২৩ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার ০৪:০৪:১৭ পিএম
সর্বশেষ:

০৪ আগস্ট ২০১৭ ১০:৫৭:১২ পিএম শুক্রবার     Print this E-mail this

মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে অজানা কথা

খোকন কর্মকার
বাংলার চোখ
 মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে অজানা কথা

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডার, রহস্য রোমাঞ্চে ঘেরা সুন্দরবন একটি স্বাধীন জাতির অভ্যুদয়, ৭৫ এর নভেম্বরের অভ্যুত্থান, গণবাহিনী এবং জানা অজানার রূপকথার নায়ক ও দুবলা ফিসারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন পিরোজপুরের সন্তান মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
সুন্দরবনের ‘মুকুটহীন সম্রাট’ মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ (৭৫) ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে পিরোজপুর শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দীন আহমেদ পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন।
১৯৬৮ সালে পিরোজপুর ছাত্র ইউনয়িনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী জিয়াউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৯ সালে পাকিস্থান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন এবং সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন।
মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউদ্দিনের অবদান:-পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণ, শোষণ, এবং অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব দিতে সারাদেশের মুক্তিকামী মানুষগুলো যখন স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে লাগল ঠিক তখন ১৯৭১ সালে ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম. এ জলিলের নির্দেশে সুন্দরবন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শক্ত ঘাঁটি গড়ার জন্য এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন মুক্তিবাহিনীর একটি দল নিয়ে রায়েন্দা বাজারে আসেন এবং থানা থেকে রাইফেল, গোলাবারুদ এনে ভাগ করে দেন। মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সুন্দরবনভিত্তিক মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়ে, অস্ত্র সংগ্রহের জন্য চলে যান তিনি। এসময় তিনি মুক্তিবাহিনীর দল গঠনের জন্য পরামর্শ দেন এবং সকল সুযোগসন্ধানী লুটেরা ডাকাত ও জন শত্রুদের প্রতিরোধের নির্দেশ দেন।

অল্পদিনের মধ্যে অস্ত্র গোলা বারুদ ও মুক্তিবাহিনীর একটি দল নিয়ে সুন্দরবনে আসেন এবং মুক্তিবাহিনীদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। অতঃপর  শরণখোলা- সুন্দরবন অঞ্চলে বিশাল মুক্তিবাহিনী দল ও ঘাঁটি গড়ে তোলেন। সুন্দরবন এলাকায় তারা নিজস্ব উদ্যোগে ফরেস্ট অফিসের বনরক্ষীদের নিকট থেকে অস্ত্র সংগ্রহ ও দেশীয় বন্দুক ব্যবহার করেন।

তার নেতৃত্বে শরনখোলা-সুন্দরবন এলাকায় ছোট বড় ৫২টি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে বগি, তেতুলবাড়িয়া ও স্টুডেন্ট ক্যাম্পসহ ৪টি বড় ক্যাম্প ছিল এখানে। এসব ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে তার নির্দেশনায় এক একটা গ্রুপে ভাগ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন জায়গায় অপারেশনে যেত। এছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যুবকদের এক একটা দলে ভাগ করে তিনি ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতেন। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে তারা সুন্দরবনে ফিরে এসে পাক বাহিনীদের অবস্থান জেনে পরিকল্পনা করে বিভিন্ন  এলাকায় অপারেশনের জন্য মুক্তিবাহিনীদের পাঠাতেন তিনি।

১৯৭১ সালের ১৮ আগস্ট তার পরিকল্পনায় সুন্দরবন এলাকার শেলা নদীতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বহনকারী খুলনা যাওয়ার পথে রকেট আক্রমণ করলে রকেটটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত আক্রমণ করলে রকেটটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রকেটে থাকা পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নিহত ও আহত হন।
১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীর সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টারসহ সমস্ত আস্তানায় পাকিস্তানি যৌথ বাহিনী ও রাজাকারসহ সপ্তাহব্যাপী সাঁড়াশি আক্রমণ করলে জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীরা প্রতিহত ও আত্মরক্ষায় সক্ষম হয়।

১৯৭১ সালের ১ জুন পাঞ্জাবী বাহিনীর নেতৃত্বে রাজাকারদের নিয়ে শরনখোলা থানার দোতলা বিল্ডিং এ ক্যাম্প স্থাপন করে। রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের দোতলায় ছোট একটি ক্যাম্প স্থাপন করে তারা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে মেজর জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা বাজারে রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। তার নেতৃত্বে ৭ ডিসেম্বর শরনখোলা হানাদার মুক্ত হয়। শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দার রণাঙ্গনে সম্মূখ যুদ্ধে শহীদ হন আসাদ, টিপু সুলতান, আলাউদ্দিন, গুরুপদ, আলতাফ। গুরুপদ ছাড়া অন্য চার শহীদের কবর স্মৃতিসৌধ রায়েন্দা পুকুর পাড়ে শহীদ মিনার চত্বর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আত্মত্যাগের এক ক্ষতচিহ্ন। এরপর সেখান থেকে প্রায় ২ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মোড়েলগঞ্জ বাজারে আক্রমন করেন তিনি। এ সময় কুঠিবাড়িতে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে তখন পাকবাহিনী পিছু হটে।
দেশের জন্য ১৯৭৩ সালে তাকে কারা ভোগ করতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন অঞ্চলে শত্রুদমনে বিরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে মুকুটহীন সম্রাট উপাধি দেয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ব্যারাকে ফিরে যান।
পরে তিনি মেজর হিসেবে পদমর্যাদা পান। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু যখন সপরিবারে নিহত হন তখন তিনি ঢাকায় ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলেন। ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার বিপ্লবে তিনি অংশ নেন। এরপর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কর্নেল তাহেরের সৈনিক সংস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তার অনুসারীদের নিয়ে সুন্দরবনে আশ্রয় নেন।
৭৬ সালের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে সেনা অভিযানে মেজর জিয়া গ্রেফতার হন। সামরিক আদালতে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি ও আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ নিয়ে তখন সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন শুরু করলে আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনও ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি লাভ করেন।
 ৮৩ সালে জেনারেল এরশাদের সময় মেজর জিয়াউদ্দিন দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন সিঙ্গাপুরে। এরপর ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে ছোট ভাই কামালউদ্দিন আহমেদ, ভাগ্নে শাহানুর রহমান শামীম ও কয়েককজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের দুবলার চরে।
বনদস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুরু করেন শুঁটকি মাছের ব্যবসা।
৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুন্দরবনের মূর্তিমান আতঙ্ক ডাকাত দল কবিরাজ বাহিনীর সঙ্গে শ্যালারচরে সরাসরি বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে নিহত হয় কবিরাজ বাহিনীর প্রধান কবিরাজ। মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন ১৯৮৯-৯১ সালে বিপুল ভোটে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর গড়ে তুলেন ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ কর্মসূচি নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুবলা ফিসারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনও জেলেদের নিয়ে, কখনও প্রশাসনকে সহায়তা দিয়ে ডাকাতদের নির্মূলে নায়কের ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এ কারণে সুন্দরবনের একাধিক ডাকাত গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এসব ডাকাত গ্রুপ জিয়াউদ্দিনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। তিনি একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন।
সর্বশেষ মোর্তজা বাহিনীর সদস্যরা পূর্ব সুন্দরবনের হারবাড়ীয়া ও মেহেরালীর চর এলাকার মাঝামাঝি চরপুঁটিয়ায় মেজর জিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বন্দুকযুদ্ধে মোর্তজা বাহিনীর চার সদস্য নিহত ও মেজর জিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
মেজর জিয়া মুক্তিযুদ্ধে নিজের ও অন্যদের অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে ‘সুন্দরবন সমরে ও সুষমায়’ নামে একটি বই লিখেছেন।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠি পিরোজপুর জেলা সংসদের সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী এমএ মান্নান জানান,আমরা পিরোজপুরে একজন অভিভাবককে হারালাম। মহান মুক্তিযুদ্ধে উপকূল ও দেশে তাঁর অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সকাল থেকেই তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পিরোজপুরের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। অবশেষে দুপুর ১২টার দিকে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়ার খবর নিশ্চিত হলে সাংবাদিক, শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি সকলের কণ্ঠে একই ধ্বনি উচ্চারিত হয় হারিয়ে গেলেন পিরোজপুরবাসীর নির্ভরযোগ্য এক অভিভাবক। তার গড়া প্রতিষ্ঠান পিরোজপুর আফতাব উদ্দিন কলেজে বইছে শোকের মাতম।






সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মমতাজ বেগম
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2019. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close