নাঈম পারভেজ অপু ,বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১:১৪, ১৯ জুন ২০২৬
ছবি :সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সমাঝোতা চুক্তির মাঝে সম্ভাবনা দেখছে সরকার। ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার খবরে সেখান থেকে তেল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
প্রাথমিকভাবে ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে সিঙ্গাপুরের রিফাইনারিতে পরিশোধন করে বাংলাদেশে ব্যবহার করা হবে। এজন্য জ্বালানি বিভাগ ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তেল কেনার ব্যাপারে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের কয়েক বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের চেষ্টা চলছে। তবে এ সম্পর্ক তৈরিতে কাজটি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে উদ্যোগ দরকার।
জ্বালানি বিভাগে একাধিক বৈঠকে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে সেখান থেকে পরিশোধিত তেল পাওয়া কঠিন। তবে সরকার টু সরকারের মাধ্যমে (জি-টু-জি) সস্তায় অপরিশোধিত তেল পাওয়া সম্ভব। তা কাজে লাগাতে চায় সরকার।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো একমাত্র রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারি ছাড়া অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মতো রিফাইনারি বাংলাদেশে নেই। বর্তমানে বছরে মাত্র ১০ থেকে ১২ টন অপরিশোধিত বা ক্রুড সেখানে পরিশোধন করা হয়। সেই ক্রুড সৌদি আরব থেকে কেনার চুক্তি আছে। এখন নতুন করে ইরান থেকে ক্রুড এনে পরিশোধন করার সুযোগ নেই। তাই সিঙ্গাপুরের রিফাইনারিতে সেই ক্রুড পরিশোধ করে বাংলাদেশে আনা যেতে পারে। সাধারণত ইরানের ক্রু অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ সস্তা। সিঙ্গাপুরে দৈনিক ১১ লাখ থেকে ১৩ লাখ ব্যারেল ক্রুড পরিশোধনের ক্ষমতা আছে। অনেকে সেখান থেকে পরিশোধন করে বিভিন্ন দেশে সরবরাহ দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকালে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট। ওই এমওইউ অনুযায়ী আগামী ৬০ দিনের মধ্যে উভয়পক্ষের চূড়ান্ত চুক্তি হবে। সেই চুক্তির শর্ত মানলে পর্যায়ক্রমে ইরান থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরান থেকে জ্বালানি তেল কিনতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ ইরানের তেল আমদানিতে আগ্রহী হলেও ইরান সস্তায় তেল বিক্রিতে রাজি হবে তা বলা কঠিন। কারণ বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ জয়যাত্রা ৩১ জন নাবিকসহ গত ৪ মাস ধরে হরমুজের ওপারে যুদ্ধের কারণে আটকে আছে।
এই জাহাজ ছেড়ে দিতে গত ৪ মাসে কমপক্ষে ১০ বার চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হলেও তারা ছাড়েনি। অথচ ওই সময়ে চীন এবং ভারতের অনেক জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, যুদ্ধ বন্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বেশ পতন হয়েছে। ব্র্যান্ড ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলার থেকে নেমে এখন ৭৮ থেকে ৭৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৭৪ ডলারে নেমে এসেছে। বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর চূড়ান্ত চুক্তি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমবে। প্রতিবছর বিপিসি প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। পরে সরবরাহ করা হয়। এজন্য গত বছর ব্যয় হয়েছে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি। এ বছর এই ব্যয় অনেক বাড়বে। বিপিসি জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণে সরকারের লোকসান হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।