আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩:৫৬, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে কাঁদছে বাংলাদেশ। তিনি দীর্ঘ জেলজীবন ও অসুস্থতার পর সবাইকে কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছেন। জনসমক্ষে তার শেষ উচ্চারিত বাক্য ছিল- ‘দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিস্ট ও অবৈধ সরকারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি’। বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে এভাবেই লিখেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আরেক নারী নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার পালাবদল দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির ভাগ্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন খালেদা জিয়া। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের অস্থির ইতিহাসে একের পর এক সামরিক শাসনে কেটেছে। এমন একজন শাসকের স্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি দুটি পূর্ণ মেয়াদ ও একটি সংক্ষিপ্ত মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত তিন দশকের বেশির ভাগ সময় তিনি পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করেছেন শেখ হাসিনার সঙ্গে। শেখ হাসিনা দেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্টের কন্যা এবং ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন। অবশেষে গত বছর রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি।
জীবনের শেষ দশকে খালেদা জিয়া অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নে জর্জরিত ছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার আমলে কখনো কারাগারে, কখনো গৃহবন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় জমেছিল। তাঁকে বারবার হাসপাতালে নেওয়া-আনা করা হয় নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে। বয়সজনিত নানান জটিলতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বাতজ্বর, ডায়াবেটিস ও গুরুতর লিভার সমস্যায় আক্রান্ত।
২০২১ সালে কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাঁকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলের আদালত তাঁর আইনজীবীদের একের পর এক আবেদন নাকচ করে দেয়। সে সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, খালেদা জিয়া চাইলে যে কোনো বিদেশি চিকিৎসককে বাংলাদেশে এনে চিকিৎসা করাতে পারেন, তবে তাঁকে বিদেশ যেতে দেয়া হবে না।
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর খালেদা জিয়া গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পান এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা প্রায় এক ডজন মামলা খারিজ হয়। তবু তিনি শয্যাশায়ীই রয়ে যান। হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও তাঁর দল বিএনপি তাঁকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের জন্য তিনটি আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। এই নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার কথা।
হাসপাতালের শয্যা থেকেই শেখ হাসিনার পতনকে ‘স্বৈরাচারের অবসান’ বলে অভিহিত করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিস্ট ও অবৈধ সরকারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি’।
১৯৪৫ বা ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত ভারতের বৃটিশশাসিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির দিনাজপুর জেলায় খালেদা খানম পুতুল নামে তাঁর জন্ম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁর জন্মতারিখকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। তাঁর পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন চায়ের ব্যবসায়ী, মা তায়্যেবা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। দলীয় প্রকাশনা অনুযায়ী তিনি দিনাজপুরেই স্কুলশিক্ষা শেষ করেন।
উপমহাদেশের দুটি বিভাজন তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর তাঁর পরিবার পাকিস্তানে চলে যায়। তখন তিনি ছিলেন শিশুকন্যা। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ দমনপীড়ন ও রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশে রূপ নেয়।
ষাটের দশকে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়া পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন; পরিচিত হন জেনারেল জিয়া হিসেবে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনীতি নেমে যায় সহিংস অস্থিরতায়। সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত চক্র শুরু হয়। ওই বছর ১৫ই আগস্ট প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ রাতের আঁধারে নিজ বাসভবনে হত্যা করা হয়। তাঁর দুই জীবিত কন্যার একজন শেখ হাসিনা পরে পিতার রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধারণ করেন এবং সেই ট্র্যাজেডির স্মৃতি তাঁর রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
সে সময় সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জেনারেল জিয়া দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং দুই বছরের অস্থিরতা পেরিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেন। সামরিক পোশাক বদলে স্যুট-টাই পরে তিনি নবগঠিত বিএনপিকে নির্বাচন জিতিয়ে ক্ষমতার বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত আরেক অভ্যুত্থানের শিকার হন ১৯৮১ সালে। চট্টগ্রাম সফরে থাকা অবস্থায় সেনা কর্মকর্তাদের গুলিতে তিনি ও তাঁর ছয়জন দেহরক্ষী নিহত হন। এর কিছুদিন পরই খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং দ্রুত বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন। কিন্তু দেশ আবার সামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়। সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নিজেকে দেশের শাসক ঘোষণা করেন। এরশাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনই প্রথমবারের মতো দেশের দুই প্রধান নারী প্রতিদ্বন্দ্বীকে একই মঞ্চে আনে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাপক গণআন্দোলন সংগঠিত হয়।
১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর প্রথম মেয়াদ শুরু হয় তখনই। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ সংক্ষিপ্ত হয়। কারণ বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে এবং সংসদ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচনের পক্ষে মত দেয়। সেই নির্বাচনে তিনি শেখ হাসিনার দলের কাছে পরাজিত হন। ফলে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া আবার ক্ষমতায় ফেরেন। এবার কয়েকটি ইসলামপন্থি দলের জোটে নির্বাচিত হন। তবে ক্ষমতার এ মেয়াদে উগ্রবাদ বেড়ে ওঠার অভিযোগ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি মামলার চাপ বাড়তে থাকে। সেগুলোকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করেন।
তৃতীয় মেয়াদের শেষে তাঁর পতনের সূচনা হয়। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। প্রায় একই সময়ে শেখ হাসিনাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। নির্বাচনের ঠিক আগে উভয়েই মুক্তি পান এবং শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তী ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করেন। বন্দিত্বের সময় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা কাছাকাছি দুটি বাড়িতে আটক ছিলেন। হাসিনা নাকি নিজের খাবার তাঁর সঙ্গে ভাগাভাগি করতেন। তবে প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষ বছরে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ‘নতুন নির্মিত একটি বাড়িতে’ গৃহবন্দি ছিলেন।
‘ভালো জায়গা, ভালো আসবাব- সবকিছুই ভালো’ বলেন হাসিনা। ‘আমার জন্য সবই ছিল পুরোনো, ভাঙাচোরা।’
পরিবার হারানোর যন্ত্রণায়- যা তিনি প্রায় প্রতিটি ভাষণে উল্লেখ করতেন- শেখ হাসিনা কিছুটা হলেও জিয়া পরিবারকে দায়ী করতেন। ২০০৯ সালে খালেদা জিয়াকে সেই সরকারি বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যেখানে তিনি ও তাঁর পরিবার তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছিলেন। এটাকে অনেকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ বলে মনে করেন। কারণ ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার আমলে শেখ হাসিনাকেও তাঁর সরকারি বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও ক্রমে ডজনের ঘরে পৌঁছায়। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রীয় এতিমখানা তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরে তা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। মামলাগুলোর মধ্যে একটি ছিল যে তিনি নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জন্মদিন ভুল উল্লেখ করেছেন- ১৫ আগস্ট। এদিন শেখ হাসিনা তাঁর পরিবার হত্যার স্মরণে শোক পালন করেন। ২০১৬ সালে শেখ হাসিনা-সমর্থিত এক ব্যক্তির অভিযোগে আদালতে হাজির না হলে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
বিএনপির আইনি শাখার আইনজীবী সাঈদ নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ ছিল তিনি বহুদিন ধরে ১৫ আগস্টে ভুয়া জন্মদিন পালন করছেন। কিন্তু বাস্তবে সেটিই তাঁর প্রকৃত জন্মদিন।
তাঁর রেখে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বড় ছেলে তারেক রহমান। তিনি ২০০৮ সাল থেকে বৃটেনে নির্বাসনে থেকে দল পরিচালনা করছিলেন। তাঁর আরেক ছেলে আরাফাত রহমান ২০১৫ সালে হৃদ্রোগে মারা যান। তারেক রহমান ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন।