শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর
প্রকাশ: ০১:২১, ১৯ জুলাই ২০২৬
ছবি:বাংলার চোখ
শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারোপাহাড় জুড়ে হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার উদ্বিগ্ন পাহাড়ি জনপদের অধিবাসীরা। পাহাড় থেকে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসা বন্যহাতির আক্রমনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষেতের ফসল, ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ এমনকি প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আবার জানমাল রক্ষায় মানুষের হাতে যারা যাচ্ছে হাতিও। এমন বাস্তবতায় বন্যহাতি সুরক্ষায় হাতি-মানুষের মধ্যে চলমান দ্ব›দ্ব নিরসন এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করতে শেরপুরে নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা রেঞ্জের আওতাধীন বাতকুচি এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘যৌথ আলাপচারিতা’ নামে মতবিনিময় সভা।
এতে হাতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) প্রকৃতিপ্রেমী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
‘হাতি বাঁচলে, বাঁচবে গারোপাহাড়’ এমন শ্লোগানে শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব এবং নাগরিক প্ল্যাটফরম জনউদ্যোগ শেরপুর যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সার্বিক সহযোগিতা করেছে ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রণমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি), প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং টুগেদার ফর এডুকেশন এথলেটিক্স এন্ডমিশন (টিম)।
জনউদ্যোগ শেরপুর কমিটির আহŸায়কক শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কবি জ্যোতি পোদ্দার, সমন্বয়ক সাংবাদিক হাকিম বাবুল, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সংগঠক দেবদাস চন্দ বাবু, স্থানীয় ইউপি সদস্য আজহারুল ইসলাম, ইআরটি সদস্য মো. আসমত আলী, টিম সদস্য ইলিয়াস খান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মানুষের বাড়ি-ঘর, ফসল রক্ষার পাশাপাশি বন্যহাতিকে কিভাবে রক্ষা করা যায়, হাতি ও মানুষের দ্ব›দ্ব কীভাবে নিরসন করা যায়, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় নানাবিধ সমস্যা এবং সমাধানের কথা তুলে ধরা হয়।
সভায় হাতি উপদ্রæত বাতকুচি এলাকার মানুষ হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব এবং এনিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরেন।াক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় ইউপি সদস্য আনসার আলী বলেন, পাহাড়ে হাতির খাবার উপযোগী বাগান করতে হবে, তাদেও জন্য জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তারা মানুষের খাবারে হানা না দেয়। হাতিও বাচুক, মানুষও থাকুক গারো পাহাড়ে। হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব কমাতে হলে গারোপাহাড়ে বন্যহাতির অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। স্বেছাসেবক ইলিয়াস আলী জানান, হাতির তান্ডবে এই এলাকার কৃষকরা কৃষি কাজে আগ্রহ হারাচ্ছে। তাই বিকল্প কাজের ব্যাবস্থা করার জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানাই। ইআরটি টিমের পাশাপাশি ইলিফ্যান্ট রেসকিউ টিমও গঠন কতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আমির হোসেন বলেন, আমাদের এলাকাটি হাতির উপদ্রæত এলাকা। অনেক এলাকায় ইআরটি টিম থাকলেও আমাদের এখানে কোন ইআরটি টিম নেই। আমরা আমাদের এলাকায় একটি ইআরটি টিম চাই। হাতি তাড়ানোর জন্য উচ্চ ক্ষমতার টর্চলাইট এবং মশাল জ্বালানোর জন্য বিনামুল্যে কেরোসিন তেলের ব্যবস্থা করার দাবী জানাচ্ছি। ইআরটি সদস্য আজমত উল্লাহ বলেন, ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ভিউ ব্যবসায়ীরা এখন নতুন উৎপাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা বন্যহাতিকে নানাভাবে উত্যক্ত করছে। এতে হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব বাড়ছে। এসব ভিউ ব্যবসায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দমাতে তাদো বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা এবং প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ে অভিজ্ঞজনরা হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব নিরসন ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে করণীয় বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। এসময় তারা বলেন, পাহাড়ে হাতির বাস্তু সংস্থান ও খাবারের উপযোগী বৃক্ষের বাগান তৈরী করতে হবে। পানির আধার তৈরীর পদক্ষেপ নিতে হবে। লোকালয়ে বন্যহাতি আসা কমাতে হলে সীমান্ত জনপদে ধান সহ যেসব ফসল হাতির পছন্দের খাবার সেগুলোর আবাদ কমিয়ে মরিচ সহ হাতির অপছন্দের খাবার ফলানোর দিকে নজর দিতে হবে। মৌমাছি চাষ করে বিকল্প আয় কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। হাতির চলাচলের পথ ছেড়ে দিতে হবে, সেসব স্থানে ছোট ছোট পুকুর কিংবা পানি ধারনের ব্যবস্থা করতে হবে। হাতিকে উত্যক্ত না করে কিংবা বিদ্যুতে ফাঁদ পেতে হাতি হত্যা বন্ধ করে হাতির সাথে মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তবেই কমে আসবে হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব। বন্যহাতিকে কোনভাবেই উত্যক্ত করা যাবে না।
বনবিভাগের তথ্যমতে, শেরপুর জেলার পাহাড়ি জনপদে গত ১৬ বছরে (২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত) হাতি-মানুষের দ্ব›েদ্ব প্রাণ গেছে ৪৬ জন মানুষের। এছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কয়েক কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতি মারা গেছে ৩৪টি।
শেরপুর ওয়াইল্ডলাইফ বিভাগের রেঞ্জার মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন জানিয়েছেন, খাদ্য সংকটের কারণেই হাতি লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষ-হাতির দ্ব›দ্ব সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা সমাধানে পাহাড়ি বনাঞ্চলের প্রায় ৬ একর জমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী গাছ লাগানো হয়েছে। তিন বছর বয়সি এসব গাছ আরও দুই-তিন বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ খাদ্য হিসাবে উপযোগী হয়ে উঠবে। তখন হাতির খাদ্য সংকট অনেকটাই কমবে এবং তারা বনেই অবস্থান করবে।
হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব কমাতে বিভিন্ন এলাকায় এলিফেন্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন এবং সোলার ফেন্সিং ও বায়েফেন্সিং স্থাপন করা হয়েছে। শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী সম্প্রতি নালিতাবাড়ীর পাহাড়ি এলাকায় হাতির চলাচলের পথে ১৫টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। ক্যামেরাগুলো চালু হলে হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা প্রদান এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।