Banglar Chokh | বাংলার চোখ

রানা প্লাজার রেশমা উদ্ধার নিয়ে জেনারেল সারওয়ার্দীর স্বীকারোক্তি, আমার দেশ-এর রিপোর্টই সঠিক ছিল

প্রকাশিত: ০৬:১০, ৫ আগস্ট ২০২২

রানা প্লাজার রেশমা উদ্ধার নিয়ে জেনারেল সারওয়ার্দীর স্বীকারোক্তি, আমার দেশ-এর রিপোর্টই সঠিক ছিল

ফাইল ফটো

প্রায় এক দশক আগে ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আলোচিত-সমালোচিত রেশমা উদ্ধার নাটকের দায় নিতে অস্বীকার করছেন লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী। তিনি তখন সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং উদ্ধার অভিযানের সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন। তার সরল স্বীকারোক্তির মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে, ফ্যাসিবাদি সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ রেশমা উদ্ধারের নাটক সাজানো হয়েছিল মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে। আরো প্রমাণিত হয়েছে এই ঘটনা নিয়ে আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি ছিল সঠিক।

বিবিসি বাংলার সাথে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রেশমা উদ্ধারের প্রসঙ্গে বলেছেন, এটার দায় ও ক্রেডিট কোনটাই তিনি নিতে চাচ্ছেন না। বরং প্রশ্ন রেখেছেন কেন ঘটনার তদন্ত করা হয়নি। কোন মিডিয়া কেন অনুসন্ধান করেনি, এমন কথা বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

অথচ, রেশমা উদ্ধারের পরপরই আমার দেশ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল রেশমা উদ্ধারের ঘটনাটি সাজানো নাটক ছিল। জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে সরাতে তৈরি করা সেই নাটকের বর্ণনাই উঠে এসেছিল আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

আমার দেশ রেশমা উদ্ধারের নাটক প্রকাশের পর তখন চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন- সেনাবাহিনীকে নিয়ে কেউ ফাউল খেলতে আসবেন না। সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসাবে অনেক ক্ষমতাধর ছিলেন তিনি। রেশমা নাটক প্রকাশের পর ওই পদে থেকে আমার দেশকে ধমক দিলেও প্রায় দশ বছর পর এখন তিনি বলছেন, মিডিয়া কেন অনুসন্ধান করেনি।

রেশমাকে নিয়ে আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত“ডেইলি মিরর"এবং “ডেইলি মেইল" ঘটনাটির অনুসন্ধান করেছিল।

এই দুই পত্রিকার রিপোর্টার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন ঘটনারই অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে। দু’টি পত্রিকায় পৃথক অনুসন্ধানী রিপোর্টেও আমার দেশ-এর রিপোর্টের রেফারেন্স উল্লেখ রয়েছে। চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী এবং বিবিসি বাংলার চোখে কি এই রিপোর্ট গুলো পড়েনি? উল্লেখ্য, বুধবার (৩ আগস্ট) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি রেশমা উদ্ধার নাটকের দায় অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁর শত্রুরা পুরো উদ্ধার অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং তাঁর ইমেজ ক্ষুণ্ণ করার জন্যে ‘ওই কাজ’ করে থাকতে পারে। উদ্ধার অভিযানের কৃতিত্বের জন্যে এটা প্রয়োজন ছিল না বলেও তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। রেশমা উদ্ধার ঘটনা যে সাজানো ছিল তা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমান হলো আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী রিপোর্টটি সঠিক ছিল।


রেশমা উদ্ধারের পর আমার দেশ-এ রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর ডেইলি মিররের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন https://www.mirror.co.uk/news/world-news/bangladesh-clothes-factory-disaster-miracle-2011161click here

রেশমাকে উদ্ধার করতে দেখেননি বলেও জানান উদ্ধার কাজের মূল সমন্বয়কারী তখনকার সরকার-ঘনিষ্ঠ এই সেনাকর্মকর্তা। কেউ তাকে ওখানে ঢুকিয়েছে বা ঢুকিয়েছিল কিনা তার তদন্ত হওয়া উচিত বলেও মনে করে তিনি। জনমনে সন্দেহ দূর করতে বিচারবিভাগীয় বা অন্য নির্ভরযোগ্য তদন্ত হওয়া দরকার ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রশ্ন ওঠার পরও দশ বছরে সরকার বা অন্য কোন সংস্থা কেন বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করেনি সে প্রশ্নও তুলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই জেনারেল।

বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, উদ্ধার অভিযান শেষের দিকে তাঁর অনুপস্থিতিতে ও অজ্ঞাতে ঢাকার দুই ব্রিগেডিয়ারের নেতৃত্বে রেশমাকে উদ্ধার দেখানো হয়। তিনি বলেন, “আমার ক্রেডিট হলো মৃত ও জীবিত মিলিয়ে সাড়ে ৫ হাজার লোক উদ্ধার করেছি। আর ধরে নিলাম তারা জিন্দা মেয়েটাকে উদ্ধার করেছে আর রাবিশ উদ্ধার করেছে, সেটা তাদের ক্রেডিট। ওই ব্রিগেডকে সেই ক্রেডিট দিলাম। আমি সে ‘দায়’ নিচ্ছি না। আমাকে জিজ্ঞেস না করে ওদের জিজ্ঞেস করা উচিত। আমি বলবো না মেয়েটাকে তারা ওখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে, আবার আমি বলবো না যে কোন রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক লোকেরা মেয়েটাকে ওখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বলবো উদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ আছে”।

যদিও সেই সময় উদ্ধারাভিযানের কৃতিত্ব সেনা সহায়তায় ক্ষমতায় আসা ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছিলেন হাসান সারওয়ার্দী। শেখ হাসিনাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন তিনি।


রেশমা উদ্ধারের পর আমার দেশ-এ রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর ডেইলি মেইলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন https://www.dailymail.co.uk/news/article-2351822/Were-pictures-woman-pulled-rubble-hoax-Former-colleague-Bangladesh-clothes-factory-victim-says-government-miracle-story.htmlclick here

সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “সংসদে এবং বাইরে এ নিয়ে এত সমালোচনা হলো। তারপরও সরকার কেন একটা তদন্ত করে বিষয়টি পরিষ্কার করলো না? কানে তালা দিলো কেন? উদ্ধারের খবর পেয়ে আমরা সেখানে গেলাম। কিন্তু মেয়েটাকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হলো, ওয়েস্টিন হোটেলে চাকরি দেওয়া হলো। ওই মেয়েতো এখনও বেঁচে আছে, তাকে কেন জিজ্ঞেস করা হয় না?” এ পর্যায়ে সাংবাদিক আকবর হোসেন বলেন, উদ্ধারের পর থেকে রেশমাকে গোয়েন্দারা ঘিরে রাখতো বলেই জিজ্ঞেস করা যায়নি। আরেক প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল অব সারওয়ার্দী বলেন, “কথিত অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া রেশমাকে উদ্ধার করা হয়েছে এটা আমি মেনে নিতে পারছি না, কারণ আমি ওই সময় ছিলাম না। আমার অধীনস্থ কেউ ছিল না। আবার আমি প্রত্যাখ্যান করে এটাও বলছি না যে অমুকে তাকে ওখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কারণ আমার হাতে প্রমান নেই। নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। এটা প্রকাশ হয়ে গেলেতো সরকারের পতন হবে না।"

২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল সরকার জোর করে আমার দেশ-এর ছাপাখানা দখলে নিয়েছিল। ছাপা বন্ধ করে দেওয়ায় কেবল অনলাইন ভার্সন চালু ছিল। স্টাফ রিপোর্টার মাহমুদা ডলি অনুসন্ধানী রিপোর্টটি করেন রেশমা উদ্ধারের নাটক নিয়ে। রিপোর্টে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাতকার ও রেশমার সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলেন রেশমা রানা প্লাজা ধসের পর পরই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। ভবনের তৃতীয় তলায় একসঙ্গে কাজ করতেন এমন এক পুরুষ সহকর্মী প্রতিবেদককে বলেন- “আমরা দু‘জনই একসঙ্গে ধ্বংসস্তূপ থেকে বেড়িয়ে আসি। এর পর দু‘দিন একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। এর পর রেশমা উধাও হয়ে যান। ১৭ দিন পর তাকে দেখলাম টেলিভিশনে। তারা এটাকে অলৌকিক ঘটনা বলে জানালো। কিন্তু এটা ছিল ধোঁকাবাজি”। আমার দেশ প্রতিবেদক রেশমা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেই বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন- ঘটনার পর পরই রেশমা উদ্ধার হয়ে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

আমার দেশের রিপোর্ট সরকারি মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল তখন। নানা হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি সেনা কর্মকর্তা ফোন করে বলেন- ‘সেনাবাহিনীর সঙ্গে ফাউল খেলতে আসবেন না। পরিণতি ভালো হবে না।'

তবে পাঠকদের কাছে নন্দিত হয় আমার দেশ-এর প্রতিবেদন। জনসাধারণ আমার দেশ এর প্রতিবেদন বিশ্বাস করে এবং অনলাইনের রিপোর্টটি ব্যাপকভাবে আলোচিত ও ভাইরাল হয়। আমার দেশ-এর ওই রিপোর্টের সূত্র ধরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক দু‘টি পত্রিকা ‘ডেইলি মেইল‘ ও ‘মিরর’ অধিকতর অনুসন্ধানে নেমে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ডেইলি মেইলে ২০১৩ সালের ৩০ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমার দেশ এর প্রতিবেদন উদ্বৃত্ত করার পাশাপাশি নিজস্ব অনুসন্ধানে রেশমা উদ্ধারের কাহিনী পুরোপুরি নাটক বলে উল্লেখ করে। আবার যুক্তরাজ্যের ট্যাবলয়েড পত্রিকা মিরর-এর প্রতিবেদক সাইমন রাইট সরেজমিন অনুসন্ধান করে জানান, রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনা সরকারের সাজানো নাটক ছিল।

উৎস: আমার দেশ

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়