আলমগীর মানিক, রাঙামাটি
প্রকাশ: ২২:৪৯, ২ নভেম্বর ২০২৬
প্রতীকী ছবি
পাহাড় মানেই বৈচিত্র্য। পাহাড় মানেই নৈসর্গিক সৌন্দর্য, বহুজাতিক সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন জীবনধারা এবং সম্প্রীতির এক অপার সম্ভাবনা। বাংলাদেশের মানচিত্রের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা; রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এই অঞ্চল শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু পাহাড়ের এই সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে সংঘাত, অবিশ্বাস, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাতের ইতিহাস। পাহাড়ের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সশস্ত্র তৎপরতা এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা; বিভিন্ন বাস্তবতায় নিরাপত্তা বাহিনীকেও প্রতিনিয়ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
দশকের পর দশক ধরে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি, রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনের উদ্যোগ, নিরাপত্তা কৌশল এবং গণমাধ্যমে নানা বক্তব্য এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত আয়োজনের পরও পাহাড়ের সাধারণ মানুষ কেন এখনো নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও স্বাভাবিক সহাবস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না?
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এর পাশাপাশি এমন একটি সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে, যেখানে জাতিগত পরিচয়ের আগে মানুষের পরিচয় হবে মানুষ হিসেবে। আর সেই জায়গায় খেলাধুলা ও সংস্কৃতির চেয়ে শক্তিশালী সেতুবন্ধন খুব কমই আছে।
একজন খেলোয়াড় যখন মাঠে নামেন, তখন তাঁর কাছে প্রতিপক্ষের জাতিগত পরিচয় মুখ্য থাকে না। তাঁর লক্ষ্য থাকে নিজের দক্ষতা, দল এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। একজন সংস্কৃতিকর্মী যখন নিজের জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন, তখন তিনি শুধু নিজের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না; প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকেও।
পাহাড়ের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনবোধ। এসব বৈচিত্র্যকে বিভাজনের উপাদান না বানিয়ে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সম্পদে পরিণত করা গেলে পাহাড় হতে পারত অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে।
অতীতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের একটি বড় অংশ উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে দলীয় প্রভাব, প্রকল্পকেন্দ্রিক স্বার্থ ও ব্যক্তিগত সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে! এমন অভিযোগ পাহাড়ের বিভিন্ন মহলে রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনেও।
বর্তমান সরকারের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের উদ্যোগ ‘নতুন কুঁড়ি’ পাহাড়ের শিশু-কিশোরদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারত। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবান শিশুদের খুঁজে বের করে তাদের প্রশিক্ষণ, পরিচর্যা এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ তৈরি করাই এমন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
কিন্তু রাঙামাটিতে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের নতুন কুঁড়ি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছেন না। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও রয়েছে। বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমলে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশের নিষ্ক্রিয়তা এবং নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে উদাসীনতার কারণে কার্যক্রমটি প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, রাঙামাটির ফুটবল অঙ্গনে অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায়ের খেলোয়াড় বাছাই নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। খেলোয়াড়দের অভিযোগ, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বশীল পর্যায়ের একজন নেতার নেতৃত্বাধীন ক্লাব এবং তাঁর নিজস্ব সম্প্রদায়ের খেলোয়াড়দের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
এসবের পাশাপাশি খেলোয়াড় বাছাইয়ে যোগ্যতা ও পারফরম্যান্সের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পরিচয়, গোষ্ঠীগত প্রভাব এবং স্বজনপ্রীতি গুরুত্ব পাচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট্য বঞ্চিতরা অভিযোগ তুলেছেন।
অবশ্যই এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর অভিযোগ অসত্য হলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করে বিভ্রান্তি দূর করতে হবে। কারণ ক্রীড়াঙ্গনে বৈষম্যের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনকও বটে।
এখানেই বিষয়টি শুধু খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি হয়ে উঠছে সামাজিক নিরাপত্তা, কিশোর-তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং পাহাড়ে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।
পার্বত্যাঞ্চলে বর্তমানে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে, মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু শুধু অভিযান চালিয়ে একটি প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিকল্প সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং প্রতিভা বিকাশের পরিবেশ।
যে কিশোরটির হাতে ফুটবল থাকার কথা, সে যদি বৈষম্য ও অবহেলার কারণে মাঠে জায়গা না পায়, যে শিশুটির সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকশিত হওয়ার কথা, সে যদি সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়! তাহলে তার দায় কে নেবে?
একটি শিশুকে মাঠ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার অর্থ শুধু একজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হারানো নয়; বরং তাকে সুস্থ সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, পাহাড়ের যে জায়গাটি জাতিগত বিভাজন ভুলে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করাতে পারত, সেই ক্রীড়াঙ্গনেই যদি জাতিগত পরিচয়, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত বলয়ের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সম্প্রীতির বার্তা যাবে কোথায়?
খেলোয়াড় বাছাইয়ে যদি যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে ওঠে, তাহলে প্রতিভাবান শিশুরা একসময় খেলাধুলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আর এই হতাশা শুধু একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের ক্ষতি।
পাহাড়ের ক্রীড়াঙ্গন কোনো একটি জাতিগোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি নয়! এটি পাহাড়ের সব মানুষের। এখানে বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখোয়া, লুসাইসহ সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিভাবান শিশু-কিশোরের সমান অধিকার থাকতে হবে। কারও পরিচয় নয়, মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও পারফরম্যান্স।
রাঙামাটির ক্রীড়াঙ্গনকে বিতর্কমুক্ত করতে হলে প্রথমেই নতুন কুঁড়ি কার্যক্রমের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রম কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, কোথায় বাধা রয়েছে, কারা দায়িত্ব পালন করছেন না; তা খতিয়ে দেখতে হবে।
অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলসহ সব পর্যায়ের খেলোয়াড় বাছাইয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা, উন্মুক্ত ট্রায়াল, নিরপেক্ষ নির্বাচকমণ্ডলী এবং প্রকাশ্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। শহর ও প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিভাবান শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। জেলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে পাহাড়ের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও প্রতিভাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে হবে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিকে কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, পাহাড়ের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে; শুধু উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, বরাদ্দ ও অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না। তাদের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সুস্থ বিনোদন এবং বৈষম্যহীন সুযোগ।
দশকের পর দশক পাহাড়ে শান্তির কথা বলা হয়েছে। সম্প্রীতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক মাধ্যম খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে যদি আমরা দলীয় প্রভাব, গোষ্ঠীগত আধিপত্য, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বজনপ্রীতির হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছি? পাহাড়ের নেতৃত্বদের কাছে এখন এমন প্রশ্নই করা যায়??
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব নয়, শুধু সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয়ও নয়। এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রজন্মগত দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, পাহাড়ে প্রতিটি শিশুর হাতে অস্ত্রের পরিবর্তে ফুটবল তুলে দেওয়া, প্রতিটি তরুণের সামনে মাদকের পরিবর্তে খেলার মাঠ খুলে দেওয়া এবং প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করাই হতে পারে স্থায়ী সম্প্রীতির অন্যতম ভিত্তি।
এখন সময় এসেছে; পাহাড়ের ক্রীড়াঙ্গনকে বলয়মুক্ত, বৈষম্যহীন ও প্রতিভাবান প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত করার। অন্যথায় শান্তির কথা বলা হবে মঞ্চে, আর বৈষম্যের শিকার হয়ে হারিয়ে যাবে মাঠের আগামী দিনের সম্ভাবনাগুলো।
পাহাড়ের মাঠ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রতিভার ওপর কারও একচেটিয়া অধিকার নেই। যোগ্যতা যেখানে উপেক্ষিত, সেখানে সম্প্রীতির স্লোগানও অর্থহীন !!