মহানন্দ অধিকারী মিন্টু, পাইকগাছা
প্রকাশ: ০১:৩২, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ফাইল ছবি
আসন্ন জাতীয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ (পাইকগাছা-কয়রা) নির্বাচনী এলাকায় শেষ সময়ের প্রচার-প্রচারনা জমে উঠেছে। বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশী অন্য দলের মনোনীত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থক প্রচার-প্রচারনায় ব্যাস্ত সময় পার করছেন। যদিও আসনটিতে সর্বশেষ বিএনপি ও জামায়াতের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রার্থী না থাকলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে মূল লাগাম টানতে আওয়ামী লীগের ভোটার, বিশেষ করে সনাতনী ভোটাররা ভূমিকা রাখবে।
ভাগ্য নির্ধারক হিসেবে ইসলামী আন্দোলনও রয়েছে সেই তালিকায়। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ৩৩১ জন; যাদের মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ১২ হাজার ৮৬৯ ও নারী দুই লাখ ১০ হাজার ৪৬১ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবার নেই সবচেয়ে বেশিবার এ আসনে জয়ী আওয়ামীলীগ। তবে দলটির বিপুলসংখ্যক সমর্থক আছেন এখানে, যাদের ভোটে নজর দিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। এই আসনে আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে দলটির প্রার্থী নেই। তাই এই ভোটাররা ভাসমান। এই ভাসমান ভোটই এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় ভাগ্য নির্ধারণ করবে বলে ধারণা। এ কারণে সেই ভোটের দিকে তাদের নজর বেশি। এ ছাড়াও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাপার প্রার্থী মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর(লাঙ্গল) বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী এ্যাড. প্রশান্ত কুমার মণ্ডল(কাস্তে) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আছাদুল্লাহ ফকির(হাতপাখা)। পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতের প্রার্থী মাও. আবুল কালাম আজাদ ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বাকি চারজনও নতুন। এলাকার সাধারণ মানুষের ভাষ্য, নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠনের পর এখান থেকে জামায়াতের প্রার্থীই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছেন। এবারই প্রথম আলাদা নির্বাচন করছে বিএনপি ও জামায়াত। অতীতের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ও জামায়াতের প্রভাব দেখা গেলেও এবার বিএনপির কর্মী-সমর্থক বেড়েছে। এ আসনের ১৭টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী-সমর্থক রয়েছে দলটির। শুরুর দিকে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিভেদ দেখা দেয়। তবে শেষ মুহূর্তে অন্য পক্ষের নেতারাও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। অপরদিকে, বিগত কয়েকটি নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপির ভোট জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে গেছে। এবার তা পুষিয়ে নিতে আওয়ামীলীগের ভোটে নজর দিয়েছে দলটি। এ আসনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আব্দুল মজিদ বলেন, আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর বিতর্কিত নেতাদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছে। আবার অনেকেই কারাগারে আছে। তবে দলীয় কর্মী-সমর্থকের বেশির ভাগই এলাকায় আছেন। এ আসনে আওয়ামীলীগের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমর্থক রয়েছে- এটা সব দলই স্বীকার করবে। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোট টানতে সব প্রার্থীর পক্ষেই চেষ্টা চলছে। জামায়াতে ইসলামীর পাইকগাছা উপজেলা শাখার আমীর মাও. সাইদুর রহমান বলেন, এর আগে প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। সে হিসেবে তাদের একটা বড় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছেন এ আসনে। এলাকার ভোটার হিসেবে তারাও ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। যে কারণে এবারের নির্বাচনে সেই ভোটের দিকে সব প্রার্থীরই নজর রয়েছে।
প্রথম দিকে জামায়াতের চাপে বিএনপি খনিকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। একক প্রার্থী নিয়ে জামায়াতে ইসলামী তখন ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও বিএনপি প্রায় অর্ধ ডজন সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে বাড়তি চাপে ছিল। এরপর দলীয় মনোনয়ন চুড়ান্ত ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ক্রমশ পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। বর্তমানে প্রচার-প্রচারনায় বিএনপি-জামায়াতের অবস্থান সমান সমান থাকলেও যে কারোর ভাগ্য নির্দ্ধারণে সহায়ক হতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটাররা। এতে খানিকটা হলেও প্রভাব ফেলতে পারে ইসলামী আন্দোলনের সমর্থকরাও। শেষ সময়ে জামায়াতের মোর্চা থেকে বেরিয়ে একক নির্বাচন করছে তারা। বরাবর আওয়ামী লীগ বিরোধী নির্বাচনে আসনটিতে কখনো আওয়ামী লীগ আবার কখনও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা বিজয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দি প্রার্থীদের তালিকায়ও অবস্থানটা একই। তবে এবারের চিত্রটাও ভিন্ন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পরে দলের কার্য্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর মূলত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থীরা আসনটি পুনরুদ্ধারে রীতিমত কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আসনটি বরাবরই তাদের অনুকুলে ছিল দাবি করে বলা হচ্ছে, এলাকার সর্বস্তরের মানুষ তাদের মনোনীত প্রার্থী মাও. আবুল কালাম আজাদকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করছে। অন্যদিকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘ দিন জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় শরীক দল আসনটি জামায়াতকে ছাড় দেওয়ায় প্রার্থী দিতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে প্রার্থী দিলেও মূলত আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করায় সাধারণ ভোটাররা জামায়াতের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে আওয়ামী এন্ট্রি ভোটাররা জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুসকেই ম্যান্ডেট দেয়। ঐ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জি,এ সবুর ১৬,৮৩৫ ভোট পান। আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ্যাড. শেখ মো: নূরুল হক ৬৬,০৩৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেও জামায়াতের প্রার্থী শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস ৪৯,০২৩ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দি ছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মঈন উদ্দিন সরকার ৬,৬০২ ভোট পেয়ে চতুর্থ অবস্থানে ছিলেন। ঐ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস ৫৮,৩৬৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দী আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ নূরুল হক ৫৭,৬৬৯ ভোট পান। এরপর আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে বিএনপির সাথে জামায়াতের জোট না থাকায় বিএনপিকে এগিয়ে রাখছেন কেউ কেউ। বিএনপির দাবি, সময়ের পরিক্রমায় আসনটিতে বিএনপির অবস্থান অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে শক্ত ও সংগঠিত। তাছাড়া আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাইরে থাকলেও তাদের ঘরানায় থাকা সনাতনীদের প্রায় ১ লক্ষ ভোট আসন্ন নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্দ্ধারণ করতে পারে। তৃণমূলের এসব ভোটাররা বুথমূখী হলে তাদের সমর্থন যে কারো বিজয়ের পথে টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে বিএনপিই এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন শেষ মূহুর্তে জামায়াতের জোট থেকে বেরিয়ে আসায় তাদের ভোটাররাও একটা ফ্যাক্ট বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন অফিসের তথ্যানুযায়ী, এ আসনটিতে ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৮টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যথাক্রমে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স.ম বাবর আলী, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে বিএনপির এ্যাড. শেখ রাজ্জাক আলী নির্বাচিত হন। এরপর সীমানা পরিবর্তনের পর ১৯৮৬ সালের ৭ মে নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোমিন উদ্দিন, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জহুরুল হক, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে আসনটি শূণ্য থাকে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ মো: নূরুল হক, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জামায়াতের শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ্যাড. সোহরাব আলী সানা নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারী বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যথাক্রমে প্রয়াত এ্যাড. শেখ মো: নূরল হক, আক্তারুজ্জামান বাবু ও সর্বশেষ মো: রশীদুজ্জামান নির্বাচিত হন।
জামায়াত নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, অবাধ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বিজয় নিশ্চিত। খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনটি পাইকগাছা উপজেলার ১০ টি, কয়রা উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পাইকগাছা পৌরসভা নিয়ে গঠিত। প্রায় ৪ লাখ ভোটার অধ্যুষিত এ আসনে আওয়ামী লীগ বিহীন আসন্ন নির্বাচনে তারাই এগিয়ে রয়েছেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী মোট ১২ টি নির্বাচনের সর্বশেষ ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাতে থাকা এ আসনটি পূণরুদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা করছে জামায়াত ইসলামী। অন্যদিকে তীব্র প্রতিদ্বন্দিতার মুখে নিজেদের অবস্থান ও সমর্থনের বিষয়টি জানান দিতে বিএনপিও মরিয়া। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচন থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ টি নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ৬ বার, জামায়াত ইসলামী ২ বার, জাতীয়পার্টি ১ বার, বিএনপি ১ বার, স্বতন্ত্র ১ বার নির্বাচিত হয়। তবে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদের গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে নতুন উদ্যমে বেড়ে ওঠা বিএনপি দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের উপর ঠিক কি ধরনের প্রভাব ফেলবে তার বহুলাংশে নির্ভর করছে আওয়ামী ভোটার বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ ইসলামী আন্দোলনের অধিপত্য ও অবস্থানের উপর।