ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩:২০, ২৭ জুলাই ২০২৬
ছবি :সংগৃহীত
রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতরে লুকানো একটি তাজা আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) উদ্ধারের পর ঢাকা জুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে হামলা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনার ধারাবাহিকতায় এটি সর্বশেষ ঘটনা।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে একটি ছাতার ভেতর থেকে বিস্ফোরক ডিভাইসটি পাওয়া যায়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট গিয়ে সেটি নিষ্ক্রিয় করে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত করা হয়, এটি একটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি। বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ব্যাপকভাবে এ ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করে থাকে।
বিস্ফোরকটি কোথা থেকে এসেছে, কে বা কারা তা সেখানে রেখেছে এবং এর পেছনে কোনো উগ্রবাদী বা জঙ্গি নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে কি না, তা বের করতে তদন্ত চলছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স ডিভিশনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো অতীতে এ জাতীয় শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করেছে ।
তিনি বলেন, ‘রাজধানীতে এ ধরনের একটি বোমা উদ্ধারের ঘটনাকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। বোমার উৎস শনাক্ত করতে পুলিশের পাশাপাশি বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও মাঠে নেমেছে।’
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে উগ্রবাদী বা জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের তৎপরতা এবং অনলাইন কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে।
তারা জানান, সম্ভাব্য যেকোনো নাশকতা বা হামলার পরিকল্পনা আগেভাগে নস্যাৎ করে দিতে প্রথাগত গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি প্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিং আরও জোরদার করা হয়েছে।
আইইডি কী?
ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি’কে আধুনিক সন্ত্রাসবাদ এবং গেরিলা যুদ্ধে ব্যবহার করা সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্রগুলোর অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়।
২০০৩ সালের পর ইরাক যুদ্ধে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ব্যাপকভাবে আইইডি ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে আফগানিস্তান, সিরিয়া এবং পাকিস্তানের মতো যুদ্ধবিক্ষুব্ধ এলাকাগুলোতেও এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদা, তালেবান এবং আরও কয়েকটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে আইইডি ব্যবহার করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক যানবাহন এবং জনসমাগমকে লক্ষ্যবস্তু করে সাধারণত এ ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এগুলো আকারে ছোট, সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এবং তৈরি করতে তুলনামূলক কম খরচ হয়। তবে এর ধ্বংসক্ষমতা হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক। তাই বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আইইডি’কে মারাত্মক এক নিরাপত্তা হুমকি বলে মনে করে।
আগের বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর সুরাহা হয়নি
গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে ‘উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’য় একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে।
বিস্ফোরণের তীব্রতায় দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে যায়, ছাদ ও বিমে ফাটল ধরে এবং পাশের কক্ষগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমীন, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ চারজন আহত হন।
ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য, দাহ্য পদার্থ এবং বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
এর তিন দিন আগে, ২৪ ডিসেম্বর মগবাজারের নিউ ইস্কাটনে বোমার বিস্ফোরণে সিয়াম নামে একটি গাড়ির শোরুমের অফিস সহকারী নিহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সময় ফ্লাইওভার থেকে ছুঁড়ে মারা একটি শক্তিশালী বোমা তার মাথায় এসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
গত প্রায় দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিকবার বিস্ফোরক, ককটেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, নাশকতা চালানো, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা কিংবা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির মহড়া দেওয়ার লক্ষ্যেই হয়তো এসব সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছিল।
তবে পুলিশ এসব ঘটনার তদন্তের চূড়ান্ত কোনো তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদী ও জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে।
সে সময় কারাগার থেকে ৭০০ জনেরও বেশি জঙ্গির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে বিদেশি উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
গত বছরের জুলাইয়ে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে শামিন মাহফুজ ও মো. ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ জানায়, শামিন মাহফুজের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইন, অস্ত্র আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
তিনি অতীতে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা এবং পরবর্তীতে ‘জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকীয়্যা’র অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে অভিযুক্ত হন। তবে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তিনি নির্দোষ।
গত বছরের ২১ ডিসেম্বর আফগান তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম রাজনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক মোল্লা নূর আহমেদ নূর ওরফে মোল্লা জওয়ান্দি বাংলাদেশ সফর করেন।
প্রায় এক সপ্তাহের অবস্থানকালে তিনি ঢাকা ও অন্যান্য স্থানের বেশ কয়েকটি কওমি মাদ্রাসা পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, তার এই সফরের বিষয়ে পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রবেশের আগে তিনি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিলেন—এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, নতুন নতুন উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের গ্রেপ্তার, কালেমা খচিত পতাকা নিয়ে মহড়া এবং বারবার বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘নতুন উগ্রবাদী সংগঠনের কর্মীদের গ্রেপ্তার, কালেমা খচিত পতাকাসহ মহড়া এবং ঘন ঘন বোমা উদ্ধারের মতো ঘটনাগুলো আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংকেত দেয়।’
তিনি আরও বলেন, উগ্রবাদী সংগঠনগুলোকে প্রতিরোধ করতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।