১৬ অক্টোবর ২০২১, শনিবার ০৫:৪৮:৪৩ পিএম
সর্বশেষ:

১৪ অক্টোবর ২০২১ ১২:১০:০৮ এএম বৃহস্পতিবার     Print this E-mail this

ফিলিপাইনের কালো আখের বানিজ্যিক চাষে নজর যশোরের কৃষকের

মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর
বাংলার চোখ
 ফিলিপাইনের কালো আখের বানিজ্যিক চাষে নজর যশোরের কৃষকের

এক বিঘা জমির আখ বিক্রি করে প্রায় তিন লাখ টাকা লাভ করা যায়। পাশাপাশি চিবিয়ে খাওয়ার সু-স্বাদু কৃষি পণ্য ফিলিপাইনের কালো বা ব্লাক আখ। বিঘায় আখ চাষের জন্য ২৫০০ চারা রোপণ করতে হয়। এখান থেকে প্রায় ১০ হাজার আখ পাওয়া যায়। একটি আখ গাছ থেকে ৯ থেকে ১১টি আখ পাওয়া যায়। আখ চাষ করতে হয় অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে। প্রথমে জমি ভালোভাবে চাষ দিতে হয়। তারপর লম্বা লম্বা সারি করে আখের চারা রোপণ করতে হয়। নিয়মিত আখ ক্ষেত পরিচর্যা করতে হয়। রোগ বালাই তুলনামূলক কম। আখ রোপণের ১০ মাস পর বাজারে বিক্রির উপযুক্ত হয় যেখানে দেশী আখের উৎপাদন সময় ১৩/১৪ মাস বা আরো বেশি। কালো বা ব্লাক আখে এবার নজর পড়েছে যশোরের কৃষকের। তবে সংশ্লিষ্ট জেলা কৃষি বিভাগ থেকে এখনো এই আখ সম্পর্কে এখনো কোন দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
আখ চাষের উর্বর ক্ষেত্র যশোর। তরি তরকারি চাষের জন্য আখ চাষ কিছুটা কমেছে। তবে চলতি মৌসুমে লাভজনক হওয়ায় কৃষক এবার আখ ও পাট চাষে আগ্রহী। এখন পাট চাষের সীজন নয়। চলছে আখ চাষের মৌসুম। কৃষকরা আখের চারা সংগ্রহ ও রোপণে ব্যস্ত। যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার হাট মান্দারতলা গ্রামের কৃষক বকুল মোড়ল জানান, শুনেছি কালো আখ চাষ লাভজনক। এই বিদেশী ফসলটি ইতিমধ্যে দেশের চাষীদের মাঝে লাভজনক পণ্য হিসেবে পরিগনিত হতে শুরু করেছে। একই গ্রামের আবুল বাশার তরুন বলেন, তারা চুয়াডাঙ্গায় যাবেন বিদেশী কালো আখ চাষ দেখতে। হাতে কলমে চাষাবাদ শিখতেই এরা সেখানে যাচ্ছেন।
ফিলিপাইনের ব্লাক আখ বেশ ভালো জাতের আখ। এ আখের মিষ্টতা অনেক বেশি ও নরম থাকায় বৃদ্ধ মানুষজন এই আখ অনায়সে চিবিয়ে খেতে পারে। বানিজ্যিকভাবে ফিলিপাইন ব্লাক আখ চাষ করে অল্প সময়ে অধিক মুনাফ অর্জন করা সম্ভব। আখের জমি ৩/৪ বার চাষ ও মই দিয়ে প্রস্তুত করতে হয়। পানি নিষ্কাশনের জন্য সুবিধা মত নালা কাটতে হয়। এরপর চাষ উপযোগী মাটি তৈরীর পালা। ব্লাক আখ এঁটেল, দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে ভাল জন্মে। জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে এঁটেল-দোআঁশ মাটিতেই সব থেকে ভাল হয়। জমি নির্বাচনের সময় উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে বা যে জমিতে পানি জমে থাকে না এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। রোপণের সময়: চিবিয়ে খাওয়ার যোগ্য আখ রোপণের উপযুক্ত সময় হলো অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। আখের চারা রোপণের সর্বোত্তম সময় হলো মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বর।
ফিলিপাইন আখের পরিচর্যা। পোকা মাকড় ও রোগ বালাই: আখে সাধারণত ডগা-কান্ড মাজরা পোকা, উঁইপোকা লাল পচা রোগ হয়। কিন্তু ফিলিপাইন ব্লাক আখে এ সকল রোগ খুব একটা দেখা যায় না ।
পানি সেচের সময়: যদি আখের কাটিং লাগানের ১০/১৫ দিনের মধ্যেও অঙ্কুর বের না হয় তাহলে হালকা সেচ দেওয়া ভালো। এবারফসল সংগ্রহের পালা। আখ পরিপক্ক হতে সাধারণত ১২- ১৫ মাস সময় লাগে কিন্তু ফিলিপাইন ব্লাক আখ এক বছরের মধ্যেই বাজার জাত করা যায়।
ফিলিপাইন ব্লাক আখের বৈশিষ্ঠ: এ আখ বেশ নরম। হাতের নখ দিয়েও চামড়া ছাড়ানো যায়।
অন্য যে কোন আখ থেকে এই আখের মিষ্টতা অনেক বেশি। রসগোল্লা যেমন রসে ভরপুর থাকে এই আখ তেমনি রসে ভরপুর। এই আখ নরম হওয়ায় কামড় দিলে রসে মুখ ভরে যায়। ফলে বৃদ্ধ মানুষ অতি সহজেই এই আখ খেতে পারবে। পাশাপাশি এই আখের বাজার মূল্য অনেক বেশি। এ কারনে কৃষক লাভবান হবেন বেশি।
আখের উচ্চতা। বাজারে যে আখগুলো আমরা দেখতে পাই সেগুলা সাধারণত সবোর্চ্চ ১০ ফিট বা তার একটু বেশি হয়ে থাকে, কিন্তু ফিলিপাইন জাতের আখের উচ্চতা প্রায় দ্বিগুন হয় (২০ থেকে ২৫ ফুট)।
আখ চাষের খরচ : এই আখ চাষের জন্য অন্য আখ থেকে বেশি খরচ হয়ে থাকে। আখ নরম হওয়ার কারণে শিয়ালের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ক্ষেতের চারপাশে নেট দিয়ে বেড়া দিতে হয়। আখ বড় হলে বাঁশের খুটির সাথে বেধে দিতে হয় কারণ এই আখের উচ্চাতা অনেক বেশি। এসকল কারণেই খরচটা একটু বেশি হয়। ফিলিপাইন ব্লাক আখের রং কালো। যদিও বাজারে আমরা বিভিন্ন রঙের আখ দেখতে পাই, এদের মধ্যে কোনটা আছে একটু লালচে রঙের আবার কোনটা একটু সাদা, ঈশৎ হলুদ এবং মাঝে মাঝে কালো রঙের আখও দেখা যায়। ফিলিপাইন জাতের এই আখটা মোটামুটিভাবে লালচে খয়েরী রঙের হয়। যা দেখতে কালোর কাছাকাছি।
চুয়াডাঙ্গা জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষবাদ হচ্ছে ফিলিপাইনের কালো আখের। অন্য ফসলের চেয়ে আখ চাষ লাভজনক হওয়ায় এবং বাজারে এ জাতের আখের চাহিদা থাকায় চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা।
এ আখ চাষে প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয় এক লাখ টাকা কিন্তু খরচ বাদে প্রতি বিঘায় লাভ হয় দেড় লাখ টাকা বা তার বেশি। তাই প্রতি বছর এ আখ চাষ ছড়িয়ে পড়ছে জেলায়। যশোরের আখ চাষীরা এই কালো আখে নজর দিয়েছেন। তারা কালো আখের চাষাবাদ সম্পর্কে খোজ খবর নিচ্ছেন।
ফিলিপাইনের কালো আখ খেতে মিষ্টি, রসালো ও নরম। আখের গায়ের রঙ কালো হলেও ভেতরের রঙ সাদা। বাজারে প্রচলিত আখ থেকে ভিন্ন হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে চাহিদা বেশি। আখ লম্বায় বড় হওয়ায় বাঁশের মাচা দিতে হয়। প্রতি পিচ আখ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা দরে। চুয়াডাঙ্গায় আখের চাহিদা মিটিয়ে মাঠ থেকে আখ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন পার্শ্ববর্তী জেলার ক্রেতারা।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শঙ্করচন্দ্র ইউনিয়নের দিননাথপুর গ্রামের কৃষক হারিছ চৌধুরী ২০১৮ সালে সর্বপ্রথম ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ করেন। তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে এ জাতের আখের চারা পান। তিনি প্রথমে তিন কাঠা জমিতে পরীক্ষা মূলক আখ চাষ করেন। আখের মান ভালো, বাজরে চাহিদা ও লাভজনক হওয়ায় পরের বছর সাড়ে চার বিঘা জমিতে চাষ করেন। তিনি আখের চারা তৈরি করে জেলার অন্য কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন। প্রতিটি আখের চারা ২০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকরা চারা নিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলার চারটি উপজেলায় ১০০ বিঘা জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। গাছ লাগানোর পর একটি আখ লম্বায় ১৫-২০ ফুট হয়। আখ ভেঙে না যায় সেজন্য বাঁশ, সুতা ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করতে হয়। মাচা না দিলে ঝড় ও বাতাসে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। ১০০ বিঘা জমি থেকে এ মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ আখ উৎপাদন হবে।
আখ শ্রমিক আরশাদ বাবু বলেন, হারিছ চৌধুরীর আখ ক্ষেতে নিয়মিত কাজ করি। আগাছা পরিষ্কার, পাতা কাটা, সার ও কীটনাশক ছিটায়। এখানে দিন হাজিরা ৩০০ টাকা মজুরি পায়। বাইরে থেকে অনেকেই বিদেশী এই কালো আখ চাষ দেখতে ভীড় জমাচ্ছেন।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শঙ্করচন্দ্র ইউনিয়নের দিননাথপুর গ্রামের আখ চাষি হারিছ চৌধুরী বলেন, প্রথমে অল্প জমিতে এ জাতের আখ চাষ করি। আখের ফলন ভাল হওয়ায় চাষে আগ্রহ দেখায়। বড় পরিসরে আখ চাষ করার জন্য নিজেই চারা তৈরি করে সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে এ মৌসুমে আখ লাগায়। ছয় লাখ টাকা লাভ হতে পারে। আখ চাষ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চারা উৎপাদন করছি।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বুজরক গড়গড়ি গ্রামের আখ চাষি সোহান আলি জানান, দুই বিঘা জমিতে ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ করছি। আখের চারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে অন্য কৃষকদের কাছে। আখ চাষ লাভজনক। নতুন উদ্যোক্তারা আখ চাষ করে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
চুয়াডাঙ্গা রোয়ালমারি গ্রামের কৃষক মফিজ জোয়ার্দ্দার বলেন, এক বিঘা জমিতে এ বছর আখ চাষ করার প্লান। চারা তৈরি করার জন্য ১৩০টি ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ কিনে আনলাম দিননাথপুর গ্রাম থেকে। ৫০ টাকা করে প্রতি পিচ আখের দাম। অন্য ফসল চাষ লাভজনক না হওয়ায় আখ চাষ করবো।
ঢাকা সাভারের আখ ক্রেতা জলিল ব্যাপারী বলেন, চুয়াডাঙ্গায় কালো জাতের আখ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে চাহিদা রয়েছে অনেক। ৩০০০ আখ কিনে ট্রাকযোগে সাভারে নিয়ে আসলাম। প্রতিটি আখ ২৫-৩০ টাকা লাভে বিক্রি করতে পারব। কারণ আখগুলো অনেক লম্বা ও মোটা।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা সুফি মো. রফিকুজ্জামান বলেন, চুয়াডাঙ্গায় কৃষকরা নতুন ফসল চাষে আগ্রহী। ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ হচ্ছে। চিবিয়ে খাওয়ার মত একটি আখ। আখ চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উঁচু জমিতে এ জাতের আখ চাষ করলে ফলন ভাল হয়। কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতা করা হচ্ছে।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
আইটি উপদেষ্টা
সোহেল আসলাম
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2021. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close