ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২৫ সফর ১৪৪৮

কাপ্তাই হ্রদে পর্যটনের নামে শব্দদূষণের উল্লাস,অভিযান চালাবে পুলিশ

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি

প্রকাশ: ২৩:০০, ৯ আগস্ট ২০২৬

কাপ্তাই হ্রদে পর্যটনের নামে শব্দদূষণের উল্লাস,অভিযান চালাবে পুলিশ

ছবি:বাংলার চোখ

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ। পাহাড়, জল আর সবুজের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা রাঙামাটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। বর্ষা মৌসুমে হ্রদের পানির বিস্তৃতি ও পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা আসছেন, ভিড় করছেন বোট, হাউজবোট ও বিভিন্ন পর্যটন স্পটে।

তবে পর্যটনের এই ব্যস্ততার আড়ালে নতুন করে সামনে এসেছে উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও শব্দদূষণের অভিযোগ। কাপ্তাই হ্রদে চলাচলকারী কিছু বোটে উচ্চস্বরে গান, বাদ্যযন্ত্র, নাচ-গান এবং নানা ধরনের উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন হ্রদের আশপাশের বসতবাড়ির বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে এ ধরনের উচ্চ শব্দের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে আপত্তি নেই। কিন্তু সেই আনন্দ যেন অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাপন, পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে;এটাই তাদের দাবি।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ হাবিব আজম বলেন, রাঙামাটিতে পর্যটকেরা আসবেন, আনন্দ করবেন; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে উচ্চস্বরে গান-বাজনা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে যেসব বসতঘর কাপ্তাই হ্রদের আশপাশে রয়েছে, উচ্চস্বরে গান-বাজনার কারণে সেসব পরিবারের শিশু ও শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ছে। বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদেরও দুর্ভোগ হচ্ছে। তাই গান-বাজনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে বসতবাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পর্যটকেরা আনন্দ করতে পারেন।

হাবিব আজম বলেন, কয়েক বছর আগেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা ও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বসতবাড়ির কাছাকাছি উচ্চস্বরে গান-বাজনা না করার নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের দাবি, আগের সেই নির্দেশনা কার্যকর করার পাশাপাশি প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হোক।

তিনি আরও বলেন, “আমরা অবশ্যই চাই পর্যটকেরা রাঙামাটিতে আসুক। তারা স্বাচ্ছন্দ্যে আনন্দ করুক। কিন্তু সেই আনন্দ যেন সাধারণ মানুষের জন্য কোনো ধরনের বেগ বা দুর্ভোগের কারণ না হয়; এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, কাপ্তাই রোড ও হ্রদের আশপাশে অনেক বসতবাড়ি রয়েছে। পর্যটকেরা দলবদ্ধ হয়ে গান-বাজনা ও আনন্দ করবেন! এটি পর্যটনকেন্দ্রে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেটি যখন মাত্রাতিরিক্ত শব্দে পরিণত হয়, তখন তা স্থানীয় মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে বাড়িতে থাকা শিশু, পরীক্ষার্থী, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীদের জন্য উচ্চ শব্দ ক্ষতিকর বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, পর্যটন বিকাশের স্বার্থে প্রশাসনকে যেমন পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব, পিপিএম। তিনি বলেন, শীতের মৌসুমের পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমেও রাঙামাটির বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও বিভিন্ন ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।

পুলিশ সুপার বলেন, “কাপ্তাই লেকে ভ্রমণের সময় কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক বিশেষ করে হাউজবোটে উচ্চস্বরে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের নাচ-গান করছে; এমন অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে জনদুর্ভোগ ও পাবলিক ডিসঅর্ডার সৃষ্টি হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।”

তিনি জানান, এসব অভিযোগের পর জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উচ্চস্বরে গান-বাজনা কিংবা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে এমন কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাপ্তাই হ্রদে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাঙামাটি ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমিতির সভাপতি রমজান হোসেন। তিনি বলেন, বোট মালিক সমিতির পক্ষ থেকে নিয়মিত সদস্যদের সতর্ক করা হয়। তবে কিছু বোট বেশি ভাড়ার আশায় উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে বলে তিনি জানান।

রমজান হোসেন বলেন, হ্রদের মাঝখানে নৌ ও ট্যুরিষ্ট পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কারণ বোটে নাচ-গান করতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো রাঙামাটির পর্যটন খাতের ওপর পড়বে।

তিনি বলেন, “পর্যটকদের দিয়ে আমাদের পেট চলে। তাই পর্যটকদের নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ দিতে হবে। তারা রাঙামাটিতে এসে ভালোভাবে ঘুরতে পারলে অন্যদেরও রাঙামাটিতে আসতে উৎসাহিত করবে। এতে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সবারই লাভ হবে।” বোট মালিক সমিতির সভাপতি আরও বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিবেশের প্রতিও যথাযথ সম্মান দেখানো হচ্ছে না। মসজিদের পাশ দিয়ে বোট চলাচলের সময় আজান চললেও কোথাও কোথাও বোটের সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, ব্যবসায়িক স্বার্থে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। পর্যটন ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

কাপ্তাই হ্রদে উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও পর্যটকদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রশাসনের নজরেও এসেছে। রোববার রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও বিষয়টি উত্থাপিত হয়। সভায় কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের নিরাপত্তা, উচ্চস্বরে গান-বাজনা, জনদুর্ভোগ এবং পর্যটনকেন্দ্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটন বিকাশের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। পর্যটকদের আনন্দের নামে যেন কোনোভাবেই স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হবে।

শুধু শব্দদূষণ নয়, বর্ষা মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বর্ষায় হ্রদের পানি বৃদ্ধি ও ঢেউয়ের কারণে নৌযান চলাচলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে বোট ও হাউজবোটে ভ্রমণকারী প্রত্যেক পর্যটকের জন্য লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ হাবিব আজম বলেন, কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি বোটে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট রাখা এবং পর্যটকদের তা ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে রাঙামাটির সম্ভাবনা বিপুল। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত শব্দদূষণ, বেপরোয়া আচরণ কিংবা নিরাপত্তার ঘাটতি পর্যটকদের জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে রাঙামাটির পর্যটন ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তাই স্থানীয়দের জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ, পর্যটকদের বিনোদনের অধিকার এবং নৌযাত্রার নিরাপত্তা; সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় রেখে কাপ্তাই হ্রদে নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

তাদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী দ্রুত অভিযান শুরু হবে এবং উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বোটে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারের বিষয়টিও কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে।

কাপ্তাই হ্রদ শুধু পর্যটনের কেন্দ্র নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদের আধার। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা এই হ্রদের মাছের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এ কারণে হ্রদের জলজ পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত শব্দের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলজ প্রাণীর আচরণ, বিচরণ ও প্রজনন পরিবেশের বিভিন্ন ধরনের শব্দ ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে প্রভাবিত হতে পারে। তাই মৎস্য প্রজনন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হ্রদে অপ্রয়োজনীয় উচ্চশব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

 

আরও পড়ুন