banglarchokh Logo

৩ বছরের যশোর জেলা যুবলীগের কমিটির বয়স এখন ১৭ বছর

এম.জামান কাকা, যশোর থেকে
বাংলার চোখ
 ৩ বছরের যশোর জেলা যুবলীগের কমিটির বয়স এখন ১৭ বছর

 বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যতই গতিশীল রাজনীতি দেখতে চান না কেন, তিন বছরের জন্য গঠিত যশোর জেলা যুবলীগের কমিটির বর্তমান বয়স ১৭ বছর। কমিটির অধিকাংশ সদস্যই এখন নিস্ক্রিয়। দীর্ঘদিনে কমিটি না হওয়ায় পদ প্রত্যাশী ও সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা চরমে। নেতৃত্বে এখন চরম সংকট। বর্তমান কমিটি অযোগ্যতার পরিচয় দেওয়ায় কোতয়ালি, বাঘারপাড়া, অভয়নগর উপজেলা ও যশোর শহর আহবায়ক কমিটি করে দেয় কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগ। তিন বছর চলছে আহবায়ক কমিটির বয়স। গত কয়েক বছর ধরে জেলা যুবলীগের সম্মেলন ও কমিটি হবে। কিন্তু তারপরও হচ্ছে না। এতে করে দিন দিন নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছে। অনেকেই রাজনীতি থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ইতিমধ্যে জেলা ছাত্রলীগের তিন কমিটি হয়েছে। যারা ছাত্রলীগ করেছে তারা এখন যুবলীগ করবে। ফলে নতুনদের জায়গা দিতে পুরাতনদের সরে যেতে হবে। যে কারণে রাজনীতি করার পরিবেশ নেই।
দীর্ঘ দিন পর খুব দ্রুতই জেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটি গঠিত হতে যাচ্ছে। এ খবর শোনার পর নেতাকর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু কবে হবে সেই প্রশ্ন নেতাকর্মীদের। বলা হচ্ছে, জেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটি গঠন হবে। এতে আহবায়ক হিসেবে বেশ কয়েকজন নেতার নামও শোনা যাচ্ছে। কিন্ত হয় হয় করে এখনো হয়নি। কবে যে মিলবে তা কেউ জানেনা।
নেতাকর্মীরা জানান, সেই ২০০৩ সালের ১৯ জুলাই জেলা যুবলীগের সম্মেলন হয়। এতে মোস্তফা ফরিদ আহমেদ চৌধুরী সভাপতি ও জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৫৩ সদস্য বিশিষ্ট সেই কমিটির মেয়াদ ছিল তিন বছর। সে হিসেবে ২০০৬ সালে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কমিটির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু ২০১৫ সালের পৌর নির্বাচনে যশোর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগেরও সদস্য। ইতিমধ্যে এ কমিটির চার সদস্য মারা গেছেন। এরা হলেন সহ-সভাপতি আশরাফ হোসেন, নির্বাহী সদস্য জয়ন্ত বিশ্বাস, তরুণ অধিকারী ও সোহেল রানা। অপর এক সদস্য দীর্ঘদিন নিখোঁজ। কয়েকজন বিদেশে প্রবাস জীবনে রয়েছেন। এর বাইরে অনেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন।
নেতাকর্মীরা বলেছেন, পদ চলে যেতে পারে, এমন শঙ্কায় এত দিন যুবলীগের সম্মেলন দেওয়া হয়নি। যে কারণে তারা দীর্ঘ ১৬ বছর পদ আঁকড়ে বসে আছেন পদধারীরা। করতে পারেননি কোন উপজেলা কমিটি।
অভিযোগ রয়েছে, যুবলীগে যাঁরা দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগের মূল কমিটিতে ভালো পদ পাননি বলেই সম্মেলন দিতে নয়-ছয় করছেন। ১৭ বছরে জেলা যুবলীগের সম্মেলন কেন হলো না, এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই যুবলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওই কমিটির নেতৃবৃন্দের কাছে।
জেলা যুবলীগের সভাপতি মোস্তফা ফরিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, পদ ধরে রাখার বিষয় নয়। এ ব্যাপারে সকলকেই আন্তরিক হতে হয়। তার একার বিষয় জেলা যুবলীগের সম্মেলন নয়। এটি সম্মিলিত ব্যাপার।
দলের নেতাকর্মীরা জানায়, শিঘ্রই যশোর জেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হবে। এজন্য বেশ কয়েকজন আহবায়ক হওয়ার তদ্বিরে ব্যস্ত। এরমধ্যে রয়েছেন, বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ মুনির হোসেন টগর, সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুদ্দিন মিঠু, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আরিফুল ইসলাম রিয়াদ, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম জুয়েল। আহ্বায়ক কমিটিতে বড় পদের দৌড়ে রয়েছেন যুবলীগ নেতা রাজিবুল আলম ও সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুল। এ তালিকায় পদ চাইছেন ফন্টু চাকলাদার, জাহিদুল ইসলাম ওরফে টাক মিলন। অবস্থা বুঝে লুৎফুল কবীর বিজু শহর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক প্রার্থী হয়েছেন।
আগে যারা ছাত্রলীগ করেছে তাদের অনেকেও যুবলীগ করতে চান। তারা যুবলীগে সুযোগ চাইছেন। তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত বলে জোরালো মতামত রয়েছে।
জেলা যুবলীগের বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি সৈয়দ মুনির হোসেন টগর বলেন, জেলা যুবলীগের সম্মেলনের জন্য আমরা দীর্ঘদিন কেন্দ্রকে জানিয়ে আসছি। কিন্তু কোন সম্মেলন হচ্ছে না। আমি চাই, নেতৃত্ব তৈরি হোক সম্মেলনের মাধ্যমে। যার যোগ্যতা আছে তিনি নেতা হবেন। নিয়মিত সম্মেলন না হওয়ায় নেতৃত্বেও এক ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মঈন উদ্দীন মিঠু বলেন, আহ্বায়ক কমিটি চুড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোন মন্তব্য করা ঠিক নয়। তবে তিনি দায়িত্ব পেতে আশাবাদি। ১৭ বছর বড় বেশি সময় বলে তিনি মনে করেন। কেন এতদিনে যশোরে যুবলীগের কমিটি হয়নি তা তার বোধগম্য নয়। এর উত্তর হয়তো বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের কাছে আছে বলে তিনি মনে করেন। যশোরে তিনি এম পি কাজী নাবিল আহমেদ ঘরানার যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত।
যুবলীগ নেতা রাজিবুল আলম বলেন, দেশের বর্তমান ক্যাসিনো অভিযানে যুবলীগ কিছুটা বেকায়দায়। তবে তিনি শীঘ্র আহ্বায়ক কমিটি ঘোষনায় আশাবাদি। আরো জানান যশোর-৩ সদর আসনের এম পি জননেতা কাজী নাবিল আহমেদ যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি দ্রুত পেতে আন্তরিক। তিনি তার পছন্দেই আহ্বায়ক কমিটিতে পদ পেতে ইচ্ছুক। জাতীয়, স্থানীয় নির্বাচন, ব্যক্তিগত ইমেজ ও এম পির ভালোবাসায় তিনি আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম পদের দাবিদার।
শাহীন চাকলাদার বলয়ের রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত শফিকুল ইসলাম জুয়েল। জেলা ছাত্রলীগে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন এক সময়। গোপালগঞ্জ কম্বিনেশনে তিনি পদ চাইছেন। পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতাকে তিনি তার পজিটিভ দিক হিসেবে দেখেন।
চলতি বছরে অঃঃবহঃরড়হ:গত ২১ মার্চ যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ স্বাক্ষরিত শহর যুবলীগ কমিটি যশোরে পৌঁছানোর পর স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। সেই ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে এখন রাজপথের বিক্ষোভে পরিণত হয়। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শহর যুবলীগের কমিটিতে আহ্বায়ক হয়েছেন মাহমুদুল হাসান মিলু। তিনি মাগুরা জেলার বাসিন্দা এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ কোনো পর্যায়ে কোনো কমিটিতেই কখনো ছিলেন না। এই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন যশোরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেবুব রহমান ম্যানসেল। পুলিশের তালিকাভুক্ত এ সন্ত্রাসীর নামে শহরের ষষ্ঠীতলাপাড়া ও রেলস্টেশন এলাকায় একটি বাহিনী রয়েছে। তার নামে হত্যা, ডাকাতিসহ ডজনখানেক মামলা হয়েছে। ডাকাতির প্রস্তুতিকালে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে একবার ম্যানসেল দুই বার গুলিবিদ্ধ হন। তবে এ ব্যাপারে ঐ দুই শহর যুবলীগ নেতা বলেন যোগ্যতার মাপকাঠিতেই শহর যুবলীগে পদ অর্জন করেছেন।
কয়েক জন যুবলীগ নেতা বলেন জেলা যুবলীগ কমিটিতে থাকা সদস্য সামসুদ্দিন শিপন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তিনি টালিখোলা এলাকার টুলু ও বাবু হত্যা মামলার আসামি। এই আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ঘোপ এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী সজলের বিরুদ্ধে ছাত্রদল নেতা পলাশ হত্যা মামলা এবং জেলা যুবলীগ যুগ্ম সম্পাদক কামাল হত্যা প্রচেষ্টা মামলা রয়েছে। কাজীপাড়া এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ ফেরদৌস হোসেন সমরাজও রয়েছেন এই কমিটিতে। একইসঙ্গে ঘোষিত সদর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক মাজাহার ব্যাংকার রেজাউল হত্যা মামলা এবং গিয়াস উদ্দিন হত্যাপ্রচেষ্টা মামলার আসামি। আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুজ্জামান শহীদ কয়েক বছর আগে এক ট্রাক ভারতীয় চোরাচালান পণ্যসহ আটক হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে বালিয়া ভেকুটিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদেরকে হাতুড়ি পেটার মামলা আছে। বিভিন্ন ভাতা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে হতদরিদ্রদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও একবার হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন। আরেক সদস্য ইমরান খান ওরফে ছাপপান বিহারীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মাদক মামলা রয়েছে। বছর খানিক আগে ইয়াবাসহ আটক হওয়ার পর ছাপপান জেল থেকে বের হয়েছেন। আরো দুই সদস্য মফিজুর রহমান ওরফে টুরে মফিজ ও টিপু সুলতান মুক্তিযোদ্ধা হাশেম আলীর বাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ মামলার আসামি। কমিটিতে এ ধরণের সন্ত্রাসী ও বিতর্কিতরা ঠাঁই পাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ বর্তমান।
যশোর জেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা যুবলীগ উপজেলা শাখাগুলোর সম্মেলন সম্পন্নের প্রস্ততি নিয়েছিল। এ বছরের ১ এপ্রিল অভয়নগর, ৫ এপ্রিল বাঘারপাড়া, এরপর সদর ও শহর যুবলীগের সম্মেলন সম্পন্নের কথা ছিল। সবমিলিয়ে ৮/৯ এপ্রিলের মধ্যেই এই সম্মেলন সম্পন্নের প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে ২১ মার্চ ও ২৯ মার্চ স্বাক্ষর করে ৪টি কমিটি ঘোষণা হয়েছে। এ ব্যাপারে জেলা কমিটির সঙ্গে কোনো ধরণের আলোচনা বা যোগাযোগ করা হয়নি।
কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান বলেন, যুবলীগের এসব কমিটি প্রায় ১৫ বছর ধরে রয়েছে। শাখাগুলোতে সম্মেলন করার জন্য বারবার নির্দেশনা দেয়া হলেও তা হয়নি। এ কারণে কেন্দ্র থেকে আহ্বায়ক কমিটি করে সম্মেলনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এই কমিটি গঠনের জন্য নেত্রী মনোনীত জন-প্রতিনিধি এমপিদের পরামর্শ নেয়া হয়েছে। তাদের তালিকা অনুযায়ী কমিটি করা হয়েছে।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কপিরাইট © 2020 বাংলারচোখ.কম কর্তৃক সর্ব স্বত্ব ® সংরক্ষিত। Developed by eMythMakers.com