প্র্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২:৫১, ৬ জুলাই ২০২৬
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অতি ভারী বৃষ্টিতে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বসতঘর। ছবি :সংগৃহীত
টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। একদিনেই ১৯৩টি ভূমিধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। প্রাণহানি ও দুর্যোগের ঝুঁকি এড়াতে এখন পর্যন্ত ৪৮৯টি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এসব পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টির পর আগামী তিন দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘বর্তমানে বায়ুচাপের ব্যাপক তারতম্য বিরাজ করছে। এর প্রভাবে সমুদ্রবন্দর এলাকায় দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তাই সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।’
তিনি জানান, বায়ুচাপের এই তারতম্যের কারণে প্রচুর মেঘ সৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে আগামী তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আগাম সতর্কবার্তাও জারি করা হয়েছে।
মো. আব্দুল হান্নান আরও বলেন, ‘রোববার বিকেল ৩টা থেকে সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ ৮৯ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলেই তাকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে ধরা হয়। টানা দুই-তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে মাটি ইতোমধ্যেই সম্পৃক্ত অবস্থায় রয়েছে। যদি আগামী দুই-তিন দিনও একই মাত্রার বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তাহলে ভূমিধসের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।’
এদিকে কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্প-৯ থেকে ১৫ পর্যন্ত এলাকা সবচেয়ে বেশি ভূমিধস ও দুর্যোগঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ক্যাম্পে বসবাস করছেন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। পাহাড়ে অনিরাপদ বসবাসের কারণে প্রতি বর্ষাতেই ভূমিধস, প্রাণহানি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি ঘটছে। ফলে সবসময় চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন এসব রোহিঙ্গা।
ক্যাম্প-১০ এর সি ব্লকের বাসিন্দা দিলদার বেগম বলেন, ‘ক্যাম্পের জীবন বেশি কষ্টের। কারণ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাস করতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে প্রতিবছরই পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই আমরা খুবই ভয়ের মধ্যে আছি।’
ক্যাম্প-৪ এর বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই ভয় লাগে। কারণ পাহাড় ধসে পড়ে। তাই রাতে জেগে থাকি।’ একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে পড়ে। এটা প্রতিবছরই হয়। পাহাড়ের ওপর থাকি, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সবসময় ভয়ে থাকি।’
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি (কমিউনিটি নেতা) এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিয়মিত সচেতন করা হচ্ছে। মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে টানা বা অতিভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে তারা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান।’
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘সব ক্যাম্প ইনচার্জকে নিয়ে আমরা প্রস্তুতিমূলক সভা করেছি। আমাদের কাছে থাকা সব প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় আমরা প্রস্তুত।’
তবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন বলছে, অর্থসংকটে ক্যাম্পের অনেক লার্নিং সেন্টার এখন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের লার্নিং সেন্টার, বিভিন্ন বিতরণ কেন্দ্র, নারী ও শিশুদের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ স্থান ব্যবহার করে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। তবে অর্থসংকটের কারণে অনেক লার্নিং সেন্টারের অবস্থা এখন আর আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী নেই। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের আত্মীয়-স্বজনের ঘরবাড়ি এবং বিভিন্ন কমিউনিটি স্পেসে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে।’
তিনি জানান, ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫-এ ভূমিধস ও দুর্যোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৪৮৯টি রোহিঙ্গা পরিবারকে অন্যত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।