আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১:৩৮, ১০ জুলাই ২০২৬
ফাইল ছবি
ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তেহরান কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন দিয়েই জবাব দেয়নি; বরং তারা বিশ্ব জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়েছিল।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন একটি যুদ্ধবিরতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে একটি কৌশলগত লাভ হিসেবে দেখেছিল, যা তারা হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না। কিন্তু ওয়াশিংটন চেয়েছিল এই জলপথটি যেন যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যায় এবং সকলের জন্য উন্মুক্ত একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে কার্যকর থাকুক।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালিটি নিয়ে এই মৌলিক মতবিরোধই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘর্ষের মূল কারণ।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত তিনটি সন্দেহভাজন ইরানি হামলার পর গত সোমবার থেকে এই চলমান সংঘাত শুরু হয়।
এর জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলে ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তুতে দফায় দফায় হামলা চালায়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার ঘোষণা করেন যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল তা ‘শেষ’ হয়ে গেছে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে দুই দেশ।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি-র সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, সমঝোতা স্মারকে নিরাপদ বাণিজ্যিক নৌচলাচলের জন্য একতরফা পদক্ষেপের পরিবর্তে সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রণালিটি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ অঙ্গীকার করেছিল।
তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ হলো, যেকোনো যাতায়াত বা সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অবশ্যই ইরানের সাথে সমন্বয় করে করতে হবে। তবে কিছু জাহাজ ওমান উপকূল ঘেঁষে ইরানের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছাড়াই প্রণালিটি পার হচ্ছে।
মোর্তাজাভি বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরানকে বাদ দিয়েই প্রণালিতে সমান্তরাল শিপিং রুট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। ইরান এটিকে সমঝোতা স্মারকের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। আর এই কারণেই চুক্তিটি কীভাবে ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ করা হবে, তার প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি।
সমঝোতা স্মারকে কী বলা হয়েছে?
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে চুক্তির পাঠ্যটি একেবারেই চূড়ান্ত বা সুনির্দিষ্ট নয়। এতে ইরানকে মাইন অপসারণ এবং প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হলেও বলা হয়েছে যে, সমঝোতা স্মারকের প্রথম ৬০ দিন জাহাজগুলোকে কোনো শুল্ক ছাড়াই চলাচল করতে দিতে হবে।
এই সময়সীমা অবশ্য চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের একটি টোল বা শুল্ক ব্যবস্থা চালু করার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয় না।
একই সময়ে সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইন এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সংগতি রেখে এই জলপথে সামুদ্রিক পরিষেবাগুলো নির্ধারণ করতে ইরান একাধারে ওমান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে আলোচনা করবে।
উভয় পক্ষের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার কারণে সমঝোতা স্মারকের কিছু অংশ এখন বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল-এর পলিসি ডিরেক্টর রায়ান কস্টেলো বলেন, সমঝোতা স্মারকের মূল পাঠ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের সময় পরিস্থিতি কেমন হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে তেমন কিছু বলা নেই। ইরান এটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করছে যে, কে কোথায় যাবে তা ইরান নিয়ন্ত্রণ করবে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছে এবং প্রণালির মধ্য দিয়ে মূলত একটি দ্বিতীয় ট্রানজিট রুট তৈরি করতে চেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেছে। একে একটি 'ফ্যাক্ট চেক' হিসেবে উপস্থাপন করে তারা দাবি করেছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল কেবল ইরানের নির্ধারিত রুটের মাধ্যমেই অনুমোদিত—এই তথ্যটি সত্য নয়।
সেন্টকম জানায়, সত্য হলো- হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে নেই। মে মাসের শুরু থেকে মার্কিন বাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোরের মধ্য দিয়ে ৮০০-রও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ৩৮০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের সফল ট্রানজিটে সহায়তা করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল বার্ষিক শত শত কোটি ডলারের সম্ভাব্য শুল্ক আদায়ের জন্যই নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ আক্রমণ ঠেকাতে একটি ‘প্রতিরোধক’ হিসেবেও কাজ করবে।
গত মার্চ মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিজের প্রথম বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি এই জলপথের নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার লিভারটি অবশ্যই ক্রমাগত ব্যবহার করতে হবে।’
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রচেষ্টা
রায়ান কস্টেলো বলেন, ইরানে একটি ধারণা রয়েছে হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে এমন একটি অনুভূতি কাজ করছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি নতুন কৌশলগত সুবিধাকে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। এই সুবিধাটি, অন্তত নিকট ও মধ্যমেয়াদে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও তাদের দরকষাকষির ক্ষমতার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।’
রায়ান কস্টেলো আরও বলেন, ‘তাই, যুক্তরাষ্ট্র যদি কার্যকরভাবে প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ক্ষুণ্ন করতে পারে, তবে তা ইরানের সামগ্রিক দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়া রোধ করার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রাথমিক হামলার পর এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম যুদ্ধের আগের প্রতি গ্যালন (৩.৭৮ লিটার) ৩ ডলারের কম থেকে বেড়ে ৪.৫ ডলারের বেশি হয়ে যায়, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায় এবং যুদ্ধ নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের চাপ না থাকলে তিনি ইরানের সাথে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত করতেন এবং দেশটির তেলসম্পদ দখল করতেন। তিনি এপ্রিলে বলেছিলেন, “এটি ‘দুর্ভাগ্যজনক’ যে তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য আমেরিকানদের ‘ধৈর্য’ নেই।”
জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ১৪-দফার সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যখন লড়াই শেষ হয়েছে বলে মনে হয়েছিল, তখন বাজার কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেয়, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হয়, শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয় এবং তেলের দাম কমতে শুরু করে।
তবে, চুক্তির শুরুর দিনগুলো থেকেই উত্তেজনা আবার বাড়তে শুরু করে।
তাত্ক্ষণিক বিরোধের মূল জায়গাটি ছিল ইসরায়েলের আক্রমণ বন্ধ করতে এবং দক্ষিণ লেবাননে তাদের দখলদারত্বের অবসান ঘটাতে অস্বীকৃতি জানানো। অথচ সমঝোতা স্মারকে স্পষ্টাক্ষরে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতি এবং লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
সহিংসতার চক্র
চলতি সপ্তাহের সংঘর্ষগুলো সবচেয়ে মারাত্মক হলেও, যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এবারই প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তা নয়।
সমঝোতা স্মারকের পর প্রথম সহিংসতাটি এই হরমুজ প্রণালি নিয়েই ঘটেছিল।
গত ২৫ জুন ওমান উপকূলে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানে হামলা চালায় এবং ইরানি সামরিক বাহিনী উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সেনাদের আতিথ্য দেওয়া ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তার জবাব দেয়।
সেই ঘটনাটি সীমিত পরিসরে ছিল এবং দ্রুত শেষ হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান চক্রটি আরও তীব্র এবং এটি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই সপ্তাহের শুরুর দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানি তেলের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সুবিধাও বাতিল করেছে।
এ বিষয়ে রায়ান কস্টেলো বলেন, সহিংসতা শুরু হওয়া সত্ত্বেও উভয় পক্ষের কিছু অভ্যন্তরীণ বাস্তব পরিস্থিতি রয়েছে যা তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে।
ইরানে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এর পাশাপাশি সরকার জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের মতো আবারও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চিন্তা করলে বলা যায়, যুদ্ধের সময় আকাশচুম্বী পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যে তেলের রিজার্ভ বা মজুত গড়ে তোলা হয়েছিল, তা এখন কমে আসছে। এছাড়া কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণকারী মধ্যবর্তী নির্বাচন আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা চার মাসেরও কম সময় বাকি রয়েছে।
রায়ান কস্টেলো বলেন, ‘কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে যার কারণে কেউ আশা করতেই পারে যে, এই যুদ্ধটি ইতিমধ্যে যতটা দীর্ঘ হয়েছে তার চেয়ে বেশি স্থায়ী হবে না।’
রায়ান কস্টেলো আরও যোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সংঘাত শুরু করে মূলত একটি ‘বিপদের ঝুড়ি’ খুলে দিয়েছেন, যা শুরু করার চেয়ে শেষ করা অনেক বেশি কঠিন বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ‘অনন্ত যুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সূত্র: আল জাজিরা