ঢাকা, শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২২ সফর ১৪৪৮

সরকার কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নেয়ায় স্বৈরাচার শক্তি সাহস পাচ্ছে

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৩:০১, ৭ আগস্ট ২০২৬

সরকার কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নেয়ায় স্বৈরাচার শক্তি সাহস পাচ্ছে

ছবি :সংগৃহীত

সরকার কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নেয়ার ফলেই পতিত স্বৈরাচার শক্তি দিল্লিতে বসে প্রেস কনফারেন্স করার সাহস পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি।
 
তিনি গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে প্রেস কনফারেন্স করার সুযোগ পাওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বারবার স্বৈরাচার শক্তির প্রতিরোধে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার কথা বলেছি। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েই বাহবা নেয়ার চেষ্টা করছে। 

এটাকে বাগাড়ম্বর বা গলাবাজি আখ্যায়িত করে নাহিদ ইসলাম আরো বলেন, আপনি তো প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বড় বড় কথা বলছেন, কিন্তু কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এটাতো হওয়ার কথাই ছিল না। এটাতো হঠাৎ করে হয়নি, তারা তো ঘোষণা দিয়েই করেছে এবং ভারতীয় সরকার তাদের সহযোগিতা করছে। ভারতীয় হাইকমিশনকে ডেকে কঠোরভাবে এটার নিন্দা জানানো উচিত ছিল সরকারের। পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সরকার কি কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেবে সেটা জনগণের সামনে উন্মুক্ত করার দরকার ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয় নাই’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের সরকারদলীয় বন্ধুরা বারবার জাতীয় ঐক্যের কথা বলেন, ফ্যাসিবাদের প্রশ্নে তারা নাকি আছে, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে-সংস্কার প্রশ্নে তারা যেমন জুলাই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তেমনি বিচার ও পতিত স্বৈরাচার শক্তিকে ঠেকানোর প্রশ্নেও আসলে তারা আপসকামী। তারা আপসকামী হলে জনগণ বসে থাকবে না। ১১ দলীয় ঐক্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন, যারা সংস্কার ও বিচার চায়- আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরাচার শক্তিকে প্রতিরোধ করবো, বিচার নিশ্চিত করবো এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার কাজ করবো। 

তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি করে সরকার বৈধতা হারিয়েছে। কোনো ধরনের পরিবর্তন তারা করতে চায় না এবং জনগণের আস্থা তারা হারিয়েছে, ফলে সাংবিধানিক একটি সংকট তৈরি হয়েছে। আর সরকার যখন জনগণের আস্থা হারায় তখন তাদের টিকে থাকতে হয় ক্ষমতার দাপট এবং সন্ত্রাসের ওপর ভিত্তি করে। সেই চিত্র বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী সরকার যেভাবে করেছিল, এই সরকার সেটা শুরু করেছে ক্যাম্পাসগুলোর মাধ্যমে।

তিনি বলেন, নির্বাচিত ছাত্র সংসদ এবং ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি সহ ১১ দলের পক্ষে ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিচ্ছে না, তারা নির্বিচারে আক্রমণ করছে। তারা ক্যাম্পাসগুলো আবার সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করছে, দখলদারের চেষ্টা করছে। পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী আবারো দলীয়করণ হয়েছে, নিরপেক্ষ আচরণ করছে না। অর্থাৎ আমরা আগেই বলেছি, এই কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হবে না যদি গোড়ায় আমরা পরিবর্তন না করি। এই সরকারও স্বৈরাচারী হবে এবং তাদের মধ্যে সেই প্রবণতা আমরা দেখেছি। তারা একটা ব্যর্থ আওয়ামী লীগ হওয়ার চেষ্টা বিভিন্ন সময় করেছে, পারে নাই, জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। ‘৯৬ সালেও এটা হয়েছে। এখনো তারা যদি আবার চেষ্টা করে, তাহলে আবার জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়বে। ইনশাআল্লাহ আমরা সেটার জন্য ঐক্যবদ্ধ আছি এবং এই সরকারকে বলব- দ্রুত সময়ের মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই সব দাবি যদি তারা বাস্তবায়ন না করে, তাদের পক্ষে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।

প্রদর্শনী সম্পর্কে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আমরা তার আমন্ত্রণে এসেছি। আমাদেরকে স্বাগত জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেকটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সহ অন্য নেতারা।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখেছি। সত্যিকার অর্থেই জুলাই অভ্যুত্থান শেষ হয়নি। পুরো প্রদর্শনীতে সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পুরো বাংলাদেশের রাষ্ট্রকল্প, ১৯৪৭ সালের আজাদির লড়াই থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশ যে ঘাত-প্রতিঘাত, স্বৈরতন্ত্র, বাকশাল, ফ্যাসিবাদ- সবকিছুকে অতিক্রম করে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান জনগণকে নতুন মুক্তি এনে দিল, এই আলোকচিত্রের মাধ্যমে সেই জিনিসটাকে ফুটিয়ে উঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা এই চিত্র প্রদর্শনী থেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে অন্যতম আকাঙ্ক্ষা- রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণভোটে দেয়া ‘হ্যাঁ’ ভোট আমাদের থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হলো, কেড়ে নিল এই বর্তমান সরকার। কিন্তু জুলাইয়ের অঙ্গীকার হচ্ছে- সংবিধান সংস্কার করা, রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার করা, সেই লড়াইটা এখনো আসলে রয়ে গিয়েছে। এই চিত্র প্রদর্শনীর বার্তাটা হচ্ছে- জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আমরা যদি ধরে রাখতে চাই, তাহলে তার যে আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কারের সেই লড়াইটা এখনো চালিয়ে যাচ্ছি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তারা দুইটা ভোটে অংশগ্রহণ করেছে, কিন্তু একটা ভোটের ফলাফল তারা মানে নাই। গণভোটের গণরায়ের সঙ্গে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করছে, ফলে এবার সরকারিভাবে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উদযাপন হলো, সেটার কি পরিস্থিতি, তা সবাই দেখেছেন। ইতিহাস বিকৃতি থেকে শুরু করে দলীয়করণ এবং কোনো ধরনের সার্বজনীন বক্তব্য নাই, অন্তর্ভুক্তিমূলক যে বাংলাদেশ, জুলাই যে সবার সেই বার্তাটা তারা দিচ্ছে না, তারা সবকিছুকে দলীয়করণ করছে। স্থানীয় সরকার প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি যেরকম দলীয়করণ করছে, একইভাবে ইতিহাসকে তারা দলীয়করণ করার চেষ্টা করছে। যেভাবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণ করার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, আমরা সারা বাংলাদেশে ৫ আগস্ট দেখেছি বিভিন্ন জেলায় সরকারি প্রোগ্রামগুলোতে সরকারি দলের বাইরে সমন্বয়ক, জুলাইযোদ্ধা বা অন্য কোনো দলের-মতের লোকদের আমন্ত্রণ করা হলেও তাদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় হামলাও করা হয়েছে। এইভাবে যখন সরকার জুলাই গণভুত্থানকে উদযাপন করলো, আমরা বলি শুধু উদযাপনে নয়, এটা আসলে কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে। এই সুন্দর একটি আয়োজন, জাতির সামনে উপস্থাপন এবং আমাদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

এ সময় শুভেচ্ছা বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী অনেক মাহেন্দ্র মুহূর্তগুলো বাংলাদেশের মানুষ উদযাপন করেছিল। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার সরকারি ভবনে ৩৬ জুলাই এই চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। তার শিরোনাম হচ্ছে-আমাদেরকে পারতেই হবে অর্থাৎ জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার ধারাবাহিক সংগ্রামের যে জায়গায় আমরা এসেছি, কোনো ষড়যন্ত্র-কোনো চক্রান্ত, কোনো আধিপত্যবাদী চক্রান্ত যেন আমাদের এই অগ্রযাত্রা রুখতে না পারে, সামনের মঞ্জিল আমাদের অতিক্রম করতেই হবে। এই সংগ্রামে আমাদেরকে সামনে চলতে পারতেই হবে, এই প্রতিপাদ্যের উপরে আজকের এই প্রদর্শনী। তিনি জানান, গত বুধবার শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে অনেক জাতীয় নেতা এখানে এসেছেন। আজকে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত হয়েছেন।

এ সময় এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ ও ডা. মাহমুদা আলম মিতু, নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমীন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা‘ছুম, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, দক্ষিণের নায়েবে আমির ড. হেলাল উদ্দিন প্রমুখ।

আরও পড়ুন