২৩ অক্টোবর ২০২১, শনিবার ০৫:৩১:৪২ পিএম
সর্বশেষ:

৩১ মে ২০২১ ০৯:৩০:৪৪ পিএম সোমবার     Print this E-mail this

জিয়াউর রহমানের সেই উক্তিই সত্য হলো

ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন
বাংলার চোখ
 জিয়াউর রহমানের সেই উক্তিই সত্য হলো

১৭ জানুয়ারি, শনিবার, ১৯৮১ সাল, আমার জীবনের একটি অভাবনীয় দিন। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে অপেক্ষমাণ বিশাল একটি জাহাজ। জাহাজে ওঠার লাইনের তিন-চতুর্থাংশ পেছনে দাঁড়িয়ে আছি। একের পর এক সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে উঠতেই নাবিকরা নির্দেশ দিতে থাকল কোন পথে আমাদের জন্য নির্ধারিত কামরাগুলো। দাওয়াত পেয়েছিলাম মেধাবীদের ছাত্র তালিকায়, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, সেই সঙ্গে ছাত্রদল থেকে ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের প্রথমবারের মতো নির্বাচিত ভিপি। কামরাটি খুঁজে বের করে আমার কাঁধের ব্যাগটি রেখেই প্রেসিডেন্ট জিয়াকে দেখার উদ্দেশ্যে সিঁড়ির কাছে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পরই আর্মির বিউগলের শব্দ শুনতে পেলাম। চোখে কালো সানগ্লাস, সুদর্শন-স্মার্ট প্রেসিডেন্ট জেটিতে গার্ড অব অনার নিয়ে অন্য একটি পথে লাল গালিচার মধ্য দিয়ে জাহাজে উঠে গেলেন।


রাজকীয় এক হুইসেলের মধ্য দিয়ে জাহাজটি আস্তে আস্তে যাত্রা করল। তখন প্রায় দুপুর ২টা। ধীরগতিতে খরস্রোতা সমুদ্র মোহনার কর্ণফুলী নদী দিয়ে ‘হিজবুল বাহার’ এগিয়ে চলছে। একটু দূরেই দেখতে পেলাম কয়েকটি গানবোট। দুটি জাহাজের পেছনে এবং দুটি জাহাজের সামনে, সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে চলছে। কিছু দূর যাওয়ার পরই কর্ণফুলীর ডান তীরে সুসজ্জিত মেরিন একাডেমির ক্যাডেটরা, নৌবাহিনীর সৈনিকরা উচ্চৈঃস্বরে বিউগল বাজিয়ে লাল-সবুজের পতাকাবাহী জাহাজে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সামরিক কায়দায় সম্মান জানায়। উজ্জ্বল সূর্যের বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি শান্ত শীতল নীল জলরাশির ওপর এক অপরূপ জলকেলি করছিল। দেখতে না দেখতেই বিকাল গড়িয়ে সূর্যাস্তের সময় হলো। কী সুন্দর এ পৃথিবী, বিশাল জলরাশির মধ্যে লাল জ্বলন্ত সূর্যটি অগ্নিকুন্ডের মতো আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছিল। রক্তিম মায়াবী আভা এসে ঠিকরে পড়ছিল জাহাজের ডেকে। আমি একা নই, এ দেশের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিমনা সব শ্রেণি থেকে ২ হাজারের ওপর অতিথি নিয়ে তিনি এ শিক্ষা সফরে বের হন। মূলত হিজবুল বাহারে হাজীরা সৌদি আরব যেতেন পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ঢাকা যাতায়াত করত। এর পরও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের বিরাট অঙ্কের লোকসান গুনতে হতো।

সেই কখন যে খেয়েছি তা ভুলেই গিয়েছিলাম। এরই মধ্যে ডাইনিংরুমে সারিবদ্ধভাবে স্ন্যাকস রাখা হয়েছিল, সেদিকে কারও নজর ছিল না। সন্ধ্যা ৭টায় জাহাজের তৃতীয় তলার পেছনের দিকে সুইমিং পুলের পাশে সবাই জমায়েত হন। আমরা সবাই বসে আছি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। হঠাৎ দেখতে পেলাম নিরাপত্তারক্ষীদের কর্ডন ভেদ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এগিয়ে আসছেন। পাশে উপবিষ্ট বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। রাষ্ট্রপতির সামনে মাইকটি এগিয়ে দিলেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর স্বভাবসুলভ সৌজন্য প্রকাশ করে তাঁর চশমাঢাকা চোখ দুটি দিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অবলোকন করলেন। বললেন, ‘শোনো ছেলেমেয়েরা! আমি তোমাদের বাংলাদেশের ডাঙা থেকে উত্তাল বঙ্গোপসাগরের মধ্যখানে নিয়ে এসেছি।’ একটু আবেগময় কণ্ঠে রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, মুহূর্তের মধ্যে সব ফিসফাস স্তব্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হলো না সাগরের তরঙ্গের উচ্ছ্বাস, জাহাজের পেছন দিক হওয়ায় ইঞ্জিনের ধাতব গিগি শব্দ ভেসে আসছে। তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘সমুদ্র হলো অন্তহীন পানির বিস্তার ও উদ্দাম বাতাসের লীলাক্ষেত্র। এখানে এলে মানুষের হৃদয় একই সঙ্গে উদার, উদ্যমী ও সাহসী হয়ে ওঠে। তোমাদের আমার বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সংকীর্ণতা ও কূপমন্ডূতাকে পরিহার করে সমুদ্রের মতো উদার ও ঝড়ো হাওয়ার মতো সাহসী হতে হবে। আমি তোমাদের কাছে এখন যে কথা বলব তা আমাদের জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক তাগিদ। এ তাগিদকে স্মরণীয় করার জন্য আমি একটা পরিবেশ খুঁজছিলাম। হঠাৎ বঙ্গোপসাগরের কথা মনে পড়ল। এ উপসাগরেই রয়েছে ১০ কোটি মানুষের উদরপূর্তির জন্য প্রয়োজনেরও অতিরিক্ত আহার্য ও মূলভূমি ভেঙে আসা বিপুল পলিমাটির বিশাল দ্বীপদেশ যা আগামী দুই-তিন প্রজন্মের মধ্যেই ভেসে উঠবে। যা বাংলাদেশের মানচিত্রে নতুন বিন্দু সংযোজনের তাগিদ দেবে। মনে রেখ, আমাদের বর্তমান দরিদ্রতা, ক্ষুধা ও অসহায়তা আমাদের উদ্যমহীনতারই আল্লাহ-প্রদত্ত শাস্তিমাত্র। এর জন্য অন্যের চেয়ে আমরাই দায়ী বেশি। আমাদের ভিটাভাঙা পলি যেখানেই জমুক তা তালপট্টি কিংবা নিঝুমদ্বীপ এ মাটি আমাদের। ১০ কোটি মানুষ সাহসী হলে আমাদের মাটি ও সমুদ্র-তরঙ্গে কোনো ষড়যন্ত্রকারী নিশান উড়িয়ে পাড়ি জমাতে জাহাজ ভাসাবে না। মনে রেখ, আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা ১০ কোটি মানুষ যথেষ্ট সাহসী নই বলে শত্রুরা, পররাজ্য লোলুপ রাক্ষসেরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এ স্বাধীন জলাধিকারে আনাগোনা শুরু করেছে। তোমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়ে, দেশের দরিদ্র পিতা-মাতার সর্বশেষ আশার প্রাণকণা, যাদের ওপর ভরসা করে আছে সারা দেশ, সারা জাতি। তোমরাই হলে বাংলাদেশের হাজার বছরের পরাধীনতার কলঙ্ক মোচনকারী প্রত্যাশার আনন্দ-নিঃশ্বাস। ইতিহাসের ধারায় দৃষ্টিপাত করলেও তোমরা জানবে এ সমুদ্র ছিল আমাদের আদিমতম পূর্বপুরুষদের নৌশক্তির স্বাধীন বিচরণভূমি। এমনকি বৌদ্ধ যুগে পাল রাজাদের অদম্য রণপোতগুলো এ জলাধিকারে কাউকেই অনধিকার প্রবেশ করতে দেয়নি। সন্দেহ নেই, আমাদের সেই পূর্বপুরুষগণ ছিলেন যথার্থই শৌর্যবীর্যের অধিকারী। তখন আমাদের সেসব পূর্বপুরুষ ছিলেন নগণ্য। কিন্তু আমরা সারাটা উপমহাদেশ, সমুদ্রমেখলা দ্বীপগুলো আর আসমুদ্র হিমাচল শাসন করেছি। বল, করিনি কি?’

তিনি আরও বললেন, ‘আমাদের রয়েছে যোজন যোজন উর্বরা জমি। একটু আয়েশের ফলেই ফসলে ঘর ভরে যেতে পারে। অর্থের অভাবে শুধু কোনো বৈজ্ঞানিক চাষের উদ্যম নেওয়া যাচ্ছে না। কে আমাদের বিনা স্বার্থে এ উদ্যমে সহায়তা করবে? কেউ করবে না। অথচ যে সম্পদের বিনিময়ে অর্থের প্রাচুর্য ঘটে তা আমাদের দেশের পেটের ভিতরেই জমা আছে। আমরা তুলতে পারছি না।’ তিনি তখন বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের রয়েছে সাত রাজার ধন- তেল, গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর আরও অনেক কিছু। আমরা তো আমাদের গ্যাস মাত্র খানিকটা তুলেছি, তিতাস, বাখরাবাদের মতো অসংখ্য গ্যাস উত্তোলন কেন্দ্র দরকার।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে আরও বললেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ পাশে দন্ডায়মান এডিসিকে তেলের শিশিটি দিতে বললেন। আমরা সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আমার জীবনকালে সম্ভবপর না হলে তোমরা আমার ছেলেমেয়েরা, এই তেল তুলবে।’ তিনি আরও বললেন, ‘শোনো ছেলেমেয়েরা! আমি তোমাদের সান্নিধ্য পেয়ে খুবই খুশি। তিনটি দিন ও তিনটি রাত আমরা এ দরিয়ায় নোনা বাতাসে দম ফেলতে এসেছি। এখন এ জাহাজটিই হলো বাংলাদেশ। আর আমি হলাম তোমাদের ক্যাপ্টেন।’ সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাষ্ট্রপতির কথা শুনছিলাম। সবার চোখে মনে হচ্ছিল কী যেন বিশাল প্রাপ্তির তৃপ্ত চাউনি। আমরা শুধু জাহাজের ওপর আছড়ে পড়া সমুদ্রের ঢেউগুলোর শব্দই শুনতে পাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিয়ে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থার শিল্পীরা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট...’ গাইতে শুরু করলেন। প্রথম রাত এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে জাহাজের বাংকারের বিছানায় নিশ্চিন্ত মনে গভীর সুখনিদ্রায় পার করলাম।

‘সকাল সাড়ে ৭টায় নাশতা সেরে জাহাজের ডেকের ওপরে গিয়ে দেখি পাশে আরেকটি ছোট জাহাজ আটকানো আছে আমাদের এ বিশাল জাহাজটির সঙ্গে। সেই জাহাজটিতে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা এসেছিলেন আমাদের এ সমুদ্রসীমার ভিতরে যে অমূল্য জীববৈচিত্র্যসম্পন্ন সম্পদ রয়েছে তার প্রতিপাদন দেখাতে। ঠিক তেমনিভাবে আরেকটি জাহাজে ভূতত্ত্ববিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রপতিকে তাদের আহরিত খনিজ সম্পদের প্রতিপাদন দেখালেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সব শিক্ষার্থীকে নিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সীমানা, খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ ও সমুদ্রগহ্বরে অবারিত জলজ ও ঔষধী উদ্ভিদ সম্পদ একের পর এক দেখালেন।

দ্বিতীয় দিন দুপুরে ওপরে তাকিয়ে দেখলাম বিমানবাহিনীর জেট বিমানগুলো কীভাবে আকাশ পাহারা দেয় সেই মহড়া। সেই সঙ্গে যুদ্ধজাহাজ ‘ওমর ফারুক’ থেকে বিমানবিধ্বংসী কামান গর্জে উঠল। বিকালবেলায় আবারও যুদ্ধজাহাজ থেকে কীভাবে টর্পেডো ছুড়ে সাবমেরিন ধ্বংস করে সে মহড়াও দেখানো হলো।

বিকালে ডেকের ওপরে তাঁর সঙ্গে আমরা কয়েকজন ছাত্র কথা বলতেই তিনি বললেন, পত্রিকা রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে নৌবিহারে যাওয়ার সমালোচনা করেছে। তিনি বললেন, ‘সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখ, দিগন্ত মেলে কত দূরে এ আকাশটি মিলে গেছে পানির সঙ্গে, তোমাদের মনটিকে এ বিশাল সমুদ্রের মতো আকাশসমান উচ্চতা নিয়ে বড় করতে হবে।’

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগমুহূর্তে আজ সবাই রুম থেকে বেরিয়ে এলেন সমুদ্রবক্ষে সূর্যাস্ত দেখার জন্য। যখন চারদিকে আঁধার নেমে এলো, সংকেত পেয়ে সবাই উঠে এলাম জাহাজের ছাদে। বিচ্ছুরিত হলো বিশাল এক আলোর কুন্ডলী আকাশে, গিয়ে পড়ল বহুদূরে। আমরা শুধু শুনতে পেলাম গানবোট থেকে বিকট গুলির শব্দ। এ ছাড়া অ্যান্টিএয়ারক্রাফট, যুদ্ধবিমান এফ-৬, মিগ-২১-এর নানারকম কসরত যেমন নাইট ফ্লেয়ার, স্মোক ডিসপ্লে ইত্যাদি চলছিল। আকাশে বিমানবাহিনীর মহড়া, পাশাপাশি সমুদ্রে নৌমহড়া। প্রাণজুড়ে আমরা সবাই দেখলাম।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাহাজে অবস্থানরত প্রত্যেক শ্রেণি, পেশা, গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে পৃথকভাবে সকালের নাশতা কিংবা দুপুরের মধ্যাহ্নভোজ বা রাতের খাবারের সময়ে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলেন। আমরা শিক্ষার্থীদের সৌভাগ্য হয়েছিল মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নৈশভোজ করার। প্রতিদিন রাতে সব অতিথির সঙ্গে আলাপচারিতা শেষ করে হিজবুল বাহারে তিনি তাঁর রাষ্ট্রপতির ভ্রাম্যমাণ কার্যালয়ে বসে রাষ্ট্রপতির দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পাদন করতেন। শুনেছিলাম, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের লোকসান গোনা হিজবুল বাহার হস্তান্তর করেছিলেন নৌবাহিনীতে।

তৃতীয় দিনের প্রত্যুষে সূর্য ওঠার আগে কোনো একসময় রাষ্ট্রপতি আবার চলে এলেন আমাদের হাতছানি দিয়ে তাঁর কর্মব্যস্ততার জীবনে। আমাদের জাহাজখানি সুন্দরবন, হিরণ পয়েন্ট হয়ে গভীর সমুদ্রে যায়। ফেরার সময় দিগন্তহীন সমুদ্রের দিকে আনমনে তাকিয়েছিলাম আর ভাবছিলাম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা। আমি রাষ্ট্রপতির কথা বলার সময় মাঝেমধ্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধাবী শিক্ষার্থীদের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। মনে হচ্ছিল, আমারা সবাই যেন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সেই সাত রাজার ধন পেয়েছি। মনে হচ্ছিল, আল্লাহ বোধহয় তাঁর অবারিত সব অমূল্য সম্পদ আমাদের দিয়েছেন। মনে মনে সেদিন আল্লাহর কাছ দোয়া করেছিলাম তিনি যেন আমাদের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দীর্ঘজীবী করেন। নিজেকে বাংলা মায়ের সন্তান হিসেবে গর্বিত বোধ করছিলাম। কী নেই আমাদের এ দেশে। মনে হলো কবির দুটি পঙ্ক্তি- ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি’।

একজন সৈনিকের জীবনে সবচেয়ে মহান ব্রত হলো দেশমাতৃকার সেবায় জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রিয় দেশকে স্বাধীন করে তাঁর সামরিক জীবন সার্থক করেছেন। ১৯৭১ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন মেজর হিসেবে সেনাবাহিনীর আইনকানুন উপেক্ষা করে নির্ঘাত কোর্ট মার্শাল হবে জেনেও তিনি বলেছিলেন, উই রিভোল্ট। জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি এমন ঘোষণা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। একজন সামরিক অফিসারের আজীবন স্বপ্নের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়েছিলেন তিনি, হয়েছিলেন সেনাপ্রধান।

তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা, দার্শনিক চিন্তাভাবনা তাঁকে সুদূরপ্রসারী চিন্তাবিদ বানিয়েছিল। যা আমরা সাধারণত দেখতে পাই জামাল আবদেল নাসের, ফিদেল কাস্ত্রো, দানিয়েল ওর্তেগা, মার্শাল টিটো, কামাল পাশা প্রমুখ রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে। তাঁর চিন্তাভাবনার প্রসারতা ও গভীরতার ভিত্তি এত শক্ত ছিল যে, তিনি ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-কালভেদে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার মূলমন্ত্র বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হয়েছিলেন। আমরা দেখেছি ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো দর্শনভিত্তিক হয়নি বলে এভারেস্টচুম্বী জনপ্রিয় হয়েও অনেক দল বরফগলা পানির মতো বিলীন হয়ে গেছে।

নবীন ছাত্র হিসেবে যে বক্তব্য শুনেছিলাম রাষ্ট্রপতি জিয়ার কণ্ঠে, জলে ভাসা আমাদের ভিটেমাটি ওই বঙ্গোপসাগরের আঙিনায় গিয়ে বিন্দু বিন্দু করে জমে আমাদের ভৌগোলিক সীমানার পরিবর্তন আনবে। তাই তো আমরা আজ পেয়েছি নিঝুমদ্বীপ। ব্রিটিশ নাগরিক র‌্যাডক্লিভের অঙ্কিত সীমানা হাড়িয়াভাঙা নদীর পাড়ে বঙ্গোপসাগরে ভেসে ওঠা তালপট্টি হবে আমাদের আস্তানা। রাষ্ট্রপতি জিয়া বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে আছে অমূল্য সম্পদ- তেল, গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর’ ইত্যাদি। হিজবুল বাহারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধাবী শিক্ষার্থীদের তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার সময়ে যদি এ মহামূল্যবান খনিজ সম্পদ উত্তোলন না-ও করতে পারি, তোমরা তা করবে।’

আজ ৩০ মে, ২০২১ সাল, জিয়াউর রহমানের ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকীতে মনে করিয়ে দেয় ১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে হিজবুল বাহারে তাঁর অমর উক্তিগুলো। আজ আমরা সত্যিই ঐতিহাসিকভাবে দৃশ্যমান প্রমাণ পেয়েছি, দক্ষিণবঙ্গে সব মিলিয়ে ২০২১ সালে দেশের ভূখন্ডের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে ২৫০ বর্গকিলোমিটার। শহীদ জিয়া আরও দেখিয়েছিলেন, সমুদ্রবক্ষ থেকে আহরিত খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ ও সমুদ্রগহ্বরে অবারিত জলজ ও ওষুধি উদ্ভিদ সম্পদ। যাকে আজকের দিনে বলা হয় সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) যে ধারণাটি দিয়েছিলেন অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ১৯৯৪ সালে। আর ২০১৪ সালে এসে আজকের বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্লু ইকোনমির কথা বলছে। যা বলে গিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান আজ থেকে ৪০ বছর আগে। তাহলে শহীদ জিয়ার উক্তিই আজ সত্য হলো।

লেখক : সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী চেয়ারম্যান, এডুকেশন রিফর্ম ইনেশিয়েটিভ (ইআরআই)

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
আইটি উপদেষ্টা
সোহেল আসলাম
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2021. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close