Banglar Chokh | বাংলার চোখ

অভাবের সাথে সন্ধি তারপরও দুই বোনের উচ্চ শিক্ষায় সাফল্য

শাহরিয়ার মিল্টন,শেরপুর

প্রকাশিত: ০১:৩২, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

অভাবের সাথে সন্ধি তারপরও দুই বোনের উচ্চ শিক্ষায় সাফল্য

নিজস্ব ছবি

জেসমিন ও সাবিনা সহোদর দুই বোন। বড় বোন জেসমিন পড়ছেন মাওলানা ভাষানী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে আর ছোট বোন সাবিনা এ বছর গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মেধা তালিকায় ২৮২ তম স্থান পেয়ে ভর্তি হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়ে। শুধু তাই নয় সাবিনা এবার একাধারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় এবং গুচ্ছ পরীক্ষায়ও ভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগও পেয়েছেন। তবে সে আপাতত রাজশাহীতেই ভর্তি হয়েছেন। আরো ভালো বিষয় পেলে অন্যত্র ভর্তির আশা সাবিনার। তাদের এই সাফল্যে পেছনে ছিলো না পারিবারিক কারো সাপোর্ট। ছিলো না কোনো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছিলো না প্রাইভেট টিউশান, ছিলো না প্রয়োজনীয় বই-খাতা-কলম ইত্যাদি। এমন কী পেট পুড়ে তিন বেলা খাবারও জুটে না তাদের পরিবারের সদস্যদের।
জেসমিন-সাবিনার বাবা জিয়াউল হক একজন ফুটপাতের চা বিক্রেতা। শেরপুর জেলা শহরের অদূরে গাজিরখামার বাজারের ফুটপাতের পাশে প্রতিদিন চা বিক্রি করে ২ থেকে ৩ শ টাকা আয় করে ৫ মেয়ে  ও ১ ছেলেসহ ৮ সদস্যের পরিবারের ঘানি টানতে হচ্ছে। বর্তমান বাজারে এ টাকায় ৮ জন মানুষের তিন বেলা পেটের ভাত জোগার করা কাল্পনিক মনে হলেও ঘটনাটি চরম সত্য। মাঝে মধ্যে ব্যবসা খারাপ হলে এক থেকে দেড় শ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় জিয়াউল হকের। যেখানে পেট পুড়ে তিন বেলা খাওয়া জোগার করাই কষ্ট সেখানে ৬ সন্তানের পড়াশোনার চালানোর বিষয়তো বিষ্ময়কর। তারপরও জিয়াউল হক প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছেন বেঁচে থাকার তাগিদে। অপরদিকে শিক্ষার উপকরণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নানা খরচ এবং চাহিদামতো ব্যবহারের পোষাকসহ নূন্যতম কোনো সহযোগিতা ছাড়াই ওই পরিবার থেকে দুই বোনের উচ্চ শিক্ষায় উঠে আসা, রীতিমত অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে ওই দুই সহোদর।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাষানী বিশ্বাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জেসমিন বলেন, গাজির খামার বাজারের কাছেই বাবার পৈত্রিক ৩ শতক জমিতে একটি মাত্র ঘর তুলে গাদাগাদি করে ৬ ভাইবোন ও মা-বাবাকে নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করে আসছেন। ২০২০ সালে সে এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৪.৯২ পেয়ে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন থাকলেও সেই স্বপ্ন ছুঁতে প্রথমে সাহস করেনি আর্থিক দৈন্যতার কারণে। তাই ভার্সিটির কোচিং তো দূরে কথা ভর্তি পরীক্ষা দেয়ারও চিন্তা করেনি জেসমিন। জেলা সদরের কলেজে ভর্তির টাকা জোগারের জন্য ওই গ্রামে স্থানীয় একটি স্কুলে পারটাইম শিক্ষকতাও শুরু করেছিলো।এমন সময় শেরপুরের একটি বেসরকারী শিক্ষা সহায়ক সংস্থা ‘দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থী উন্নয়ন সংস্থা’র (ডপস) প্রতিষ্ঠাতা সেনা সদস্য মো. শাহিন মিয়ার বিএসপি এগিয়ে আসেন। সেসময় আগষ্ট মাসে সারাদেশের সকল ভার্সিটির পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেও কেবল মাত্র টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাষানী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় ছিলো। জেসমিনের ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষার কোনো প্রস্তুতিও নেই। তারপরও ‘ডপস’ এর ওই শাহিন মিয়া তার ভর্তি পরীক্ষার আবেদনের খরচ এবং একটি গাইড কিনে দেন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। পরীক্ষা হয় ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। মাত্র ১৫/২০ দিনে ওই গাইড পড়ে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে মেধা তালিকায় ১১৭তম স্থান পায় এবং বিভাগীয় স্থান হয় ৩৩ তম। তবে ভর্তি হতে কপালে তার চিন্তার ভাঁজ পড়ে। ভর্তির প্রায় ২০ হাজার টাকা তার বাবার কোনো ভাবেই জোগার করা সম্ভব নয়। সেসময় ওই শহিন মিয়ার প্রচেষ্টায় এবং কিছু হৃদয়বান ব্যক্তির সহযোগিতায় সে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়। এরপরের বছর ২০২১ সালে প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় সে সিজিপি-৩.৮৪ পেয়ে দ্বিতীয় হয়। এবারও সে দ্বিতীয় বর্ষে সিজিপি-৩.৭২ পেয়ে তৃতীয় হয়েছে। বর্তমানে জেসমিন টিউশানী করে তার খরচ চালালেও ছোট বোন সাবিনাকে নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন । তার ছোট বোন সাবিনা এবার রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও গুচ্ছতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে শেষে  শাহিন মিয়ার ‘ডপস’ এর সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়ে গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছেন । সাবিনার অন্য সকল ছোট ভাইবোনেরাও অভাবের সাথে যুদ্ধ করে পিছপা না হয়ে লেগে আছে শিক্ষা গ্রহনের পেছনে। সাবিনার ছোট বোন শারমিন এবার ৯ম শেণিতে, তার ছোট বোন নাসরিন জাহান ৭ম শেণিতে, তার ছোট ভাই নূরে আলম সিদ্দিক ৩য় শেণিতে স্থানীয় একটি মাদরাসায় এবং সবার ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া প্রথম শ্রেণিতে স্থানীয় সৃজন পাবলিক স্কুলে পড়ছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের পারিবারিক ও মেধার বিষয়ে বিবেচনা করে স্কুলের সকল খরচ ফ্রি করে দিয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে এবার ভার্তি হওয়া সাবিনা বলেন, তাদের বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অটো রিক্সায় এসে সে শেরপুর কলেজে ক্লাস করতেন। এরপর প্রতিদিন ক্লাস শেষে তার পড়াশোনার খরচ সংগ্রহের জন্য শহরের বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে প্রাইভেট পড়াতেন এবং পরে তার নিজের কোচিং করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেন। দুপুরে একটি-দুটি বিস্কুট বা সিঙ্গারা-পুড়ি খেয়েই দিন পার করতেন। এদিকে ডপস -এর ছায়াতলে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে শহরের একটি কোচিংয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গুচ্ছসহ ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বেশ কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এসময়ও তার পাশে ছিলো ‘ডপস’ সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠাতা শাহিন মিয়া।
সম্প্রতি ডপস থেকে জেসমিন-সাবিনার পরিবারের আয় বাড়াতে সুদ বিহীন ঋণ দিয়ে দুটি গরু কিনে দিয়েছেন। কিন্তু ওই গরু থেকে আয় পেতে অনেক সময়ের ব্যপার। তারপরও কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছে জেসমিনের পরিবার।
জেসমিন-সাবিনার বাবা জিয়াউল হক বলেন, আমি মুর্খ মানুষ। এক সময় কাঠ মিস্ত্রির কাজ করতাম। প্রায় এক যুগ ধরে এই বাজারে ফুটপাতের পাশে বসে চা-পান বিক্রি করেও দিন চালাতে পারিনা। বিকেল ৩ টার পরে এখানে দোকান বসাই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘরের কাজ, রিক্সা চালানো আর মাঝে মধ্যে ক্ষেত কামলার কাজও করি। আল্লাহ আমার মেয়েদের মেধা দিলেও আমি তাদের জন্য কিছুই করতে পারি নাই। তবে ডপস ও শাহিন মিয়াসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং স্কুলের শিক্ষকরাও তাদের পড়াশোনার ফিস মাফ করে দিয়েছে। খাতা-কলম ও বইও ডপস দিয়ে যাচ্ছে। এখন জেসমিন ও সাবিনার জন্য খুব বেশী চিন্তা নেই। তবে অন্য ছেলে মেয়েকে নিয়ে পেটের ভাতই জোগার করা সম্ভব হয়না। সরকারী কোন সহযোগীতা পেলে বাজারের প্রধান সড়কে একটি ঘর নিয়ে ব্যবসা করতে পারলে বাকী ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু করতে পারতাম।
এ বিষয়ে ‘ডপস’ প্রতিষ্ঠাতা সেনা সদস্য মো. শহিন মিয়া বিএসপি জানায়, পরিবারটির সকল ছেলে-মেয়ে খুবই মেধাবী। তাদের বাবার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ বিধায় আমরা তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। তবে আমাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, আমাদের সংগঠন থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের প্রায় সাড়ে চার শ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার নানা উপকরণ ও ভর্তি এবং বিভিন্ন পরীক্ষার ফিসসহ নানা খরচ বহন করা হয়।।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়