ঢাকা, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

১৯ আষাঢ় ১৪৩৩, ১৭ মুহররম ১৪৪৮

এল নিনো ‘শক্তিশালী’ রূপ নিতে যাচ্ছে, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

নাঈম পারভেজ অপু ,বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৩:৪৬, ৩ জুলাই ২০২৬

এল নিনো ‘শক্তিশালী’ রূপ নিতে যাচ্ছে, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

প্রতীকী ছবি

এল নিনো ইতোমধ্যেই চলে এসেছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত একটি শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে, যা চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুক্রবার (৩ জুলাই) জাতিসংঘের জলবায়ু সংস্থা এই সতর্কবার্তা দিয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এই জলবায়ু পরিস্থিতি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করবে। একই সাথে সংস্থাটি দেশগুলোকে এর প্রভাব মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

এল নিনো মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। এটি সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ঘটে এবং প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। মাঝের নিরপেক্ষ সময়টুকু বাদ দিলে, আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি মূলত এল নিনো এবং এর বিপরীত রূপ 'লা নিনা'-র মধ্যে ওঠানামা করে।

ডব্লিউএমও-এর মাসিক 'গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট' ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ‘জুলাই-সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত একটি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিতে রূপ নিতে যাচ্ছে।’

জাতিসংঘের এই সংস্থাটি এল নিনোর তীব্রতাকে মৃদু, মাঝারি, শক্তিশালী বা অত্যন্ত শক্তিশালী— এই চার ভাগে বিন্যস্ত করে। সেটা অনুযায়ী, এবারের এল নিনো চারটির মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে চলেছে।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, উষ্ণমন্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে এটি দ্রুত শক্তিশালী হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বের অনেক অংশে... চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলবে।

দাবদাহের ঝুঁকি

ডব্লিউএমও-এর জলবায়ু বিজ্ঞানী আলভারো সিলভা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত মাস থেকে আমরা অনেক বেশি নিশ্চিত যে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

আলভারো সিলভা আরও বলেন, আগামী মাসগুলোতে ডব্লিউএমও নতুন আপডেট জারি করতে পারে, পূর্বাভাস যদি ইঙ্গিত দেয় যে এটি সত্যিই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো হতে যাচ্ছে।

জেনেভা-ভিত্তিক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু কেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করে তৈরি করা পূর্বাভাসগুলো মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা ক্রমাগত এবং উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সংস্থাটি জানায়, প্রধান পর্যবেক্ষণ অঞ্চলগুলোতে ঋতুভিত্তিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। উত্তর গোলার্ধের শরৎকালেও এল নিনোর শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং এর প্রভাব বিশ্বের অনেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।

গতবারের এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সালটি রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর এবং ২০২৪ সালটি সর্বকালের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, যা শিল্পায়নের পূর্ববর্তী সময়কালের (১৮৫০-১৯০০) গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় ১.৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

যদিও এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির চূড়ান্ত রূপটি সাধারণত আরও পরে দেখা যায়।

সিলভা জোর দিয়ে বলেন, এল নিনোর প্রভাব বছরের শেষ পর্যন্ত এবং তার পরেও, এমনকি ২০২৭ সাল জুড়েই বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হবে।


ডব্লিউএমও জানিয়েছে, তারা আগাম সতর্কবার্তা সংক্রান্ত সহায়তা জোরদার করছে যেন দুর্যোগ প্রস্তুতিতে সুবিধা হয়; বিশেষ করে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোতে।

ডব্লিউএমও প্রধান চেলেন্তে সাউলো বলেন, জীবন বাঁচাতে এবং আমাদের অর্থনীতি ও সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাব কমাতে এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, ‘এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং এটি দ্রুত একটি শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক অঞ্চলে খরা ও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা এবং স্থলভাগে দাবদাহ ও সামুদ্রিক দাবদাহের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

তাপমাত্রার প্রভাব

পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ থেকে ৬০ ডিগ্রি উত্তরের মধ্যবর্তী বেশিরভাগ স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। স্থলভাগের এই পরিধি মেরু অঞ্চলের বাইরে প্রায় সমস্ত জনবহুল এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসও একটি শক্তিশালী হতে থাকা এল নিনোর সাথে মিলে যায়। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত এবং ভারতীয় উপমহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

ডব্লিউএমও-এর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর পুনরাবৃত্তি বা তীব্রতা বাড়ে— এমন কোনো প্রমাণ নেই।

তবে সংস্থাটি মনে করে, জলবায়ু পরিবর্তন এর প্রভাবকে আরও তীব্র করতে পারে। কারণ উষ্ণ সমুদ্র এবং বায়ুমণ্ডল চরম আবহাওয়া যেমন— দাবদাহ এবং ভারী বৃষ্টিপাতের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও জলীয় বাষ্পের জোগান বাড়িয়ে দেয়।

উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় তৈরিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে, যদিও আটলান্টিক মহাসাগরে এটি ঘূর্ণিঝড় গঠনে বাধা দেয়।

গত বৃহস্পতিবার, এল নিনোর কারণে ভারী বৃষ্টির ‘আসন্ন বিপদের’ মুখে পেরু তাদের ১৮০০টি পৌরসভার মধ্যে ৮০০টিতে ৬০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পেরুর ৯৩ লাখেরও বেশি মানুষকে বন্যা এবং ভূমিধসের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

আরও পড়ুন