Banglar Chokh | বাংলার চোখ

সড়ক সন্ত্রাসে সাংবাদিক খুনের বিচার হয় না

হাসান শান্তনু

প্রকাশিত: ২৩:২৫, ২৩ জানুয়ারি ২০২২

আপডেট: ০০:০০, ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৯

সড়ক সন্ত্রাসে সাংবাদিক খুনের বিচার হয় না

সাংবাদিকরা সড়ক সন্ত্রাসে প্রাণ হারানোর ঘটনা যেন নিরীহ কোনো প্রাণির গাড়ির ধাক্কায় সড়কে মারা গেলে ‘আলোড়ন না হওয়ার মতো’! গণমাধ্যমকর্মীরা বেপরোয়া সড়ক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মারা গেলে, বা পঙ্গু হলে সমাজের আর দশটা সাদাসিধা ঘটনার মতো আড়ালে পড়ে থাকে দুর্ঘটনার খবর। সড়ক দুর্ঘটনায় গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে অনেকে প্রাণ হারালেও এর বিচারের নজির খুব কম। নিহতের পরিবারের সদস্যরা বিচারের আশায় জীবন পার করে দিয়েও রায় না দেখে মারা যাওয়ার উদাহরণ আছে।

মত ও পথের অনুসন্ধান বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় সাংবাদিক আহত ও নিহত হওয়ার পর সহকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিত সরকারের পক্ষ থেকে কখনো কখনো বিচার, ক্ষতিপূরণের আশ্বাস পাওয়া গেলেও সেগুলো কার্যকর হয় না। ২০১৪ সালের নভেম্বরে বাসসের প্রধান সম্পাদক জগলুল আহমেদ চৌধুরী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সাত বছর কেটে গেলেও সেই কমিটির প্রতিবেদনের খবর নেই, বিচারও হয়নি।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত গণমাধ্যমকর্মীর পরিবার সাধারণত কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না। ক্ষতিপূরণের বিষয়ে শুরুতে সাংবাদিক নেতারা আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত তা ‘ঠোঁট সহানুভূতিতে’ আটকে থাকে। তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিশ্চিত করতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে সাংবাদিকদের কোনো সংগঠনও পাশে থাকে না। ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রলালয়, বা সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান সাংবাদিক সমাজের জন্য এগিয়ে আসে না। নিহতদের পরিবারের নতুন সংগ্রাম, আহতদের পরিবারের চরম আর্থিক বিপর্যয় নিজে নিজেই সামলাতে হয়।

সব শ্রেণিপেশার মানুষের মতো সাংবাদিক সমাজের সদস্যরাও সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আসছেন। এক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার সময় বেশিরভাগই পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। অথচ এ পর্যন্ত কতো গণমাধ্যমকর্মী আহত, নিহত হয়েছেন, এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে তথ্য নেই। এমনকি সাংবাদিকদের ‘অধিকার রক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত সংগঠনগুলো’ও লিখিত হিসাব রাখে না।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে মত ও পথকে বলেন, ‘পঞ্চাশ বছরে মোটাদাগে সাংবাদিকতার যে অধোগতি আর মর্যাদাহানি সমান্তরালে ঘটেছে, সেগুলোর সঙ্গে সাধারণত সাংবাদিক আর গণমাধ্যমকর্মীদের সড়কে মৃত্যুর বিচার না হওয়ার একটা সম্পর্ক রয়েছে। যেনতেন এজাহার, আলামত নষ্ট, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব, মামলাজট, ক্ষমতাবানদের অংগুলিহেলনের কারণেও কাঙ্খিত সুবিচার পাওয়া কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘আশির দশকে আমার দৈনিক সংবাদের সহকর্মী, ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু ঢাকার কাকরাইলে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পরও ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি আজও। জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্হাপনা কমিটির সদস্য, দৈনিক জনকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক ইউসুফ পাশা তাঁর কার্যালয়ে সামনের সড়কে গাড়ি চাপায় নিহত হন। আজও সুবিচার পাওয়া যায়নি। সড়কে কতো সাংবাদিকের প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো দায়সারাগোছের দুই চারটা কর্মসূচি দিয়ে তার ইতি টানে, হিসাব রাখার ফুরসত পায় না। হিসাব রাখা অবশ্যই দরকার।’

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী মত ও পথকে বলেন, ‘ডিইউজে সাংবাদিক হত্যার হিসাব লিপিবদ্ধ করে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সাংবাদিকদের তালিকা কোনো সাংবাদিক সংগঠন করে কী না, জানা নেই। এ রেকর্ডও রাখা দরকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে দুর্ঘটনা আর খুন হোক- চলতেই থাকবে।’ ডিইউজের একাংশের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু মনে করেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় কতো সাংবাদিক মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, হিসাবটা সাংবাদিক সংগঠনগুলো একক বা যৌথভাবে রাখতে পারে। সড়কেসহ যে কোনো দুর্ঘটনার শিকার সাংবাদিকরা হলে প্রথমে কারণ অনুসন্ধান করে বিচার করা দরকার।’

আলোচনায় আছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের তালিকায় সবশেষ যোগ হয়েছে দৈনিক সময়ের আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হাবিব রহমানের নাম। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে অনেকের দাবি- এ মৃত্যু রহস্যঘেরা, হত্যাকাণ্ডও হতে পারে। তবে কোনো বিষয়েই গত পাঁচদিনে পুলিশ তথ্য বের করতে পারেনি। গত ৪ ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদের সম্পাদনা সহকারী এমদাদ হোসেন, ২৫ নভেম্বর গণমাধ্যমকর্মী আহসান কবির খান গাড়ির চাপায় প্রাণ হারান।


২০১১ সালের ১৬ জুলাই সময় টেলিভিশনের যুগ্মবার্তা সম্পাদক বেলাল হোসেন, ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি দৈনিক আমাদের সময়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক দীনেশ দাস, একই বছরের ১১ মে ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্টের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিভাস চন্দ্র সাহা, একইদিন বরিশালের আঞ্চলিক দৈনিক মতবাদের ফটোসাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটু গাড়ি চাপায় মারা যান।

দৈনিক কালের কণ্ঠের সাবেক উপসম্পাদক আবদুল্লাহ আল ফারুক সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। সড়ক সন্ত্রাসে তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সমাবেশ করে ঘাতক ট্রাকচালককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দেন সাংবাদিকরা নেতারা। তবে কিছুই হয়নি, সরকার দাবি বাস্তবায়ন করেনি।

২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয়ের বিশেষ প্রতিনিধি শফিউল আলম সেলিম, একই বছরের জুনে দৈনিক ইত্তেফাকের নন্দীগ্রাম প্রতিনিধি শফিউল আলম বিপুল, ২০১৬ সালের ৫ জুলাই দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের আশুলিয়া প্রতিনিধি ইস্রাফিল শিকদার, রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক অর্জনের বার্তার সম্পাদক আশিকুর রহমান তালুকদার রবি ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

দৈনিক প্রথম আলোর সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি এনামুল হক খোকন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ৫৩ দিন লড়াই করে মৃত্যুর কাছে হার মানেন ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। ২০২০ সালের মার্চে দৈনিক যায়যায়দিনের রামগতি প্রতিনিধি রাশেদ খান, একই বছরের ৬ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক মুক্ত স্বাধীনের নিজস্ব প্রতিবেদক মহিদুল ইসলাম, ২০ ডিসেম্বর ঢাকা প্রতিদিনের পাথরঘাটা প্রতিনিধি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান জিতু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি।

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে টানা ১১ দিন ঢাকার বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন বিজয় টিভির নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম। গত ১২ জানুয়ারি তিনি মারা যান, তাঁর মৃত্যুর জন্য অভিযুক্ত চালক এখনো গ্রেপ্তার হননি। ২০২১ সালের মার্চে দৈনিক আমাদের সময়ের দুর্গাপুর উপজেলা প্রতিনিধি চন্দন কৃষ্ণ রায়, ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি ৭১ টেলিভিশনের ভিডিও এডিটর গোপাল সূত্রধর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাঁদের পরিবার বিচার পাওয়ার কোনো আশা দেখছে না।

সড়ক দুর্ঘটনায় সাংবাদিক নিহত হওয়ার পর আদালতে ক্ষতিপূরণের শুধু রায় পায় দৈনিক সংবাদের সাবেক বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর পরিবার। তাও তাঁর মৃত্যুর পর টানা দুইযুগের বেশি আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। ১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর পেপসি কোলার ট্রাক মন্টুকে চাপা দিলে তিনি মারা যান। এর প্রায় ২৬ বছর পর তাঁর পরিবারকে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। সড়ক সন্ত্রাসে সাংবাদিক মিশুক মুনীর, চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদকে হত্যা মামলার রায় হয় ছয় বছরের মধ্যে। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট তাঁরাসহ মোট পাঁচজনকে হত্যার দায়ে ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।

বাংলার চোখ

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়