ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

১২ শ্রাবণ ১৪৩৩, ১১ সফর ১৪৪৮

নতুন রাষ্ট্রপতি : জুলাই অভ্যুত্থান প্রজন্মের প্রত্যাশা

 এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া 

প্রকাশ: ০১:৪১, ২৮ জুলাই ২০২৬

নতুন রাষ্ট্রপতি : জুলাই অভ্যুত্থান প্রজন্মের প্রত্যাশা

.

০১. ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই—এই তিন বছর তিন মাস বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। চলতি বছরের ২৪ জুলাই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তার এই অধ্যাপয়ের সমাপ্তি হলো। যদিও জুলাই-আগষ্টের অভু্যত্থানের পর থেকেই তার পদত্যাগ ও অপসারনের বিষয়ে নানা চাপ তৈরী হয়েছিল। এক পর্যায়ে তাকে পদত্যাগ করতে বা অপশারন করতে ব্যাপক আন্দোলনও গড়ে তুলেছিল জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী শক্তির একাংশ। তাদের আন্দোলন সফলতার আলো দেখে নাই কারন, দেশের বৃহত রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরোধীতার কারনে। রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালের বিএনপি ও তার সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলোও চায় নাই দেশে আর কোন সাংবিধানিক শূণ্যতা সৃষ্টি হোক। যাতে কেন্দ্র করে নতুন কোন অপশক্তি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বাঁধাগ্রস্থ করতে পারে। পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দায়িত্ব পালনকালের অধ্যায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম চমকপ্রদ ও বিতর্কিত। আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রাধান্যের সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষী হয়েছেন। তার হাতেই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার, পরে জনগনের ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ গ্রহন করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব পালন করা রাষ্ট্রপতির নজির বিরল।

২৪ জুলাই জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের নিকট পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে মো. সাহাবুদ্দিন অধ্যায়ের অবসান ঘটে। পদত্যাগপত্রে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ সিদ্ধান্তের পেছনে আরও কিছু কারণ নিয়ে আলোচনা চলমান। এটি হয়তো অদূর ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনেকেরই মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চাপ, গ্রহণযোগ্যতার সংকট এবং একটি ‘নিরাপদ প্রস্থান’ (সেফ এক্সিট) নিশ্চিত করার সমঝোতাই শেষ পর্যন্ত তার পদত্যাগের পথ তৈরি করে। যদিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতাকে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, শারীরিক অক্ষমতার কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।

০২. বঙ্গভবনের সদর দরজা দিয়ে রাষ্ট্রপতিরা প্রবেশ করেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, আনুষ্ঠানিকতা ও প্রত্যাশার বিপুল ভার কাঁধে গ্রহন করে। শপথের দিন তাঁদের সামনে জাতীয় পতাকা, সামরিক স্যালুট, রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার থাকে। কিন্তু সেই একই বঙ্গভবনের দরজা দিয়ে বিদায়ের সময় দৃশ্যটি অনেক সকল সময় সম্মানের হয় না। কেউ বিদায় নেন নীরবে, কেউ অপমানের ভার নিয়ে, কেউ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ বিদায়বেলা সংবর্ধনাটুকুও পান না। মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায় সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই আরেকটি অধ্যায়।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখর থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘটনা রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বেচ্ছায় এ ধরনের প্রস্থান কখনো রাজনৈতিক সংকট মোচনে, কখনো শারীরিক অসুস্থতার কারণে, আবার কখনো নৈতিক দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আবির্ভূত হয়ে থাকে। বিশ্ব রাজনীতি এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রনেতাদের এই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্তগুলো শাসনতান্ত্রিক বিবর্তন ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

বিশ্ব রাজনীতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষন করলে বুঝা ও দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি কেবল একটি ব্যক্তিগত প্রস্থান নয়, বরং এটি গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ ও শাসনতান্ত্রিক সংকটের ফলশ্রুতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক নৈতিকতা, গণআকাংখা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ওপরই নির্ভর করে। তিন বছর তিন মাস পর মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ও হলো তেমনি আলোচিত, বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই তাঁকে পদ ছাড়তে হলো।

০৩. সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একবার তিক্ত রসিকথাচ্ছলে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতির কাজ যেন ‘মিলাদ পড়া ও কবর জিয়ারত’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কথাটি নিছক ব্যক্তিগত হতাশা থেকে বললেও এর মধ্যে ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক বাস্তবতার একটি গভীর উপলব্ধি ও সমালোচনা। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান, কিন্তু সরকারের প্রধান নন। তিনি জাতির প্রতীক, কিন্তু নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর কোন ভুশিকাই থাকে না। তিনি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসেন, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে থাকে বহু জোজন দূরে। এখানেই হয়তো তৈরী হয়ে থাকে অদ্ভুদ এক রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবেই। সংসদে ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে নির্বাচন প্রায় আনুষ্ঠানিকতায়ই পরিণত হয়। তার মোননীত প্রার্থী বিজয়ী হবেন বা হন এটাই স্বাভাবিক। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত থেকেই তাঁর ওপর একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের ছাপ থাকে। অথচ রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁকে হতে হয় সমগ্র রাষ্ট্রের প্রতীক। এখানেই মৌলিক দ্বন্দ্ব—দলীয় মনোনয়ন থেকে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার যাত্রা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষন করলে দেখায় যায় যে, দলীয় রাষ্ট্রপতি ও নিরপেক্ষতার এই দ্বন্দ্বের পরিণতি খুব বেশী সুখকর নয়। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার শিকার হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও হত্যার শিকার হয়েছেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতা হারিয়েছেন সামরিক অভ্যুত্থানে। এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন এবং গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। মোহাম্মদ উল্লাহ, বিচারপতি সায়েম কারো পরিনতি সুখকর নয়। অন্যদিকে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে গণতন্ত্রের উত্তরণে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করলেও পরবর্তীতে পরে রাজনৈতিক বিরোধের তিক্ততা থেকে তিনিও মুক্তি পান নাই। রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপি সরকারের সঙ্গে বিরোধে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আর সাম্প্রতিক সময়ে মো. সাহাবুদ্দিনও বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে বঙ্গভবন ছাড়লেন বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। দেশের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই পদত্যাগ এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলেই অনেকে মনে করেন।

০৪. রাষ্ট্রপতির পদটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পর এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে জাতীয় সংসদের ওপর-একজন সর্বজনগ্রাহ্য, নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্বকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করা। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীত বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান উপহার দিতে হবে, যিনি দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক কাঠামোর সুরক্ষা প্রদান করবেন এবং গণপ্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখবেন। এটা কি আদৌ সম্ভব হবে।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী— দেশের প্রতিটি মানুষের মুখেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে শুধু ‘পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন’ প্রশ্নটি নয়। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে— নতুন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কি আগের মতোই কেবল আনুষ্ঠানিক থাকবে, নাকি সেটি এবার সত্যিই বাড়বে? ইতিমধ্যে, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ ও তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন কোন সাবেক আমলা এমন আলোচনায় রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যদিও বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক কোন ঘোষণা আসেনি, তবুও আলোচনার সূত্রপাত লন্ডনপ্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। খবরের চেয়েও বেশি আলোচিত হচ্ছে—জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রপতি করার যৌক্তিকতা এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যত ফলাফল নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, সংকটময় এই সময়ে একজন আমলাকে রাষ্ট্রপ্রধান করা কি দেশের জন্য মঙ্গলকর, নাকি গণতান্ত্রিক চর্চায় দলীয় শক্তিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত?

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য একেবারেই নাই বললেই চলে। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীই নির্বাহী বিভাগের প্রকৃত প্রধান, আর রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। এর মূল কারণ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল দুটি কাজ— সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ—ছাড়া বাকি প্রায় সব সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে চলতে হয়। মন্ত্রী, আমলা, রাষ্ট্রদূত বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের প্রধান নিয়োগ, সংসদে বিল পাস, সামরিক বাহিনীর মূল নিয়ন্ত্রণ— সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর হাতে। যদিও ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নানা আলোচনা আছে। জুলাই সনদে দুই ক্ষমতার বলয়ের ক্ষমতার ভারসাশ্যের কথা বলা হলেও তা কি আদৌ বাস্তবায়ন হবে ? রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা মওকুফ করতে পারেন, আবার জরুরী অবস্থাও জারি করতে পারেন। কিন্তু, সত্য হচ্ছে এই দুটি কাজের জন্যও তিনি স্বাধীন নন, এদুটো কাজ করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বা প্রতিস্বাক্ষর লাগে।

এই কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রায়ই ‘নির্বাচিত একনায়ক’ বলেই অভিহিত করে থাকেন। কারণ, বস্তুত তিনিই একসঙ্গে নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ, দুটোরই নিয়ন্ত্রক। বিগত সময়ের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, একজনের হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলে তা কীভাবে ধীরে ধীরে একচ্ছত্র শাসনের দিকে যেতে পারে। জুলাই বিপ্লবের পর তাই তরুণ প্রজন্ম ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনার দাবি জোরালো হয়েছিল। যদিও এখন আর এই বিষয়ে তেমন কোন আলোচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন বা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির স্বাধীন এখতিয়ারে দেওয়ার কথাও আলোচিত হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জনের মধ্যে এই রকম গুঞ্জনও রয়েছে যে, নতুন স্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই সংসদে একটি বড় সংবিধান সংশোধনী (সম্ভাব্য ১৮তম সংশোধনী) আসতে পারে, যার মূল লক্ষ্য হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতি ও সংসদের ক্ষমতা বাড়ানো।

০৫. দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকার গঠন করেছে বিএনপি। বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মী জেল-জুলুম, মামলা-হামলা, গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে যুব, ছাত্র, পৌর—সব স্তরের নেতাকর্মীরা ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে যেমন দলকে বাঁচিয়েছেন, তেমনি ফ্যাসিবাদী চক্রকে প্রতিহত করে দেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে এনেছেন। এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই দলের ভেতর থেকে যোগ্য কাউকে মূল্যায়নের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই রাষ্ট্রপতির সরকার পরিচালনায় তেমন ভূমিকা না থাকলেও রাষ্ট্রের প্রধান সম্মানীয় ব্যক্তি হিসেবে দলীয় কোনো নেতাকে এই পদে বসানোর চাওয়া দীর্ঘদিনের। দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে প্রয়োজনে বিরোধী দলের সঙ্গেও সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারেন—এ যুক্তি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রবল।

অতিতের রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে বিএনপিকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস একটি অগণতান্ত্রিক প্রচেষ্টাকে সফল ভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আবার ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেরাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে দলীয় নেতা জিল্লুর রহমান ও তাঁর মৃত্যুর পর আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হন। আব্দুল হামিদ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে বিরোধী দলের আন্দোলনের সময়ও প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে বৈঠক করে দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন, সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন; যদিও পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কারণে। অন্যদিকে রাজনীতির বাইরে থেকে রাষ্ট্রপতি বানানো অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ কিংবা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন—কেউই কোনো সঙ্কটময় মুহূর্তে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন নাই। এমনকি যে দল তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করেছে, সে দলকেও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা। রাজনীতির গভীরতা, দলীয় সম্পর্ক ও জনসংযোগের অভাবে তাঁরা সংকটকালে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারেননি। এটি একটি শক্তিশালী যুক্তি যে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবিহীন কেউ রাষ্ট্রপতি হলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, আমলাতন্ত্র যেমন দক্ষ, তেমনি রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তাদের কোন দক্ষতা না থাকায় রাষ্ট্র ও সরকার দুটোই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সামাজিক বিভক্ত বাস্তবতায় আমলা থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংকটকালে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সরকার, বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা উচিত, যিনি রাজনৈতিকভাবে প্রজ্ঞাবান, আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয়। কেবলমাত্র দলীয় স্বার্থ বা আমলাতান্ত্রিক সুবিধা নয়, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেয়া সময়ের দাবি।

অন্যদিকে জুলাই-আগষ্ট অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা হচ্ছে, তারা বঙ্গভবনে শুধু একজন নতুন মুখ নয়, এমন একটি ব্যবস্থা দেখতে চায় যেখানে ক্ষমতা একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত না থেকে যথাযথভাবে বিভক্ত থাকে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই সেই প্রত্যাশা পূরনে হবে- সেটার জন্যই এখন অপেক্ষা করতে হবে।

[ লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক]

আরও পড়ুন