েক মাস লিবিয়ায় থাকব। সুযোগ-সুবিধা বুঝে তারপর যাত্রা করব ইতালি। সেটা তো আর হলো না!`

সাইদুলের কাছ থেকে জানা গেল, তার মামাতো ভাই সজীব দাড়িয়া তাকে লিবিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। আর লিবিয়াতে কাকে টাকা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বেনগাজি পৌঁছানোর পর টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে লিবিয়ার মানবপাচারকারীরা বাংলাদেশের দালালদের মাধ্যমে টাকার লেনদেন করে।

বৃহস্পতিবারের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাইদুল ইসলাম বলেন, ২৭ রোজার পর অপহরণকারীরা শিবিরে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। টাকার জন্য অনবরত পেটাতে থাকে। এত টাকা তো সবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এমনও ঘটনা ঘটেছে, টাকা না পেলে তারা পিটিয়ে লোকজনকে মেরে ফেলে। আমাদের ওপর নির্যাতনটা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল। অনেকের শরীরের বিভিন্ন অংশ পিটিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। অপহরণকারীদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে সবাই মিলে ঠিক করলাম, এভাবে তো আর অত্যাচার সহ্য করা যায় না, সুযোগ পেলে অপহরণকারীদের ওপর হামলা চালাতে হবে। এই সিদ্ধান্তের পর সুদানের লোকজনই অপহরণকারীদের হোতাকে বুধবার পিটিয়ে মেরে ফেলে। এটা জানার পর মাফিয়ারা শিবির থেকে বাংলাদেশের ৩৮ জন ও সুদানের ৪ জনকে বের করে এনে পাখির মতো গুলি করে। আর আমি যে এখনো অক্ষত বেঁচে আছি, এটাই বিশ্বাস করতে পারছি না।`

এদিকে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর আ স ম আশরাফুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক বাংলাদেশি ছাড়া অন্য ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত। গুরুতর আহত ওই বাংলাদেশিকে সুস্থ করার জন্য সব রকম চেষ্টা চলছে। সুস্থ হয়ে গেলে ওই ১১ জনকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

লিবিয়াতেই দাফন করা হলো মানবপাচারকারীদের হাতে নিহত ২৬ বাংলাদেশিকে। শুক্রবার বাদ জুমা মিজদাহ কবরস্থানে তাদের দাফন হয়। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর এ এস এম আশরাফুল ইসলাম।তিনি জানান, এ ঘটনায় আহত ১১ বাংলাদেশির সবার অবস্থাই এখন স্থিতিশীল। ত্রিপোলিতে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

এর আগে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিসহ মোট ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করে স্থানীয় এক মানবপাচারকারীর দলের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বাংলাদেশ সময় রাত নয়টার দিকে লিবিয়ার মিজদা শহরে এই হত্যাকাণ্ড চালায় আন্তর্জাতিক পাচারকারীর সদস্যরা।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
আইটি উপদেষ্টা
সোহেল আসলাম
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2020. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close