ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩:৫১, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি :সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দায়িত্ব ছাড়ার আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেড় যুগ পর দেশে একটি জাতীয় নির্বাচন এবং ব্যাপক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সর্বসম্মত জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠান হলো। এই নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ, দেশের সর্বত্র একটা ঈদের পরিবেশ ছিল যা আমাদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকলের প্রতি অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা পরাজিত হয়েছেন তাদেরকেও আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারাও মোট ভোটের অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারা এই জেনে আশ্বস্ত হবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে। আগামী দিন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে- এর মাধ্যমে আমাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে।
‘চব্বিশের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মানুষ এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের মুক্তি, আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদার দাবি উচ্চারণ করেছিল। সেই সময় দেশ একটি গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক সংকটে নিপতিত ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল, গণতন্ত্র হয়েছিল ধুলিস্যাৎ, ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। ঠিক সেই সংকটময় সময়ে আমাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল—একটি লক্ষ্য সামনে রেখে। বাংলাদেশকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য তিনটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো হলো সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন।’
তিনি বলেন, আমি ও আমার সহকর্মীরা—সবাই আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গেছি। কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকল। আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি।
‘আমরা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছি—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে। আর সর্বোপরি, আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা;
নতুন বাংলাদেশের জন্ম। এই অর্জনের পেছনে যাঁরা ছিলেন—জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে আসা প্রতিবাদকারী তরুণ-তরুণীরা। সেই সাহসী মানুষগুলো, শহীদ ও আহতরা—তাদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তাদের অভূতপূর্ব ত্যাগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব হতো না।
তিনি আরও বলেন, এই প্রক্রিয়া সফল করতে দেশের আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই সহযোগিতা করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ, নির্বাচন কমিশন, সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের সদস্যরা আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন। আপনাদের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রইল। আপনাদের ধৈর্য, পেশাদারিত্ব ও আস্থার ওপর ভর করেই এই পথচলা সম্ভব হয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দেড় বছর পর গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনের পর নতুন সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকাল। আগামীকাল মঙ্গলবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ।