ঢাকা, রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

৯ ফাল্গুন ১৪৩২, ০৪ রমজান ১৪৪৭

শেরপুরে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি

শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর

প্রকাশ: ২০:৩৭, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শেরপুরে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি

ছবি:বাংলার চোখ

শেরপুর জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিশাল অংশজুড়ে গারো পাহাড় অবস্থিত। যেখানে  গারো, কোচ, হাজং, হদি, বর্মণ, বানাই ও ডালু  ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ হাজার  মানুষের বসবাস। এসব গোষ্ঠীর মানুষের আছে আলাদা আলাদা ভাষা, আছে নিজস্ব সংস্কৃতিও। নিজ ভাষায় কথা বলাসহ সামনে এগোতে চান তারা। কিন্তু চর্চা আর সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্তির পথে তাদের মাতৃভাষা।

পরিবারের সুখ-দুঃখের গল্প মাতৃভাষায় করলেও এসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে হয় বাংলা ভাষার হাত ধরেই। তাই দিন দিন তাদের মাতৃভাষা হারিয়ে যাওয়ায় আক্ষেপ ফুটে উঠেছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিযোগ, তাদের ভাষার চর্চা না থাকায় এখন বাংলা ভাষার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের মাতৃভাষা। গারো ও কোচ ভাষা কোনোমতে টিকে থাকলেও অন্য ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব বর্ণপরিচয়, চর্চা ও লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা। কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার বই থাকলেও শিক্ষক না থাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বইগুলো পড়ানো যাচ্ছে না। ফলে শিকড় থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে এসব জাতিগোষ্ঠীর উত্তরসূরিরা। ২০১০ সালে আইন প্রণীত হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য নিজস্ব ভাষায় বই প্রকাশের। সে মোতাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের জন্য ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষায় বই প্রণয়ন করে। সেগুলো হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল ও সাদ্রি ভাষা। তবে এসব ভাষার বই পড়ানোর জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি বিদ্যালয়গুলোতে। ফলে বইগুলো শিশুদের কোনো কাজেই আসছে না।

শিক্ষার্থী সুব্রত বর্মণ বলেন, ‘ স্কুলে তো আমাদের ভাষায় পড়ায় না। খালি বাংলা ও ইংরেজি ভাষা পড়ায়। তাই আমরা আমাদের মায়ের ভাষা বলতেও পারি না, লিখতেও পারি না।’  প্রলয় হাজং বলেন, ‘আমাদের আগের লোকজনরা হাজং ভাষায় কথা বলতে পারলেও আমরা এখন পারি না। কারণ স্কুলে আমরা তো বাংলা ভাষা শিখে বড় হয়েছি। আমরা চাই সরকার স্কুলগুলোতে আমাদের ভাষায় শিক্ষাদান চালু করুক।’ সুকেন্দ্র চন্দ্র ডালু বলেন, ‘আমাদের ডালু গোষ্ঠী এখন হারিয়ে গেছে। আমরা কয়েকটা পরিবার আছি, আমাদের ভাষাও হারিয়ে গেছে। কেউ এখন ডালু ভাষা পারি না।’

ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আদিবাসী নেতা প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, ‘আমাদের ভাষার বই সরকার দিলেও তা পাঠদানের জন্য কোনো শিক্ষক দেয়নি। আমরা চাই আমাদের ভাষা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হোক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাই হলো, কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। ভাষা আন্দোলনের চেতনা তখনই সার্থক হবে, যখন প্রতিটি জনগোষ্ঠী তার নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবে, মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করতে পারবে, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম জানান, চলতি বছর গারো ভাষার কিছু বই এসেছে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অনেক কম। এছাড়া প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবও রয়েছে, যার কারণে এ মুহূর্তে মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তবে ১০-১২ জন শিক্ষক রয়েছে তাদের মধ্যে একজনকে মাস্টার ট্রেইনারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষক সংকট কাটানো হবে।

জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান জানান, শেরপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মানুষের সবাই যেন তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে এবং শিশুরা পড়াশোনা করতে পারে সেই বিষয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি ভাষায় বই রচনা করা হয়েছে। এগুলো খুব দ্রুত তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। তবে শিক্ষক স্বল্পতার একটা সমস্যা রয়েছে। তাদের ভাষার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা চলছে। এছাড়াও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সংস্কৃতি রক্ষায় কালচারাল একাডেমি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য কাজ করছি।

আরও পড়ুন