ঢাকা, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

৫ শ্রাবণ ১৪৩৩, ০৪ সফর ১৪৪৮

অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে গণভোট হয়েছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২২:৩১, ১৯ জুলাই ২০২৬

অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে গণভোট হয়েছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়া গণভোটটি সাংবিধানিক ছিল না, বরং একটি অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে হয়েছিল। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া হঠাৎ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এর অধীনে একটি ছলচাতুরির গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। 

রোববার বিকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে গণঅধিকার পরিষদ আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফারুক হাসান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নাসির উদ্দিন প্রমুখ।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেই গণভোটটি সাংবিধানিক ছিল না, বরং একটি অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে হয়েছিল। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া হঠাৎ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এর অধীনে একটি ছলচাতুরির গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে চারটি প্রশ্নের বিপরীতে কেবল একটি ‘হ্যাঁ/না’ উত্তরের বিধান রাখা হয়।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর পক্ষে জনগণ আছে কি না—সে বিষয়ে কেবল একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নে গণভোট হওয়া উচিত ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কিছু কমিশনের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, কিছু অধ্যাদেশ দেখা গেছে যেখানে সুনির্দিষ্ট কাজ ছাড়া শুধু কিছু ব্যক্তির কর্মসংস্থানের জন্য কমিশন করা হয়েছিল। গুমের শিকার ভিকটিম বা তাদের পরিবার কোথায় প্রতিকার পাবে, তা স্পষ্ট ছিল না।

তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং দেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে আগামী সংসদ অধিবেশনে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ আনতে যাচ্ছে, যেখানে গুমের বিভিন্ন স্তর, সাজা এবং বিচারিক এখতিয়ার সুনির্দিষ্ট করা থাকবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের আইনকেও যুগোপযোগী করা হবে। তবে মানবাধিকার আইনের ক্ষেত্রে দেশের ধর্মীয়, সামাজিক মূল্যবোধ ও জাতীয় সংহতির বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনা করা হবে, যাতে এলজিবিটিকিউ-এর মতো সমাজ-স্বীকৃত নয় এমন বিষয় দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।

বক্তব্যের শুরুতে মব জাস্টিসের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মব কোনোদিন জাস্টিস হতে পারে না। এটি একটি অপকালচার। আইনের শাসন কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় এই মব কালচারের সৃষ্টি হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের হাত ধরেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতের অনেকেই এখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় বসে আছেন, যার কারণে সমাজে ইনজাস্টিস বা অবিচার হচ্ছে। 

বিগত প্রহসনের নির্বাচন এবং ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনে বিচার বিভাগের একাংশের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের শাসন বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে তাদের ৩১ দফার প্রথম দফায় সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অল্প কিছু বাদে বাকি সবগুলো বর্তমান সরকার আইনে পরিণত করেছে। তবে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংশোধনী প্রয়োজন।

সংবিধানকে একটি পরিবর্তনশীল দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানে ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোট ফিরে এসেছে। প্রস্তাবনা বা মৌলিক কিছু অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করতে হলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করতে হবে। এই গণভোট সেটি নয়।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়া  থেকে শুরু বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী আন্দোলন সংগ্রাম করেছে।  আন্দোলনের সময় আবু সাঈদসহ অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্টের বিজয় এসেছে। 

১৯ জুলাই সবচেয়ে বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন স্মরণ করে তিনি বলেন, যারা শুধু মন্ত্রী-উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জুলাইয়ের চেতনাকে ব্যবহার করছেন, তাদের পুরাতন বন্দোবস্তের আদলে আওয়ামী বন্ধু কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে। 

‘দায় ও দরদের রাজনীতি’ বা ‘নতুন বন্দোবস্ত’-এর মতো ভারী শব্দ ব্যবহারকারী বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এতো বাক্যবিশারদ হওয়া ভালো না। আপনাদের নতুন বন্দোবস্ত আসলে কী, তা দয়া করে জনগণের সামনে পরিষ্কার করুন।

বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, নিজেদের হীন স্বার্থে কখনো ‘৪৭-কে ব্যবহার করা, আবার ‘৭১-কে অস্বীকার করে ‘২৪-কে ব্যবহার করার রাজনীতি আর চলবে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে এবং স্বৈরাচারের ফেরার পথ বন্ধ করতে দেশের গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন