ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

২৬ ফাল্গুন ১৪৩২, ২১ রমজান ১৪৪৭

রক্তদহ বিল খননে মিলবে বাড়তি ১৭০ কোটি টাকার ফসল

সাইদুজ্জামান সাগর, রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯:৩৬, ১০ মার্চ ২০২৬

রক্তদহ বিল খননে মিলবে বাড়তি ১৭০ কোটি টাকার ফসল

ছবি:বাংলার চোখ

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা ও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সীমানার মধ্যে অবস্থিত ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল। ২২০ হেক্টর আয়তনের জমি নিয়ে গড়ে উঠা রক্তদহ বিল ঘিরে রয়েছে ২২ টি ইনলেট খাল, যার দৈর্ঘ্য ১৮৫ কিলোমিটার। আর আউটলেট খালের দৈর্ঘ্য ২২কিলোমিটার। বিলের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে একটি মাত্র ফসল উৎপাদন হয়। এর ফলে বছরে ২৩ টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার কৃষক পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রক্তদহ বিল খনন করা হলে ইরি-বোরো ও রোপা-আমন ধান চাষ আশপাশের প্রায় জমিতেই উৎপাদন সহজ হবে।  বছরে এই  দুটি ফসল পূর্ণ ভাবে উৎপাদন করা গেলে  প্রতিবছর ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের বাড়তি ফসল উঠবে কৃষকের ঘরে। তাই দ্রুত রক্তদহ বিলটি খননের দাবি জানিয়েছেন এলাকার কৃষকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রক্তদহ বিলের আশেপাশে রয়েছে ২৩ টি গ্রাম। এই গ্রামগুলোর মানুষ যুগ যুগ ধরে বিলকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু বিলটি পুনঃখনন না করার কারণে বছরের অধিকাংশ সময়ই জলাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকে। যার ফলে কমছে ফসলের উৎপাদন, কমছে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠা ছোট- বড় মাছের আধিক্য। জলাবদ্ধতার কারণে বিলের জমিগুলোতে শুধুমাত্র ইরি-বোরো ফসল উৎপাদন হচ্ছে। যদি বিলটি পুনঃখনন করা হয় তাহলে  বছরে অন্তত দুটি ফসল উৎপাদন সম্ভব। এতে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের আশা করছে স্থানীয় কৃষি দপ্তর ও বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার মান উন্নয়নে, স্থানীয় অর্থনৈতিক চাকাকে আরও গতিশীল করতে এবং আগামীর টেকসই ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার্থে ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল খনন করা খুবই জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশপ্রেমীরা।

রাণীনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রক্তদহ বিলের আউটলেট রতনডারা খালের উপর গড়ে তোলা হয়েছে ‘রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী’ এবং মৎস্য অভয়াশ্রম। এই পর্যটন এলাকায় প্রতিদিনই শত শত প্রাকৃতিপ্রেমী মানুষ ভীর করছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে পাখি পল্লীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাখি পল্লীর সঙ্গে রক্তদহ বিলের জলধারা উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটছে।

এব্যাপারে রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান বলেন, রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী’র সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যার অধিকাংশ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

উপজেলা সদরের সিম্বা গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন ফকির, মোস্তাক হোসেন, জয়েদ ফকির এবং খাগড়া গ্রামের আদুল হোসেন বলছেন, বিল এলাকায় আমাদের জমি আছে, কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত বিল খনন বা রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে আমরা যেমন প্রতিবছর  ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি তেমনি সরকারও লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।  বিলটি খনন করা হলে আমাদের বিলের জমিতে বছরে অন্তত দুইটি ফসল উৎপাদন করতে পারব। বিলটি খনন করা হলে দেশীয় প্রজাতির  মাছেরও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বিলের চারপাশের গ্রামের কৃষকরা ও মৎস্যজীবীদের জীবনচিত্র পাল্টে যাবে। দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে রক্তদহ বিলটি খনন করা জরুরি।

নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, রক্তদহ বিল ও এর আশেপাশের খাল পুনঃখনন করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হয়ে বছরে অন্তত দুইটি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। বিল এলাকার ফসলি জমিগুলো থেকে হেক্টর প্রতি ১২ মেট্রিকটন হিসাবে বছরে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার মেট্রিকটন ফসল উৎপাদিত হবে। যার বাজার মূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। খননকৃত বিল ও খালের মাটি দিয়ে ১০ ফুট চওড়া সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব এবং খাল ও বিলের পাড়ে নির্মিত রাস্তার ভাঙ্গন রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় রিটেইনিং ওয়াল, কংক্রিট ব্লক দ্বারা বাঁধাই, প্যালাসাইডিং নির্মাণ করা সম্ভব হবে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে। গ্রামীণ সড়ক, খাল ও বিলের পাড়ে ফলজ, বনজ এবং ঔষধি গাছ রোপন করা যাবে। বড় জলাধার ও বৃক্ষরোপনের কারণে পাখির নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে উঠবে।

এছাড়া সংরক্ষিত ভূপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস পাবে তেমনি ভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও বৃদ্ধি পাবে। দেশের জাতীয় সম্পদকে সঠিক ও টেকসই ভাবে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে রক্তদহ বিল পুনঃখননের জন্য ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।

  

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন