০১ নভেম্বর ২০২০, রবিবার ০৫:১৮:১১ এএম
সর্বশেষ:

১৪ আগস্ট ২০২০ ০১:৪৬:০০ এএম শুক্রবার     Print this E-mail this

সুদক্ষ পুলিশ গঠনে রাষ্ট্র ও জনগণের করণীয় (প্রসংঙ্গঃ সিঙ্গাপুর মডেল)

এ.এম জিয়া হাবীব আহসান, এডভোকেট
বাংলার চোখ
 সুদক্ষ পুলিশ গঠনে রাষ্ট্র ও জনগণের করণীয় (প্রসংঙ্গঃ সিঙ্গাপুর মডেল)

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন ( বিএইচআরএফ) এর পক্ষ থেকে সকলের প্রতি রইল সালাম ও শুভেচ্ছা।

আপনারা অবগত আছেন যে, অত্র সংস্থা অসহায় নির্যাতিত মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আইনগত সহায়তা ও অধিকার সচেতনতার পাশাপাশি জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া মানুষের নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের নিরপেক্ষ, কার্যকর এবং সুষ্ঠু ধারার তদন্ত গড়ে তোলার লক্ষ্যে থেকেই বাংলাদেশ মানবাধিকার কাজ করে যাচ্ছে।

অপরাধ দমনে এবং প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি বিধানে পুলিশের পাশাপাশি আমাদের প্রতিষ্ঠান অসহায় নির্যাতিত মানুষের তদন্ত ও আইনী সহায়তা দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু অপরাধমুলক কর্মকান্ডের ক্রমবর্ধমান ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর উপর সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এখন শুণ্যের কোটায়। কেননা কিছু কিছু ঘটনায় দেখা যায়, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাই সরাসরি অপরাধের সঙ্গে জড়িত। যাদের কাছে মানুষ আশা করে নিরাপত্তা, তারাই অনেক ক্ষেত্রে একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটায়। 

১৮৫৭ সালের বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন যখন ব্যর্থ হয় তখন থেকে বৃটিশ শাসক গোষ্ঠি তাদের নিরাপত্তা রক্ষায় একটি অনুগত বাহিনী গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয় এবং পরবর্তীতে ১৮৬১ সালে পুলিশ অ্যাক্ট মূলে গঠিত হয় পুলিশ বাহিনী। ১৮৬১ সালের পুলিশ বিধানের সারাংশে বর্ণিত হয়েছে সরকার ও সরকারী কর্মচারীদের নিরপত্তা বিধান ও সেবক হিসেবেই পুলিশ বাহিনী গঠন করা হলো। সেই বৃটিশ বাহিনীর মানসিকতায় গড়া ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাকেটর পরিবর্তন করে পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে প্রতিস্থাপন করা আজো সম্ভব হয়নি। ফলে পুলিশ জনগণের বন্ধুর স্থলে সরকার ও সরকারী কর্মচারীদের রক্ষক ও সেবক হিসেবে আজও পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে শুধু অপরিবর্তিত রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। বাংলাদেশ পুলিশের অধিকাংশ সদস্যদের অভিযোগ, নানা প্রকার সমস্যায় জর্জরিত পুলিশ সদস্যদের না আছে উপযুক্ত বেতন, ওভার টাইম, বিশেষভাতা, আপদকালীন ভাতা, না আছে বাসস্থান ব্যবস্থা, অফিস ব্যবস্থা, সরকারী যথার্থ মর্যাদা। নানা সমস্যায় জর্জরিত ও অনিয়মে পরিপূর্ণ পুলিশ বিভাগ। মামলার সঠিক সুষ্ঠু তদন্ত, দেশের আইন শৃংখলার উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন, আসামী গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কোন কাজই পুলিশ সঠিকভাবে করতে পারছে না। তাই আজ দেশের ও দশের স্বার্থে পুলিশ বিভাগের সংস্কার প্রয়োজন, ঢেলে সাজানো প্রয়োজন বৃটিশ আইন, নিয়োগ বিধি পরিবর্তন, অত্যাধুনিক ট্রেনিং ও অস্ত্রসস্ত্র। অনেকেই বলছে পুলিশ মানবাধিকার লংঘন করছে। পুলিশ সদস্য বলছে তাদের মানবাধিকারের প্রতি কারো লক্ষ্য নেই। আমরাসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এ অনিয়মের পরিবর্তন চাই, চাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের আধুনিক পুলিশ। চাই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সুদক্ষ ও বিচক্ষণ পুলিশ প্রশাসন। তারই প্রেক্ষিতে “সুদক্ষ পুলিশ প্রশাসন গঠনে রাষ্ট্র ও জনগণের করণীয়” নিয়ে আজকের এই প্রবন্ধ।
সুদক্ষ পুলিশ বলতে কি বুঝি ঃ
“সুদক্ষ পুলিশ বলতে আমরা সেই পুলিশকে বুঝি যিনি তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব, কর্তব্য সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ভুমিকা রাখতে পারেন। যিনি মানুষ হিসেবে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, তার পেশায় দক্ষ, অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ, সাহসী এবং মেধা ও মননে মানবাধিকারবাদী”।
পুলিশ বাহিনীর বেশীরভাগ সমস্যা, হতাশা, গঞ্জনা ও ব্যর্থতা দুরীকরণ করে আমরা যদি বিশ্বের যে সকল দেশের দক্ষ পুলিশ বাহিনী রয়েছে, সে সকল দেশের আদলে আমাদের পুলিশ বাহিনী গড়তে পারি, তাহলে একদিকে যেমন দেশে মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, তেমনি অন্যদিকে জনগণ পাবে উত্তম সেবা এবং আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির হবে উন্নতি। সেই ভাবনায় আমরা এমনই একটি দেশ সফর করি, যাদের পুলিশ বাহিনীর এবং আইন-শৃংখলার সুনাম আছে। সেই দেশটি সিঙ্গাপুর।
মানবাধিকার কর্মীদের সিঙ্গাপুর পুলিশ হেড কোয়ার্টার পরিদর্শন এবং মতবিনিময় ঃ
পুলিশের সাথে কাজ করতে গিয়ে আমরা অনুভব করেছি, আমাদের পুলিশ বাহিনীকে অন্যান্য দেশের দক্ষ পুলিশ বাহিনীর ন্যায় গড়তে সমস্যা কোথায়? সেজন্য আমরা “মানুষের জন্য” ডোনারের সহায়তায় “মানবাধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা” প্রকল্পের লার্নিং এবং শেয়ারিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মানবাধিকার নেত্রী এডভোকেট এলিনা খানের নেতৃত্বে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি মানবাধিকার প্রতিনিধি দল গত ২৪-২৮জুন ২০০৫ইং তারিখে সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স (এস.পি.এফ) হেড কোয়ার্টার পরিদর্শন করি।
আমাদের দলকে সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স তাদের অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে এবং একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রদর্শন করে। উক্ত প্রতিবেদনে তারা আমাদের সামনে সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্সের কর্মকান্ড ও পদ মর্যাদা সম্পর্কে এবং “নেইবারহুড পুলিশ সেন্টার”, “দি কমিউনিটি পুলিশিং” এবং সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্সের অন্যান্য কর্মকান্ড তুলে ধরে। যা সংক্ষিপ্তভাবে এখানে তুলে ধরা হলোঃ
অপারেশনাল কমিউনিটি পুলিশিং ইন দি সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স এর কর্মপরিধি ঃ
১) সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্সের অন্যতম বিষয় কমিউনিটি পুলিশিং পদ্ধতির মাধ্যমে সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা।
২) সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্সের মূল পদক্ষেপ কমিউনিটি পুলিশিং পার্টনার এবং ফোরামস।
৩) কমিউনিটি পুলিশিং এর ফলাফল।
লক্ষ্যঃ
অপরাধ ও হুমকির বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণকে সচেতন ও শিক্ষিত করে তোলা এবং একটি সুসংগঠিত ও সতর্ক সমাজ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ প্রদান করা।
১) সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্সের অন্যতম বিষয় কমিউনিটি পুলিশিং পদ্ধতির মাধ্যমে সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা।
এক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশ যেভাবে কাজ করে ঃ
নেইবারহুড পুলিশ সেন্টার (এন পি সি) পদ্ধতিতে মোট ৩২টি সেন্টার রয়েছে। প্রায় এক লক্ষ অধিবাসীদের জন্য ১টি এন পি সিতে ৮০-১০০জন অফিসার রয়েছে, প্রতিটি এনপিসি যেসব সেবা প্রদান করে তা হলো ঃ
১) দ্রুত সাড়া দেয়া ২) প্রতি সেবা ৩) মৌলিক তদন্ত
২) অপরাধ প্রতিরোধ মূলক শিক্ষা এবং কমিউনিটির অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করা।
নেইবারহুড পুলিশ সেন্টার (এনপিসি) এর মূল বৈশিষ্ট্য ঃ
১) বিকেন্দ্রীকরণ কর্তৃত্ব এবং স্বায়ত্তশাসনঃ সিঙ্গাপুর পুলিশ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং প্রভাব মুক্ত তারা নিজেদের কাজ নিজেরাই করে। অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় না।
২) ওয়ান ষ্টপ পুলিশের সর্বাত্মক সেবা সমূহ ঃ সিঙ্গাপুর পুলিশ একই জায়গায় একটি কেন্দ্র থেকে সার্বিক বিষয়ে জনগণকে সেবা প্রদান করে। যেমনঃ অভিযোগ গ্রহণ, ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো, ভিকটিমকে সর্বাত্মক সহায়তা করা ইত্যাদি।
৩) পুরো পুলিশিং ব্যবস্থার ফলাফলের জন্য স্থানীয়ভাবে জবাবদিহিতা ঃ সিঙ্গাপুর পুলিশ স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করে, তাই তাদের স্থানীয় জনগণের কাছে জবাবদিহিতা রয়েছে।
নেইবারহুড পুলিশ সেন্টার (এন পি সি) পদ্ধতির যৌক্তিকতা ঃ
# একটি বেশী শিক্ষিত ও স্বচ্ছল জনগোষ্ঠীর বাড়তি দাবী মেটাতে “সক্ষম একটি পুলিশিং পদ্ধতি প্রয়োজন”।
# সরকারী এজেন্সীসমুহের উত্তম সেবা প্রদান।
# স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার: সিঙ্গাপুর পুলিশ যেহেতু কমিউনিটিকে নিয়ে কাজ করে সেহেতু স্থানীয় সরকার পদ্ধতিতে জনগণ এবং পুলিশের যৌথ প্রভাব থাকে।
# নিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলা বিষয়ক সমস্যাগুলো সমাধানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পুলিশিং এর একটি আমন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণঃ নিরাপত্তা, আইন-শৃংখলা সংক্রাস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রয়োজন পড়ে সিঙ্গাপুর পুলিশ যৌথভাবে তাদের সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর ফলে তারা দ্রুত অপরাধ দমন করতে পারে।
উৎকৃষ্ট সেবার ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা ঃ
# সেবার প্রতিশ্রুতি ও কৌশলগত সেবা পরিকল্পনা।
# একটি সেবা উন্নয়নকারী ও নিরীক্ষাকারী বিভাগের দ্বারা ত্রুটি নিরূপন (মনিটরিং সিস্টেম)
# প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজের অনুশীলন।
সামাজিক দায়িত্বে মনোনিবেশ করা ঃ
# অফিসারদের মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করা।
# বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচীর মাধ্যমে সক্রিয়/কর্মশীল নাগরিকত্বে উৎসাহ প্রদান।
# রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি দেওয়া। যেমন এসপিএফ ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্টস সোস্যাল সার্ভিস এ্যাওয়ার্ড লাভ করে তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ।
কমিউনিটি পুলিশিং এর সহযোগিতার জন্য সিঙ্গাপুর পুলিশের নীতিমালা ঃ
# অংশীদারিত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ঃ সিঙ্গাপুর পুলিশ জনগণের সাথে যৌথভাবে একত্রে কাজ করে তাই জনগণের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত হয়।
# সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জন্য কমিউনিটির সর্বত্র জনগণের সঙ্গে একসাথে কাজ করা।
# কমিউনিটি অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা।
২) কমিউনিটি পুলিশিং পার্টনার এ্যান্ড ইনিসিয়াটিভ হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং সেক্টর, পার্টনার এবং ফোরামস এর সঙ্গে কাজ করা যেমন ঃ
১) কমিউনিটি পার্টনার ঃ আন্তমন্ত্রণালয় এবং সামাজিক সেবা সংস্থা সমুহঃ সরকারী এবং সামাজিক সেবা সংস্থা সমূহের সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করা।
২) ফ্যামিলি ভায়োলেন্স ডায়ালগ গ্রুপ (এফ,ভি,ডি,জি)ঃ পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ সংলাপ দল তৈরী।
৩) ইন্টার মিনিষ্ট্রি কমিটি অন ইয়ং ক্রাইম (আই,এম,ওয়াই,সি) ঃ যুব ও কিশোর অপরাধে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন।
৪) ছাত্র (স্কুল-পুলিশ লিঁয়াজো)
৫) স্থানীয় বাসিন্দা (তৃণমূল)
৬) বেসরকারী সেন্টার/ এ্যাসোসিয়েশন (জাতীয় অপরাধ প্রতিরোধ কাউন্সিল)
কমিউনিটি সেফটি এবং সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (সি,এস,এস,পি)ঃ
# একটি সুগঠিত ও দুরদর্শী কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সময় নিরূপন করে এগিয়ে যাওয়া।
# সামাজিক ও সরকারী সংস্থা সমূহ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করা।
# সামাজিক নিরাপত্তা ও আইন শৃংখলার উপর হুমকী প্রতিরোধ করা (তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে)।
নেইবারহুড ওয়াচ জোন (এন ডব্লিউ জেড) স্কীমঃ
# আবাসিক স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরী।
# অপরাধ প্রতিরোধ এডভোকেসীর মাধ্যমে অপরাধীকে চিহ্নিত ও প্রতিরোধের মাধ্যমে পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্য জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করা।
বেসরকারী/শিল্প কারখানা/ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনী যে কাজটি করেঃ
# জাতীয় অপরাধ প্রতিরোধ কাউন্সিল গঠন করেছে।
# উক্ত জাতীয় অপরাধ কাউন্সিলের প্রতিনিধি হচ্ছে, সরকার, পুলিশ, হোটেল, যানবাহন, স্থাপনা, ব্যাংকিং এবং ব্যবসা প্রতিনিধিগণ। তাদের সমন্বয়ে মূল অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠিত। এছাড়াও উপকমিটির প্লাটফর্ম গঠিত আছে।
৩) কমিউনিটি পুলিশিং এর ফলাফলঃ
নতুন হুমকি মোকাবেলাঃ
কমিউিনিটি পুলিশিং এর পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নির্মুলে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর পুলিশ জনগণের অংশ গ্রহণ ও নেটওয়ার্কের সহায়তায় এটি করে থাকে।
অপরাধের হারঃ
# প্রতি লাখ জনসংখ্যায় ৮১৩জন।
উপরোক্ত কার্যকলাপের ফলশ্রুতিতে সিঙ্গাপুর পুলিশ যা অর্জন করেছে তা হলোঃ
#বর্তমানে এবং গত দশকের ভিতর অপরাধের সংখ্যা কমে গেছে।
# কমিউনিটি পুলিশের কারণে সিঙ্গাপুর মূল পুলিশের দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
# পুলিশরা জনগণের কাছে “অভিভাবক” ও “বন্ধু সূলভ”।
# অফিসারদের নিজেদের মধ্যে পূর্ণতাপ্রাপ্তির অনুভুতি।
# অপরাধ দমনে মূল সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং কমিউনিটি পুলিশ অংশিদারিত্বের উপর জোর দেয়া।
# সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ হুমকী প্রতিরোধে কমিউনিটিকে উদ্ধুদ্ধকরণের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে পেয়েছে।
এককথায় আধুনিক সিঙ্গাপুর পুলিশের প্রধান দিকগুলো ঃ
সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্সের সঠিক কর্মপরিকল্পনা (যা পূর্বে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে) পুলিশকে আরো কার্যকর ও জনগণের কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে। সিঙ্গাপুর সরকার পুলিশ ফোর্সকে আরো আধুনিক করতে ২০০১ হতে ২০১০ সাল নাগাদ ১০ বছর মেয়াদী কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
প্রতিটি সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো সঠিক কর্মপরিকল্পনা সিঙ্গাপুর পুলিশ তা বিশ্বাস করে এবং প্রমাণ করেছে। তারা রাতারাতি এ অবস্থানে পৌঁছায়নি বরং ক্রমান্বয়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এ অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। ক্রমশঃ উন্নয়ন এবং সঠিক পরিকল্পনা সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্সকে সুদক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়তে সহায়তা করেছে। তারা এখন যে কোন গর্বিত নিরাপদ জাতির সাথে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম, কারণ তাদের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি খুবই ভাল। প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে তাদের মাত্র ৮১৩টি মামলা হয়। বিশ্বের যে কোন দেশে যদি ১ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে অপরাধ ১০০০ এর নীচে থাকে, তাহলে সেই দেশটি একটি নিরাপদ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। সিঙ্গাপুর নিজেকে একটি নিরাপদ দেশ হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ তারা আমাদের খুব বেশী দিন আগে স্বাধীন হয়নি। তাদের আইন শৃংখলা আমাদের চেয়েও খারাপ ছিল। সিঙ্গাপুরের তুলনায় আমাদের দেশ বড় ও জনবহুল হলেও দেশের এক একটি জেলা শহরকে আমরা সিঙ্গাপুর মডেলে সাজাতে পারি।
সিঙ্গাপুরের এই সফলতার মূল কারণ কি?
জিজ্ঞাসায় তারা বলেন, কমিউনিটির অংশ গ্রহণ সিঙ্গাপুর পুলিশের সাফল্য অর্জনের একটি মূল কারণ। যে কোন সফলতা নির্ভর করে জনগণের অংশ গ্রহণের উপর। সিঙ্গাপুর পুলিশ বাহিনী যথাযোগ্যভাবে কমিউনিটির অংশ গ্রহন নিশ্চিত করেছে। যা তাদের আইন শৃংখলা পরিস্থিতিকে খুব ভাল অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে এবং দেশটি সবার জন্য সবসময় নিরাপদ হয়েছে। কমিউনিটি পুলিশ বাহিনী এখন নিজেদেরকে পুলিশ মনে করে সামাজিক দায়িত্ব করে পালন এবং যে কোন অস্বাভাবিকতায় মূল পুলিশকে জানানোর দায়িত্ব নেয়। কমিউনিটি পুলিশ দৃস্কৃতিকারীকে ধরে এবং পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। দেশটিকে বিশৃংখল অবস্থা থেকে মুক্ত রাখার জন্য সিঙ্গাপুর পুলিশের “৯৯৯” এর ব্যবহার খুবই কার্যকরী। এমনকি জনগণ ইন্টারনেটের মাধ্যমেও মামলা দাখিল করতে পারে। জনগণ সিঙ্গাপুর পুলিশকে ভয় পায় না। দুস্কৃতিকারীরা জনগণ এবং পুলিশকে ভয় পায় যে তারা অপরাধ করলে কোন অবস্থাতেই শাস্তি এড়াতে পারবে না। দুই দশক আগেও সিঙ্গাপুরে অনেক অপরাধ হতো এবং আইন শৃংখলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। সুদক্ষ নেতৃত্ব, সঠিক পরিকল্পনা, জনগণের নিশ্চিত অংশগ্রহণ এবং পুলিশ ও জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর পুলিশ বাহিনী তারা নিজেদেরকে এশিয়ার দেশ গুলোর মধ্যে অন্যতম সুদক্ষ পুলিশ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ এবং সিঙ্গাপুর পুলিশ এর মধ্যে তুলনাঃ
সিঙ্গাপুর পুলিশ বাংলাদেশ পুলিশ
১. সিঙ্গাপুর পুলিশের সাথে বাংলাদেশের পুলিশের তুলনা করতে গেলে বলতে হয় দুই দেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে রাত দিন পার্থক্য। যে কোন প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট এবং দীর্ঘ মেয়াদী কর্মপরিল্পপনা প্রয়োজন যা সিঙ্গাপুর পুলিশ গ্রহণ করেছে। ১. বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় চার যুগ অতিক্রান্ত হলেও দেশের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী প্রধান প্রতিষ্ঠান পুলিশ বাহিনীর উন্নয়নের জন্য পোষাক বদলানো ছাড়া কোন সরকারই চোখে পড়ার মতো তেমন কোন পদক্ষেপ, কর্মসূচী, পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি।
২. যে কোন কার্যক্রমের সফলতা নির্ভর করে জনগণের অংশ গ্রহণের উপর। সিঙ্গাপুর পুলিশ বাহিনী যথাযোগ্যভাবে তাদের দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি কমিউনিটির জনগণের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করেছে। ২. বাংলাদেশ পুলিশ ইদানিং কালে ট্রাফিক পুলিশে কিছু কমিউনিটি পুলিশিং পদ্ধতি চালু করলেও তা শুধু ঢাকাসহ কয়েকটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, মূল পুলিশ বাহিনীতে কমিউনিটি পুলিশিং পদ্ধতি এখনও চালু করতে পারেনি। এছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন বেসরকারী সিকিউরিটি কোম্পানী তাদের নিজের উদ্যোগে বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটিতে নিরাপত্তার জন্য সিকিউরিটি গার্ড গঠন করেছে এবং যার ভাল ফলাফল জনগণ পেতে শুরু করেছে। কিন্তু এই সেক্টরে সরকারের যতটুকু পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন তার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং এই বেসরকারী সিকিউরিটি গার্ড পদ্ধতিও শুধুমাত্র ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই পদ্ধতি সারা দেশে প্রচলনের সরকারী বা বেসরকারী পর্যায়ের জোরালো কোন পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
৩. সিঙ্গাপুরে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জনগণকে এমনভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে যে, অপরাধীরা পুলিশের পাশাপাশি জনগণকেও ভয় পায়। কারণ তারা জানে সাধারণ জনগণের কাছেও তার কোর অপরাধ ধরা পড়লে কোন ভাবেই শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। জনগণ এবং পুলিশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জনগণ পুলিশকে কখনই ভয় পায় না। ৩. পক্ষান্তরে বাংলাদেশের চিত্র ঠিক তার উল্টো। পুলিশকে বন্ধু ভাবাতো দূরের কথা কোন সমস্যার সম্মুখীন হলেও সাধারণ মানুষ পুলিশের সংস্পর্শে না যেতে পারলেই যেন বেঁচে যায়। তারা পুলিশের সাথে কথা বলতে পর্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, না জানি কোন বিপদে পড়ে যায়। এখানে আসামীর চেয়ে বাদীর ভোগান্তি বেশী।
৪. সিঙ্গাপুর পুলিশ দেশের অপরাধ কর্মকান্ড দমনের জন্য জাতীয় অপরাধ প্রতিরোধ কাউন্সিল গঠন করেছে এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের যেমনঃ হোটেল, যানবাহন, স্থাপনা, ব্যাংকিং এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মূল অপরাধ প্রতিরোধ উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৪. বাংলাদেশের অপরাধ দমনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে সংসদীয় কমিটি থাকলেও সেখানে কোন পেশাজীবীদের অংশ গ্রহণ নেই এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ উপ-কমিটি নেই।
৫.সিঙ্গাপুরের প্রতিটি পুলিশ স্টেশন কম্পিউটার নেটওয়ার্কের দ্বারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। এছাড়াও সিঙ্গাপুর পুলিশ কল সেন্টার “৯৯৯” আধুনিকায়ন করা হয়েছে যাতে করে জনগণ তড়িৎ গতিতে পুলিশের সেবা পেতে পারে। সিঙ্গাপুরে জনগণ ইন্টারনেটের মাধ্যমেও মামলা দাখিল করতে পারে। তবে এতে অভিযোগকারীর কন্ট্রাক্ট নাম্বার, ঠিকানা বিস্তারিত থাকতে হয়। ৫. বাংলাদেশ পুলিশে কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি। ইন্টানেটের মাধ্যমে মামলা দাখিল বাংলাদেশ পুলিশের কাছে স্বপ্নের মতো এবং এ ধরনের কোন পদক্ষেপ নেবার সম্ভাবনা আছে কিনা তা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন কর্মসূচী দেখে অনুমান করাও দুরূহ ব্যাপার।
৬. সিঙ্গাপুর পুলিশ বাহিনীতে “ঊুব ডরঃহবংং” নামে ইন্টার এ্যাকটিভ বুথ চালু করা হয়, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য অপরাধী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির প্রতিকৃতি প্রস্তুত করা যায় এবং অপরাধ ঘটনার সম্ভাব্য অপরাধীকে চিত্রায়নের মাধ্যমে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতাও পরিমাপ করা যায়। ৬. বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে “ঊুব ডরঃহবংং” নামে ইন্টার এ্যাকটিভ বুথ চালু নেই। ভবিষ্যতে পরিকল্পনা আছে কিনা জনগণ জানেন না।
৭. সিঙ্গাপুর কমিউনিটি পুলিশ “নেইবারহুড পুলিশ সেন্টার” পদ্ধতিতে কাজ করছে। যাদের কাজ হলো কোথাও কোন ঘটনা ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে গমন ও পদক্ষেপ গ্রহণ, সেবা প্রদান, মৌলিক তদন্ত করা, জনগণকে অপরাধ প্রতিরোধ মূলক শিক্ষা প্রদান এবং উক্ত কাজে কমিউনিটিকে নিযুক্ত করা। এই পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হলোঃ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ব্যাপক স্বায়ত্ব শাসন প্রদান, ওয়ান স্টপে পুলিশের সর্বাত্মক সেবা প্রদান এবং স্থানীয় জনগণের কাছে জবাবদিহিতা। ৭. পক্ষান্তরে বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থান সম্পুর্ণ বিপরীত, পুলিশকে খবর দিলে সহজে সাড়া পাওয়া যায়না, এটা যেন নিয়েমে পরিণত হয়েছে। জনগণকে সেবা প্রদান করা যে পুলিশের একটি অন্যতম দায়িত্ব তা বাংলাদেশের পুলিশ হয়তো ভুলতেই বসেছে। অদক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্তের ফলে অপরাধীরা সাজা থেকে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশ পুলিশের জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে যখন যে সরকার ক্ষমতায় তখন তারা তাদের অনুগত বাহিনী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। “নেইবারহুড পুলিশ সেন্টার” পদ্ধতি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে চালু নেই।
৮. সিঙ্গাপুর পুলিশ একটি সেবা উন্নয়নকারী ও নিরীক্ষাকারী বিভাগের দ্বারা তাদের কাজের ত্রুটি নিরুপন করে (মনিটরিং সিস্টেম আছে) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কাজের অনুশীলন করে এবং সেবার প্রতিশ্র“তি ও কৌশলগত সেবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সিঙ্গাপুরের কমিউনিটি পুলিশ সামাজিক নিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলার উপর হুমকী প্রতিরোধ করার জন্য সামাজিক ও সরকারী সংস্থাসমুহ কর্তৃক গৃহীত যৌথ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করার জন্য “কমিউনিটি সেফটি এবং সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (সিএসএসপি)” নামে একটি সুগঠিত ও দুরদর্শী কর্মপরিকল্পনা গ্রহন করেছে যাদের প্রধান সেবা হচ্ছে সক্রিয় উত্তর প্রদান, সঠিক সমাধানের পথ দেখানো এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার জ্ঞানকে বিস্তৃত করে জনগণের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করা। ৮. বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মধ্যে তাদের কাজের মূল্যায়নের জন্য কোন স্বতন্ত্র বিভাগ নেই। সামাজিক নিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলার উপর হুমকী প্রতিরোধ করার জন্য সামাজিক ও সরকারী সংস্থা সমুহ কর্তৃক গৃহীত যৌথ কোন কর্মসূচী নেই।
৯. সিঙ্গাপুর পুলিশ আবাসিক স্বেচ্ছাসেবীদের নেটওয়ার্ক নেইবারহুড ওয়াচ জোন (এন ডব্লিউ জেড) স্কীম এর মাধ্যমে কাজ করে। ৯. বাংলাদেশ পুলিশে নেইবারহুড ওয়াচ জোন (এন ডব্লিউ জেড) স্কীম নেই।
১০. সিঙ্গাপুর কমিউনিটি পুলিশ বিভিন্ন সেক্টর, পার্টনার এবং ফোরামস এর মাধ্যমে কাজ করে যেমন, সরকারী এবং সামাজিক সেবা সংস্থাসমুহ, পারিবারিক সহিংসতা সংলাপ দল, কিশোর অপরাধে আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি, জাতীয় অপরাধ প্রতিরোধ কাউন্সিল ইত্যাদি। ১০. বাংলাদেশ পুলিশ এই ধরনের কোন সেক্টর পার্টনার এবং ফোরামস এর মাধ্যমে কাজ করে না।
১১. সিঙ্গাপুর পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত। ১১. বাংলাদেশের পুলিশকে রাজনৈতিক হীন স্বার্থে ব্যবহার করা হয়।
১২. সর্বোপরি বলা যায় কোন দেশে যে কোন সুদুর প্রসারী কর্মপরিল্পনার সঠিক ও সুন্দর বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব, যখন সেই দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি বিরাজ করে এবং দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। যা সিঙ্গাপুরে দীর্ঘদিন যাবত বিরাজ করছে ফলে তারা তাদের কাংখিত সাফল্যে পৌঁছাতে পেরেছে। ১২. পক্ষান্তরে বাংলাদেশে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার কারণে যে কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই বাংলাদেশে বিরাজ করেছে এক অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা। সুস্থ ধারার রাজনীতি এখানে দীর্ঘদিন যাবত অনুপস্থিত। যা উন্নয়নের মূল অন্তরায়।

সুদক্ষ পুলিশ প্রশাসন গঠনে বাংলাদেশ পুলিশ এবং সিঙ্গাপুর পুলিশের মধ্যে উপরোক্ত তুলনা ছাড়াও বাংলাদেশ মানবাধিকারের কিছু সুপারিশমালাঃ

রাষ্ট্রের করণীয়ঃ
আমাদের সংস্থা মনে করে সিঙ্গাপুরের মতো সুদক্ষ পুলিশ বাহিনী গঠনে উপরোক্ত বিষয়গুলোকে আমদের পুলিশ বহিনীতে সংযোজন করা খুবই প্রয়োজন।
১) “কমিউনিটি পুলিশিং” কার্যক্রম সরকারের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে জোরদার করা প্রয়োজন।
২) পুলিশের জন্য একটি স্থায়ী পৃথক “পুলিশ কমিশন” হওয়া উচিৎ। উক্ত “পুলিশ কমিশন” পুলিশের সকল সুযোগ সুবিধা তাদের দূর্নীতিসহ সকল কার্যক্রম অনুসন্ধান, তদন্ত, পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনে নীতিমালা প্রণয়ন করবেন। এই “পুলিশ কমিশন” সম্পূর্ণ ভাবে জুডিসিয়াল বিভাগের আন্ডারে থাকবে। এই কমিশনের সদস্য হবেন প্রাক্তন বিচারপতি।
৩) পুলিশ বিষয়ক সকল সদস্যা সমাধানে সরকারের সচেষ্ট হওয়া জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজন। তাদের নৈতিকতা ফিরিয়ে আনার জন্য মোটিভেশনের ওপর যেমন জোর দিতে হবে, তেমনি আইনের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে এবং সুষ্ঠু তদন্ত করার ব্যাপারে তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪) সরকার বর্তমানে পুলিশের বেতন-ভাতা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি করেছে। এছাড়ও জরুরী ভিত্তিতে প্রশাসনিক কাজে প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যাদি সরবরাহ করতে হবে। না হলে ভুক্তভোগীরা কখনও পুলিশের কাছ থেকে আন্তরিক সহযোগিতা পাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথক পুলিশ কমিশন গঠন না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সরকার নিজেই এই সকল প্রাস্তাবিত বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারেন। পুলিশ প্রশাসনকে অবশ্যই জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে সেই রকম মনিটরিং সিস্টেম তৈরী করা।
৫) ক্যাডার ও নন ক্যাডার বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে সমস্যা সমাধানে সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এই বিষয়ে আমরাও মনে করি পুলিশ বিভাগে তিন জায়গায় লোক ভর্তি না করে দুই ভাবে লোক নিয়োগ করলে ভালো। তাতে প্রশাসনিক জটিলতা ও বৈষম্য দূর হবে। যেমনঃ বৃটিশ পুলিশ কনস্টেবল লোক নিয়োগ করে এবং একদিন সেই চীফ কনস্টেবল হয়। (যাকে আমরা আইজি বলি) এই কনস্টেবলের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে এ লেবেল। আমাদের পুলিশ বাহিনীতে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে নূন্যতম এইচ এস সি পাশ হওয়া উচিৎ।
৬) কোন পুলিশ দূর্নীতি, অন্যায় এবং সন্ত্রাস করলে তার বিরুদ্ধে সাসপেন্ড, ক্লোজ, ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে আর দশ জন ব্যক্তির মতো অপরাধের দায়ে ফৌজদারী মামলা দায়ের করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এবং কোন সাধারণ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হলে ক্ষতিপূরণ দেবে দোষী পুলিশ ব্যক্তিটি তার বিধান রাখতে হবে।
৭) এছাড়ও বিভিন্ন সরকার প্রায়ই পুলিশকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে। সরকারের বিরুদ্ধে কোন প্রকার আন্দোলন হলে আইন-শৃংখলার দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং হচ্ছে। পুলিশ চাকরি হারানোর ভয়ে সরকারের নির্দেশ পালন করছে এবং কখনো সরকারের দোহাই দিয়ে পুলিশ ক্ষমতার অপ-প্রয়োগ করার সুযোগ গ্রহন করছে। যতক্ষণ সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার বন্ধ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত পুলিশের অরাজকতা চলবেই। তাই পুলিশ বাহিনীকে সিঙ্গাপুর পুলিশের মতো স্বায়ত্বশাসিত করতে হবে। রাষ্ট্রের দ্বারা তারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
৮) তদন্তকারী পুলিশ ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বা প্রশাসনিক পুলিশকে একই সঙ্গে দুই কাজে ব্যবহার করা যবে না। যেমনঃ একজন পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্ত করে, তেমনি একই সঙ্গে তাকে হরতাল, সন্ত্রাস দমন, মন্ত্রীদের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন আইন-শৃংখলার কাজে প্রতিনিয়ত জড়িত থাকতে হয়। যার ফলে সুষ্ঠু ভাবে কোন তদন্ত হয় না এবং অজুহাতে পুলিশ দিনের পর দিন মামলার ভুক্তভোগীদের ভোগায়। এই অবস্থা অনতিবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
৯) শিক্ষা ব্যবস্থায় জনসেচতনতামূলক সার্বজনীন আইন শিক্ষা চালু করতে হবে। যাতে সকল মানুষ আইন সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারনা লাভ করতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশকে সহায়তা করতে পারে তেমনি মানসিকতা তৈরীতে মোটিভেশন করতে হবে।
১০) লোভী, দূর্নীতিপরায়ন পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে বহিস্কার ও সৎ অফিসারদের পদোন্নতি দিতে হবে।
১১) বিকল্প তদন্ত ব্যবস্থা হিসেবে সরকারী সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারী তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
১২) পুলিশ বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় মুক্ত রাখতে হবে এবং তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না।
জনগণের করণীয়:
সুদক্ষ পুলিশ প্রশাসন গঠনে রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে জনগণ ঃ
১) জনগণের ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্যগণ মানুষের অধিকার রক্ষায় মূল কাজেই যুক্ত থাকেন। তারা দেশের আইন প্রণেতা। তারাই আইনের সংশোধন করেন, আইন তৈরী করেন। অতএব জনগণ এমন সৎ, শিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারে, যাতে করে তারা দেশের পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত সুদক্ষ করে গড়ে তুলতে আইন পাশ করতে পারে এবং যুগোপোযুগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে।
২) জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। জনগণের সেবা করা পুলিশের অন্যতম কাজ। পুলিশের কাছ থেকে সেবা আদায় করে নিতে হবে। সে জন্য পুলিশকে ঘুষ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। পুলিশ জোর করে ঘুষ আদায়ের চেষ্টা করলে ভয় না পেয়ে সবাই সংগঠিত হয়ে পুলিশের উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করতে হবে, প্রয়োজনে সাংবাদিক সম্মেলন করে দোষী পুলিশ সদস্যদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।
৩) জনগণকে তাদের নিজেদের প্রয়োজনে স্ব-উদ্যোগে সাধারণ কিছু আইন এবং এর ধারা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করতে হবে। যাতে করে এজহার লেখার সময় পুলিশ তাদের ঠকাতে না পারে বা জনগণ নিজেই এজহার লিখতে পারে। এ জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় সার্বজনীন আইন শিক্ষা চালু করতে হবে।
৪) শুধুমাত্র পুলিশ বাহিনীর একার পক্ষে দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণের জন্য জনগণ পুলিশকে বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করে সহযোগিতা করতে পারে। দোষী দাগী আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশকে জনগণ সহযোগিতা করতে পারে। জনগণ সামাজিকভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে সমাজের অপরাধীদের বয়কট করতে পারে এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারে। এর ফলে পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং পুলিশের কাজে কিছুটা হলেও জনগণের অংশ গ্রহন নিশ্চিত হবে। যা সিঙ্গাপুর পুলিশ করতে সমর্থ হয়েছে।
৫) জনগণ তাদের নিজেদের স্বার্থে নিজ এলাকার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য নিজ নিজ এলাকায় সন্ত্রাস বিরোধী কমিটি গঠন করতে পারে। এই কমিটি নিজ এলাকার সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরী করে পুলিশের কাছে দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬) সমাজের সচেতন নাগরিক এবং জনগণের প্রতিনিধি মেম্বার, চেয়ারম্যানগণ পুলিশের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন অপরাধের প্রচলিত আইন এবং তার শাস্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মিটিং, সভা-সমাবেশ করে সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তুলতে পারে। এই ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে নিজেদের এগিয়ে যেতে হবে।
৭) সরকারের সহযোগীতা নিয়ে জনগণ আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণের জন্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন করতে পারে। যে কমিটি পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে এবং সাধারণ মানুষ এবং পুলিশের মধ্যে যে দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা দূরীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করবে। পুলিশ সদস্যরা নিজেদের সেইভাবে উপস্থাপন করবে জনগণের কাছে।
৮) জনগণের মাঝে আইন-শৃংখলা রক্ষায় তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য পোষ্টার, লিফলেট, ষ্টিকার, বিলবোর্ড বিলি করা যেতে পারে। এই কাজটি করতে হবে পুলিশ প্রশাসনকে।
ক) যাতে জনগণ বুঝে পুলিশ বন্ধু, শত্রু নয়।
খ) পুলিশের কাছে গেলে জিডি ও এজহার করার জন্য টাকা দিতে হবে না।
গ) কোন সন্ত্রাসীকে ধরে দিলে পরের দিন নিজের জীবন যাবে না।

আমাদের সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স পরিদর্শনের ফলে যে শিক্ষা হয়েছে- প্রথমত ঃ তা হচ্ছে দেশ ও জনগণের সর্বময় উন্নয়নের জন্য একজন সুদক্ষ বিচক্ষণ নেতৃত্বের প্রয়োজন, একই সঙ্গে যথাযথ পরিকল্পনার সফল প্রয়োগ। দ্বিতীয়তঃ উন্নয়ন নিশ্চিত করণে কমিউনিটির অংশ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। জনগণের অংশ গ্রহণ ব্যাতিরেকে কোন উন্নয়নের প্রচেষ্টাই স্বার্থক করা বা তার সম্পূর্ণ প্রয়োগ করা অসম্ভব। এগুলো স্বপ্ন নয়, এটা করা সম্ভব। যা করছে সিঙ্গাপুর পুলিশ বাহিনী। তাহলে আমরা কেন পারবো না?

এ জন্য চাই যোগ্য নেতৃত্ব,সঠিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন তাহলে আমরা পাবো বাংলাদেশে সুদক্ষ পুলিশ বাহিনী এবং প্রশাসন।

লেখক : আইনজীবী, কলামিষ্ট, গবেষক, সু-শাসন ও মানবাধিকার কর্মী

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
আইটি উপদেষ্টা
সোহেল আসলাম
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2020. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close