ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩:১৭, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
.
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনবিরোধী কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। শুরুর দিকে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমেই বিভিন্ন দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, কোন্দল, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা বাড়ছে।
বিশেষ করে অনলাইন ও অফলাইন প্রচারণায় ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) তা রোধে অনেকটা অপারগ ভূমিকা পালন করছে। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পর্যবেক্ষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে গণভোট ও প্রাক্-নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক। পরে সার্বিক পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুটি ভোট সুচারুভাবে সম্পন্ন হবে যদি সবাই বিধিসম্মত আচরণ করেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের। তারা চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলা হলেও কোনো দলই সেটি করেনি।
একজন নারীকেও মনোনয়ন না দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এমনকি ক্রিয়াশীল সবচেয়ে বড় দলের প্রার্থীদের ২ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। নারী প্রার্থী মনোনয়নে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থ, ধর্ম, পেশি, পুরুষতন্ত্র ও গরিষ্ঠতন্ত্র এই পাঁচটি বিষয়কে বাংলাদেশে মৌলিক রাজনৈতিক পুঁজি বলে উলেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সংখ্যালঘু, নারীসহ সব পর্যায়ের ভোটারের নিরাপত্তার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর। তবে মূল দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়েও দুর্নীতি অব্যাহত আছে। এই সরকারে দুদকের সংস্কারের সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা ভবিষ্যতের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে শনিবার রাতে বাংলাদেশ টাইমস নামের একটি গণমাধ্যমের কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের তুলে নেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির প্রাক-নির্বাচনি সার্বিক পর্যবেক্ষণে সাতটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো- শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছে। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নির্বাচনি সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে। আগের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে। অনলাইন-অফলাইন প্রচারণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও কমিশন তার অনেকটা অপারগতার কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যর্থতা, অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়। নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে।
এছাড়া গণভোটের প্রচারণা সম্পর্কে টিআইবির পর্যবেক্ষণে ১১টি বিষয় উলেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের দোদুল্যমান ও উভয় পক্ষের সন্তুষ্টি প্রত্যাশী অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা গণভোটের বিষয় ও প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট এবং সংসদে উচ্চকক্ষবিষয়ক বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত যদি ওই সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় বিবেচনা করা হয়েও থাকে, তবু বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ধরনের গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয়ের সুযোগ নেওয়া হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি।
সরকারের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচার সম্পর্কে যে নির্দেশনা (হ্যাঁর পক্ষে প্রচারকে আইনসম্মত নয় বলা) নির্বাচন কমিশন দিয়েছিল, তা কতটুকু সুচিন্তিত, আইনসম্মত ও গঠনমূলক, এসব প্রশ্নের কারণে আরও অধিকতর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় নির্বাচন ও গণভোট সমার্থক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ২(৭) ধারা অনুযায়ী ‘নির্বাচন অর্থ এ আদেশের অধীন কোনো সদস্যের আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন।’ কোনোভাবেই গণভোটকে নির্বাচনের সমার্থক বিবেচনার সুযোগ নেই, গণভোটে ভোটার কোনো আসনে বা কোনো সদস্যের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেন না।