ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪:০৩, ১১ জানুয়ারি ২০২৬
.
মাত্র এক মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলও বেশ চাঙা। কিন্তু গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দলের অনেক নেতাকর্মী। সবশেষ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির হত্যায় কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখালেও অন্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অনেকটা ‘নীরব’ দেখা গেছে দলের শীর্ষ নেতাদের, যা হতাশা বাড়াচ্ছে তৃণমূলে।
রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ২০২৫ সালে ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন বলে উঠে আসে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনে।
বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শুধু ডিসেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩ জন। তালিকায় রয়েছে ঢাকা, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ একাধিক জেলা।
গত ৩ জানুয়ারি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৯ জানুয়ারি জয়পুরহাটে যুবদল নেতা ইয়ানুল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরে এক বিএনপি নেতা কুপিয়ে হত্যার শিকার হন। ১৭ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীতে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক বিরু মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঠেকাতে কিছু অপশক্তি বাধা সৃষ্টি করতে চায়। তবে এ দেশের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে পরিশুদ্ধ—এসব অপকর্ম দিয়ে তাদের থামানো যাবে না।- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান
দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর এমন হামলা-হত্যার ঘটনা ঘটলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন আগের মতো দৃঢ় বা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না বলে অভিযোগ। শোক জানিয়ে অনেকটা দায় সারা হচ্ছে। হত্যার বিচার দাবিতে জোরালো কোনো আন্দোলন, সভা-সমাবেশ কিংবা মানববন্ধনও দেখা যায়নি। মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে কিছু প্রতিক্রিয়া, দলীয় কার্যালয়ের সামনে জানাজা হলেও সেখানে দলের শীর্ষ নেতাদের কাউকে অংশ নিতে দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরব হচ্ছে না, যাতে নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি নেতিবাচক না হয়। এই নীরবতা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুর রহমান মুসাব্বির এবং চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার হত্যাকাণ্ডের পর।
মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক না ব্যক্তিগত—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এমন ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাই তুলে ধরছে। নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।- রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন
গত ৭ জানুয়ারি, বুধবার রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় স্টার কাবাবের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন মুসাব্বির। অতীতের অনুরূপ ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সাধারণত এমন ঘটনায় বিএনপি বা সংশ্লিষ্ট অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ, বিবৃতি, সংবাদ সম্মেলন কিংবা রাজপথে কর্মসূচি ঘোষিত হতো। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পরের দিন বিকেলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি সংক্ষিপ্ত শোকবার্তা এবং ঢাকা মহানগরীতে সীমিত পরিসরের বিক্ষোভ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি।
জানাজায় নয়াপল্টনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির একমাত্র সিনিয়র নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল। সিনিয়র নেতাদের অনুপস্থিতিতে জানাজাস্থলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য ক্ষোভ দেখা যায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক ও নিন্দা জানিয়ে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পরও দুষ্কৃতকারীরা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। এই হত্যাকাণ্ড সেই অপতৎপরতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব ঘটনা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না।
সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মোরশেদ আলম। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি সালাহউদ্দিন আহমদ ও নিহত মুসাব্বিরের ছবি শেয়ার করে লেখেন, ‘প্রিয় নেতা, শ্রদ্ধার সঙ্গে জানাচ্ছি—আপনি যখন গুম হয়েছিলেন, তখন এই মুসাব্বিররাই রাইফেলের মুখে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল আপনার সন্ধান ও মুক্তির জন্য।’
মোরশেদ আলম বলেন, ‘সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে আমরা কিছুটা আশাহত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। তার প্রথমেই সরাসরি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা উচিত ছিল।’
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় নেতাকর্মীরা আক্রান্ত হলেও দলের জোরালো প্রতিবাদ হচ্ছে না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে মোরশেদ বলেন, ‘দল আগে আন্দোলনমুখী ছিল। যে কারণে কোনো একটা ইস্যু হলে সেটাকে ব্যাপকভাবে তোলপাড়ের চেষ্টা হতো। এখন দল নির্বাচনমুখী, তাই সেভাবে হচ্ছে না। সেভাবে আন্দোলনও গড়ে উঠছে না।’
এ ধরনের নীরবতা শুধু ঢাকা নয়, অন্য এলাকায়ও প্রশ্ন তুলছে। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা জানে আলম শিকদার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি।