banglarchokh Logo

শহীদ মিনার: প্রতিবাদের মঞ্চ

জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বাংলার চোখ
 শহীদ মিনার: প্রতিবাদের মঞ্চ

ভাষা দিবস না থাকলে বাঙ্গালীর জীবনে ফেব্রুয়ারি মাসের আলাদা কোন গুরুত্ব থাকতো না।এই মাসে বই মেলার উৎসব সবাইকে মাতিয়ে রাখে।এই মেলাকে উপলক্ষ করে সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে সৃজনশীল ব্যক্তিদের প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে, যাদের প্রতিভা নেই তারাও চেষ্টা করে সৃষ্টি করার।মাতৃভাষা বাংলার জন্য প্রাণ দিয়ে আমরা বিশ্ব জগতে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছি।অবশ্য বাংলা ভাষার জন্য আসামের বাঙ্গালীরাও প্রাণ দিয়েছে।ভাষার জন্য প্রাণ দেয়া মানুষগুলোর জন্যই তৈরি হয়েছে শহীদ মিনার।শহীদ মিনার প্রেরণার বাতিঘর, আঁধারে আলো ছড়ায়, পরাধীনতার শেকল ভাঙতে সাহস যোগায়, অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে উজ্জীবিত করে, নিগৃহীতদের সাহসী করে তোলে মানুষের মত বাঁচতে।মতিউর, সালাম, বরকত, রফিকেরা জন্ম নেয় মানুষের জন্য, মানবতার বিজয়ের লড়াইকে সমুন্নত রাখতে।ঢাকা মেডিকেল কলেজের উত্তর পাশে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ১৯৫২ সনে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ।২১শে ফেব্রুয়ারিতে এই স্মৃতিসৌধে হাজার হাজার মানুষ ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করে থাকে।
পাকিস্তানি শাসকদের নির্দেশে ভাষা শহীদদের হত্যার প্রতিবাদ করার মঞ্চ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ার সাথে সাথে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা তড়িঘড়ি করে ১৯৫২ সনের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু করে রাত্রির মধ্যে তা শেষ করে।দু:খের বিষয় হচ্ছে, উদ্বোধনের দিনেই পুলিশ ও সেনাবাহিনী মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং প্রথম শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে ফেলে।শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৪ সনে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও ছুটি ঘোষণা করা হয়।১৯৫৬ সনে নতুন করে আবার শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৫৭ সনে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।কিন্তু ১৯৫৮ সনে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারী করলে শহীদ মিনারের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।১৯৬২ সনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জেনারেল আজম খান শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’র নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন এবং ১৯৬৩ সনে মূল নক্সা কাটছাঁট করে তার ভিত্তিতে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শেষ হয়।১৯৭১ সনে বাংলাদেশে গণহত্যা শুরুর প্রথম দিকেই পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ভারী গোলাবর্ষণ করে শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং ধ্বংসস্তুপের উপর একটি ফলকে ‘মসজিদ’ লিখে টানিয়ে দেয়।১৯৭২ সনে পুনরায় শহীদ মিনার তৈরি করা হয়; ১৯৮৩ সনে শহীদ মিনারটিকে বর্তমান অবস্থায় আনা হয়।
শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন ভাস্কর হামিদুর রহমান।অনেক মনে করেন, হামিদুর রহমানের সহকর্মী হিসেবে পরিচিত ভাস্কর নভেরা আহমদ শহীদ মিনারের মূল নকশাটি করেছেন।মধ্যখানে স্নেহময়ী মাতার আনত মস্তক, আর মাতার দুই পাশে অতন্ত্র প্রহরায় তার চার সন্তান।পেছনের লাল সূর্যটা অন্ধকার দূর করে আলো উৎসারণের প্রতীক।শহীদ মিনারের উপর পাকিস্তানি শাসকদের ক্রোধ ছিলো বলেই তারা সুযোগ পেলেই শহীদ মিনার ধ্বংস করছে।কিন্তু এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ মিনার ভাঙ্গা হচ্ছে, এখন ভাঙ্গছে ধর্মান্ধরা।তবে ভাঙ্গার চেয়ে গড়ার সংখ্যা বেশী; খোলা মাঠে কৃষি জমিতে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের কৃষক রুমান আলী শাহ পালংশাক ও লাল শাক রোপন করে শহীদ মিনার বানিয়েছেন।
প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীকী মর্যাদা লাভ করায় এই শহীদ মিনারে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে দলে দলে মানুষ এসে ভিড় জমায়।এই শহীদ মিনার সকল অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে; ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় বাঙ্গালী মুক্তিযুদ্ধে লড়াইয়ের কঠিন শপথ নিয়েছিলো এই মিনারে দাঁড়িয়ে।ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আত্মত্যাগে নির্মিত এই শহীদ মিনার এখন হয়ে উঠেছে বাঙ্গালীর জাতিসত্তা আর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।আজও অশুভ আর অকল্যাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের আপোষহীন সংগ্রামে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে একুশের শহীদ মিনার।অসাম্প্রদায়িক, সার্বজনীন চেতনায় গড়ে উঠা এমন একটি স্মৃতিসৌধ সবার সংগ্রামী চেতনার উদ্দীপক।জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলনতীর্থ হয়ে উঠেছে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ।শহীদ মিনার এখন সকল অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শপথ নেয়ার স্থান,
আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।বায়ান্নের ২৬ ফেব্রুয়ারী প্রথম শহীদ মিনার ধ্বংসের প্রত্যক্ষদর্শী কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতায় বলেছেন, ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক ! ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী চারকোটি পরিবার’।সেই দিনই মাহবুব-উল-আলম চৌধূরী তাঁর কবিতায় নাম দিয়েছেন, ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’।
যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলে বাংলাভাষী মানুষেরা অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল, সেই পাকিস্তানও উদযাপন করছে একুশে ফেব্রুয়ারি।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভারত, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কানাডা, প্যারিসেও নির্মিত হয়েছে।বিলাতের মাটিতে এ পর্যন্ত তিনটি শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।২০০৫ সনে জাপানের শহীদ মিনারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।ভারতেও তিনটি শহীদ মিনার রয়েছে।শহীদ মিনার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশকে চেনার প্রতীক রূপে।বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায় ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’।এরশাদ সাহেবের আমলে শহীদ মিনারের বর্তমান রূপ আমরা পেয়েছি।
রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শহীদ মিনারে সংস্কৃত কর্মীদের উপস্থাপনায় নাটক, কবিতা, গানের মহড়া চলে; দর্শক উপচে পড়ে শহীদ মিনারের প্রাঙ্গণ লোকারণ্য হয়ে উঠে।সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামছুল হকের ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ কাব্য নাটকের কৃষক নেতা নূরলদীনের সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?’ যখন অভিনেতা আলী যাকেরের মুখে শহীদ মিনারে পাদদেশে উচ্চারিত হতো তখন নূরলদীনের চেতনা উপস্থিত সকল দর্শক-শ্রোতার মনে জেগে উঠতো।ইংরেজ এবং স্থানীয় জমিদারের রাজস্বনীতির বিরুদ্ধে ১৭৮৩ সনে গর্জে উঠা রংপুর এলাকার কৃষক নেতা নূরলদীন ইংরেজদের গুলিতে শহীদ হন ফেব্রুয়ারি মাসেই।নূরলদীনেরা অমর; অমর বলেই ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ বা সমাজের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলে যারাই শহীদ হয়েছেন তাদের জন্য স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছে; প্রজন্মের কাছে এই স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার আর স্তম্ভগুলোই ঘোষণা করে, ‘হামার মরণ হয়, জীবনের মরণ যে নাই।’
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কপিরাইট © 2021 বাংলারচোখ.কম কর্তৃক সর্ব স্বত্ব ® সংরক্ষিত। Developed by eMythMakers.com