১৪ জুন ২০২১, সোমবার ০৫:২০:৪৫ এএম
সর্বশেষ:

০৮ মে ২০২১ ১০:৩৩:৪২ পিএম শনিবার     Print this E-mail this

মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদরের রাত

সাইফউদ্দিন মো: মছিহ রানা
বাংলার চোখ
 মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদরের রাত

লাইলাতুল কদর (لیلة القدر‎) আরবি শব্দ। শবেকদর হলো `লাইলাতুল কদর`-এর ফারসি পরিভাষা। এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। আরবি ভাষায় `লাইলাতুন` অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং `কদর` শব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান। এর অন্য অর্থ হলো-ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা। `কদর`-এর আরেক অর্থ হলো তকদির ও হুকুম। সৃষ্টির প্রথম দিনে প্রত্যেক মানুষের ভাগ্যে যা কিছু লেখা থাকে, এক রমজান হতে অপর রমজান পর্যন্ত তার সরবরাহের হুকুম ও দায়দায়িত্ব আল্লাহপাক এ রাতেই ফেরেশতাদের দিয়ে দেন।
❏ শবে কদরের ইতিহাস
৬১০ সালে শবে কদরের রাতে মক্কার নূর পর্বতের হেরা গুহায় ধ্যানরত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সর্বপ্রথম কোরআন নাযিল হয়। কারও কারও মতে তার কাছে প্রথম সূরা আলাক্বের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়। অনেকের মতে এ রাতে ফেরেশতা জিবরাঈল আ. এর কাছে সম্পূর্ন কোরআন অবতীর্ন হয় যা পরবর্তিতে ২৩ বছর ধরে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের কাছে তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট আয়াত আকারে নাযিল করা হয়।
❏ শবে কদরের গুরুত্ব
শবে কদর রাত মহিমান্বিত বরকতময় এবং বৈশষ্ট্যিমণ্ডিত এ জন্য যে, এ রজনীতে পবিত্র গ্রন্থ `আল-কোরআন` অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনের সূরা আল-কদর-এ আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, `নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতারা ও রুহ (জিবরাঈল আ.) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।`(আয়াত ১-৫)
এ রাত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা দুখানেও অনুরূপ বলা হয়েছে : `আমি তো এটা অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে, আমি তো সতর্ককারী। এই রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়; আমার আদেশক্রমে, আমি তো রাসূল প্রেরণ করে থাকি আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহস্বরূপ, তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (আয়াত ৩-৬)। কুরআন নাযিল হওয়ার রাত হিসেবে গোটা মানব জাতির জন্য এ রাত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ রাতের গুরুত্ব মানুষের ধারণারও অতীত।
শবে কদরের রাতে ফেরেশতারা ও তাঁদের নেতা জিবরাঈল আ. পৃথিবীতে অবতরণ করে উপাসনারত সব মানুষের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে থাকেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে কদরে হজরত জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট একদল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে তাঁদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (মাযহারি)
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তাঁর পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারি) হাদীসে আছে, লাইলাতুল কদরের রজনীতে যে বা যারা আল্লাহর আরাধনায় মুহ্যমান থাকবে, স্রষ্টা তাঁর জন্য দোজখের আগুন হারাম করে দেবেন। অন্য হাদিসে আছে, তোমরা তোমাদের কবরকে আলোকিত পেতে চাইলে মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর রাতে জেগে রাতব্যাপী ইবাদত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দাও।
❏ সুরা কদর অবতীর্ণ হওয়ার পটভুমি: ইবনে আবি হাতেম রা: থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণের সামনে বনী ইসরাঈলের জনৈক চারজন লোক সম্পর্কে আলোচনা করলেন যে,তারা দীর্ঘ হায়াত লাভ করে অধিককাল যাবত ইবাদত করেন। এ সময়ের মধ্যে তারা একটিও নাফরমানি করেননি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর যবান মোবারক থেকে এ কথা শুনতে পেরে সাহাবায়ে কেরামগণ অত্যন্ত বিস্মিত হলেন এবং নিজেদের ব্যাপারে আফসোস করতে লাগলেন। সাহাবায়ে কেরামগণের এ আফসোসের পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন হযরত জিবরাঈল আ.-এর মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর উপর সুরায়ে `কদর` অবতীর্ণ করেন।
❏ লাইলাতুল কদরের ফজিলতগুলো সংক্ষেপে এরূপ:
● এ রাতটি হাজার মাস হতে উত্তম- কল্যাণময় (কুরআন)
● এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাযিল করা হয়েছে (কুরআন)
● এ রাতে ফেরেস্তা নাযিল হয় এবং আবেদ বান্দাহদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন (হাদীস)
● ফজর পর্যন্ত এ রাত পুরাপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার (কুরআন)
● এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞান সম্মত ও সুদৃঢ় ফায়সালা জারী করা হয় (কুরআন)
● এ রাতে ইবাদতে মশগুল বান্দাদের জন্য অবতরণ করা ফেরেশতারা দু`আ করেন। (হাদীস)
● গুনাহ মাফঃ `যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমান সহকারে ও আল্লাহর নিকট হতে বড় শুভফল লাভের আশায় ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।``-(বুখারী-মুসলীম)
● এ রাতের কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না।- (ইবনে মাজাহ-মিশকাত)
❏ কবে এ রাত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম একটি রহস্যময় কারণে লাইলাতুল কদরের তারিখটি সুনির্দিষ্ট করেননি। এ ব্যাপারে হযরত উবায়দা রা. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাঁকে বললেন রমযান মাসের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে তালাশ কর। তাই ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতগুলোকেই বেশী গুরুত্ব দিতে হবে। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ ও ইমাম তিরমিজি কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, `কদরের রাতকে রমজানের শেষ দশ রাতের কোনো বেজোড় রাতে খোঁজ করো।` হজরত আবু বকর রা. ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হাদিস থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। অবশ্য কোনও কোনও ইসলামী মনীষী নিজস্ব ইজতিহাদ, গবেষণা, গাণিতিক বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যমে রমযানের ২৭ তারিখের রাতে (অর্থাৎ ২৬ রোজার দিবাগত রাতে) শবেকদর হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এটাকে সুনির্দিষ্ট করেননি বরং কষ্ট করে খুঁজে নিতে বলেছেন। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম রমযান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমযানের শেষ ১০ রাতে শবে কদর সন্ধান করো। (বুখারি ও মুসলিম) আরেকটি হাদিসে রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মাহে রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে তোমরা শবে কদর সন্ধান করো। মহান আল্লাহর কামনা- বান্দাহ কয়েক রাত ইবাদতে গভীর মনোনিবেশ করে এ মহামূল্যবান রাতের সন্ধান পাক।
❏ কাঙ্খিত রাতের সময়: সূর্য অস্ত যাওয়ার মাধ্যমে এ রজনীর আবির্ভাব ঘটবে এবং পরদিন সূর্যোদয় অবধি এ রাতের মহিমাময় ফজিলত অব্যাহত থাকবে।
❏ শব-ই-কদর চেনার ১৩টি আলামত
যে রাতটি লাইলাতুল কদর হবে সেটি বুঝার জন্য সে রাতের কিছু আলামত হাদিসে বর্ণিত আছে। সেগুলো হলো-
এক. এ রাতটি রমযান মাসে। আর এ রাতের ফজিলত কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে।
দুই. এ রাতটি রমযানের শেষ দশকে। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমযানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর। -সহিহ বোখারি
তিন. আর এটি রমযানের বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, `তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ কর। -সহিহ বোখারি
চার. এ রাত রমযানের শেষ সাত দিনে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, `যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অন্বেষণ করতে চায়, সে যেন রমযানের শেষ সাত রাতের মধ্যে তা অন্বেষণ করে।`
পাঁচ. রমযানের ২৭ রজনী লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
ক. হাদিসে আছে, উবাই ইবনে কাব হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে- তিনি বলেন যে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে রজনীকে কদরের রাত হিসেবে কিয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হল রমযানের ২৭ তম রাত। -সহিহ মুসলিম
খ. হজরত আবদুল্লাহ বিন উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, `যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমযানের ২৭ রজনীতে অনুসন্ধান করে। -আহমাদ
গ. কদরের রাত হওয়ার ব্যাপারে সম্ভাবনার দিক থেকে পরবর্তী দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল ২৫ তারিখ, তৃতীয় হল ২৯ তারিখে। চতুর্থ হল ২১ তারিখ। পঞ্চম হল ২৩ তারিখের রজনী।
ছয়. সর্বশেষ আরেকটি মত হলো- মহিমান্বিত এ রজনীটি স্থানান্তরশীল। অর্থাৎ প্রতি বৎসর একই তারিখে বা একই রজনীতে তা হয় না এবং শুধুমাত্র ২৭ তারিখেই এ রাতটি আসবে তা নির্ধারিত নয়। আল্লাহর হিকমত ও তাঁর ইচ্ছায় কোনো বছর তা ২৫ তারিখে, কোনো বছর ২৩ তারিখে, কোনো বছর ২১ তারিখে, আবার কোনো বছর ২৯ তারিখেও হয়ে থাকে।
সাত. রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।
আট. নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।
নয়. মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।
দশ. সে রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে।
এগারো. কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন।
বারো. ওই রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।
তেরো. সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত। -সহিহ ইবনু খুজাইমা: ২১৯০; বোখারি: ২০২১; মুসলিম: ৭৬২
❏ পবিত্র ও মহিমান্বিত রাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে যারা বঞ্চিত থাকবে:
শবে কদরে চার শ্রেণির মানুষকে ক্ষমা করা হবে না, তাদের কোনো কিছুই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না যতক্ষণ না তারা এসব অপকর্ম থেকে সংশোধন হবে। এরা হলো, এক- মদপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি, দুই- মাতাপিতার অবাধ্য সন্তান, তিন- আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, চার- অপর মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে হিংসা বিদ্বেষ পোষণকারী ও সম্পর্কছিন্নকারী। (শুয়াবুল ঈমান, ৩য় খণ্ড, ৩৩৬ পৃষ্ঠা)।
উপরোক্ত দোষে যারা দোষী এ রাতের বরকত পাওয়ার জন্য প্রথমেই তাদের তওবা করতে হবে। তাদের তওবা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কবুল করার পরই তারা এই রাতের ফজিলত লাভ করবে। এ রাতে যারা নিজের অপরাধ ক্ষমা চেয়ে এবং আল্লাহর রহমত কামনা করে কাঁদবে, তাদের দোয়া কবুল হবে।
❏ যেভাবে আদায় করবেন শবে কদরের নামাজ
কদরের নামাজের নিয়ত : নাওয়াইতু আন উছালি্য়া লিল্লাহি তায়া`লা রাকআ`তাই ছালাতি লাইলাতিল ক্বাদরি, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা`বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
ন্যূনতম বার রাকাত থেকে যত বেশি সম্ভব পড়া যেতে পারে। এ জন্য সাধারণত সুন্নতের নিয়মে `দুই রাকাত নফল পড়ছি` এ নিয়তে নামাজ শুরু করে শেষ করতে হবে।
এ জন্য সূরা ফাতেহার সাথে আপনার জানা যে কোনো সূরা মেলালেই চলবে। অনেকে সূরা ফাতেহার সাথে ৩৩ বার সূরা আল কদর, ৩৩ বার ইখলাস ইত্যাদি পড়ে থাকেন। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ৪ রাকাত নামাজ কদরের রাতে আদায় করবে এবং উক্ত নামাজের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ২১ বার করে সূরা ইখলাছ পাঠ করবে, আল্লাহ তা`য়ালা ওই ব্যক্তিকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ করে দেবেন এবং বেহেশতের মধ্যে এক মনোমুগ্ধকর মহল তৈরি করে দেবেন।
অপর এক হাদিসে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কদরের রজনীতে ৪ রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং উহার প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কদর ও সূরা ইখলাছ তিনবার করে পাঠ করবে, নামাজ শেষে সিজদায় গিয়ে নিম্নের দোয়াটি কিছু সময় পাঠ করে আল্লাহর দরবারে যা-ই প্রার্থনা করবে তিনি তাই কবুল করবেন এবং তার প্রতি অসংখ্য রহমত বর্ষিত করবেন।
দোয়াটি হলো : সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।
❏ কিয়ামুল লাইল : ‘কিয়ামুল লাইল` অর্থ হলো রাত্রী জাগরণ। মহান আল্লাহর জন্য আরামের ঘুম স্বেচ্ছায় হারাম করে রাত জেগে ইবাদত করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের একটি গুণ। মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাহদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-`তারা রাত্রি যাপন করে রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে` (সূরা-ফুরকান-৬৪)।
`তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক থাকে (অর্থাৎ তারা শয্যা গ্রহণ করে না; বরং এবাদতে মশগুল থাকে)। তারা (গজবের) ভয়ে এবং (রহমতের ) আশায় তাদের রবকে ডাকতে থাকে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে দান করে থাকে। কেউ জানে না তাদের আমালের পুরস্কারস্বরূপ (আখিরাতে) তাদের জন্য কী জিনিস গোপনে রাখা হয়েছে` সূরা-সিজদা-১৬-১৭)।
❏ এ রাতে পড়ার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর শেখানো দোয়া: `আল্লাহ আজকের রাতে আমাকে শবে কদরের ফজিলত দান করুন, আমার কাজকর্ম সহজ করে দিন, আমার অক্ষমতা মার্জনা করুন, আমার পাপসমূহ ক্ষমা করুন।`
❏ শবে কদরের বিশেষ দোয়া
হজরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি শবেকদরের সন্ধান পাই তবে সে রাতে কী বলব? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তখন বলবে-
اللهمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়্যুন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা-ফু আন্নী।
অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল। তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাস। অতএব, তুমি আমাকে ক্ষমা কর।
❏ নামায ছাড়া এ রাতে আর কী এবাদত করা যায়:
কুরআন অধ্যয়ন: এ পবিত্র রাতেই কুরআন নাজিল হয়েছে। যে মানুষ, যে সমাজ, যে জাতি কুরআনকে বাস্তব জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করবে, তারা পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে সম্মানীত হবেন। এ রাতে নাজিলকৃত কুরআনকে যারা অবহেলা করবে, তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। কাজেই এ রাতে অর্থ বুঝে কুরআন পড়তে হবে। কুরআনের শিক্ষাকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করতে হবে। বাছাইকৃত কিছু আয়াত এ রাতে মুখস্থও করা যেতে পারে। যাদের কুরআনের উপর প্রয়োজনীয় জ্ঞান রয়েছে তাঁরা এ রাতে একটি দারসও প্রস্তুত করতে পারেন। কুরআনের এ গভীর অধ্যয়ন আমাদের সৌভাগ্যের দ্বার খুলে দিবে। হাদীস থেকে জানা যায়- রাতে এক ঘন্টা গবেষণামূলক ইসলামী অধ্যয়ন সারা রাত জেগে ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। এ মর্তবা হল সাধারণ রাতের জন্য আর এ পবিত্র রজনীতে কুরআন অধ্যয়নের ফজিলত কল্পনা করাই কঠিন।
❏ জিকির ও দোয়াঃ হাদিসে যে দোয়া ও জিকিরের অধিক ফজিলতের কথা বলা হয়েছে সেগুলো থেকে কয়েকটি নির্বাচিত করে অর্থ বুঝে বারে বারে পড়া যেতে পারে। ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও দরুদ আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তেগফার ও ১০০ বার দরুদ পড়া যেতে পারে।
❏ আত্মসমালোচনাঃ আত্মসমালোচনা অর্থ আত্মবিচার। অর্থাৎ নিজেই নিজের ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে আলোচনা করা। জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোতে আল্লাহর কতগুলো হুকুম অমান্য করেছেন, আল্লাহর ফরজ ও ওয়াজিবগুলো কতটা পালন করেছেন, ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় কি কি বড় গুনাহ আপনি করে ফেলেছেন, আল্লাহর গোলাম হিসাবে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আপনি কতটুকু ভুমিকা রেখেছেন- এগুলো ভাবুন, যা কিছু ভাল করেছেন তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন, আর যা হয়নি তার জন্য আল্লাহর ভয় মনে পয়দা করুন, সত্যিকার তওবা করুন। এ রাতে নীরবে নিভৃতে কিছুটা সময় এ আত্মসমালোচনা করুন দেখবেন আপনি সঠিক পথ খুঁজে পাবেন। আত্মসমালোচনা আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলবে। আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। মহান আল্লাহ বলেন-`হে ঈমানদার লোকেরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য (পরকাল) সে কি প্রেরণ করেছে তা চিন্তা করা`` (সূরা হাশর-১৮)
❏ শবে কদরে সুরা কদর পড়লে বান্দার অনেক কল্যাণ হয়: আমিরুল মুমেনিন হযরত আলী মুরতাজা শেরে খোদা (রা.) বলেন, `যে কেউ শবে কদরে সুরা কদর সাতবার পড়বেন আল্লাহ তা`আলা তাকে প্রত্যেক বালা মুসিবত থেকে রক্ষা করেন। আর সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জান্নাত পাবার জন্য দোয়া করেন। (নুজহাতুল মাজালিস, ১ম খণ্ড, ২২৩ পৃষ্ঠা)।
❏ মুনাজাতঃ মুনাজাতের মাধ্যমে বান্দার বন্দেগী ও আল্লাহর রবুবিয়াতের প্রকাশ ঘটে। বান্দাহ তার প্রভুর কাছে চায়। প্রভু এতে ভীষণ খুশি হন। মহান আল্লাহ তার বান্দার প্রতি এতটাই অনুগ্রশীল যে, তিনি তার কাছে না চাইলে অসন্তুষ্ট হন। ` যে আল্লাহর নিকট কিছু চায় না আল্লাহ তার উপর রাগ করেন``- (তিরমিযি)। `দোয়া ইবাদতের মূল``- (আল- হাদীস)।`` যার জন্য দোয়ার দরজা খোলা তার জন্য রহমতের দরজাই খোলা রয়েছে``- (তিরমিযি)। কাজেই আমরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করব,ক্ষমা চাইব, রহমত চাইব, জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইব। মনের আবেগ নিয়ে চাইব। চোখের পানি ফেলে চাইব। আল্লাহ আমাদের খালি হাতে ফিরাবেন না ইনশাআল্লাহ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন-`তোমাদের পরওয়ারদিগার লজ্জাশীল ও দাতা; লজ্জাবোধ করেন যখন তাঁর বান্দা তার নিকট দু`হাত উঠায় তখন তা খালি ফিরিয়ে দিতে``- (তিরমিযী, আবু দাউদ, বায়হাকী- দাওয়াতে কবীর)। তাইতো প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ রাতে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে নিজ পাপরাশি ক্ষমা করিয়ে নেয়া। কারণ, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের মতো পুণ্যময় মাস পেয়েও তার পাপরাশি ক্ষমা করিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়, তার ধ্বংস অনিবার্য।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে শবে কদরে উত্তম আমল করার, শবে কদরের কল্যাণ লাভ করার তাওফিক দিন, কোরআন পড়ার, কোরআন বোঝার, কুরআন মতো জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের সকলকে তার দ্বীনের রাস্তায় কবুল করুন, অসৎ পথ থেকে বেঁচে থেকে সৎ পথে চলার সামর্থ দান করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন
☼ সাইফউদ্দিন মো: মছিহ রানা ❏ সিনিয়র সাব এডিটর, বাংলাদেশ প্রতিদিন ★সেল-০১৯১২১৭১৫০৭

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সম্পাদক
শরীফ মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
নাঈম পারভেজ অপু
আইটি উপদেষ্টা
সোহেল আসলাম
উপদেষ্টামন্ডলী
মোঃ ইমরান হোসেন চৌধুরী
কার্যালয়
১০৫, এয়ারপোর্ট রোড, আওলাদ হোসেন মার্কেট (৩য় তলা)
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ফোন ও ফ্যাক্স :+৮৮০-০২-৯১০২২০২
সেল : ০১৭১১২৬১৭৫৫, ০১৯১২০২৩৫৪৬
E-Mail: banglarchokh@yahoo.com, banglarchokh.photo1@gmail.com
© 2005-2021. All rights reserved by Banglar Chokh Media Limited
Developed by eMythMakers.com
Close