ঢাকা, শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬

২৬ পৌষ ১৪৩২, ২১ রজব ১৪৪৭

মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য  

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৭:৩২, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য  

ফাইল ছবি

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। এরই মধ্যে দুই শুটারকে গোয়েন্দা নজরদারিতে আনা হয়েছে।

বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে অজ্ঞাতনামা অস্ত্রধারী একাধিক যুবক মুছাব্বিরকে কাছ থেকে গুলি করে। ওই সময় তার সঙ্গে থাকা আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়। রাতেই মুছাব্বির মারা যান। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনের নামে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন।

 এদিকে, মুছাব্বির হত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, মুছাব্বির হত্যার ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার। ঘটনাটি ঘটিয়েছে রহমান। তাকে পাচ্ছি না। তাকে পেলেই সব বেরিয়ে যাবে। রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে কাওরান বাজারে চাঁদাবাজি করে।

বৃহস্পতিবার রাতে মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বলেন, আমার স্বামী রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক কোনো সমস্যার কথা আমাদের বলতেন না। তবে প্রায়শই তার প্রাণনাশের হুমকির কথা জানাতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার তো অনেক বেশি শত্রু হয়ে গেছে, হয় তো যে কোনো সময় আমাকে মেরে ফেলবে।’ এ ঘটনায় আমরা কাউকে সন্দেহ করছি না।

পুলিশের তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে মুছাব্বিরের রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি ও দখল নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়। এছাড়া মুছাব্বির হত্যার ঘটনার পেছনে কাওরান বাজারে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনার যোগসূত্রও খুঁজছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তেজগাঁওয়ের তেজতুরি বাজার এলাকায় (স্টার কাবাবের গলি) মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার পরই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ। এরপর বুধবার রাত সাড়ে ১১টায় কাওরান বাজারে সবজি ব্যবসায়ী মো. ফারুক হোসেনকে হেফাজতে নেয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল। তিনি মহানগর যুবদল ২৬নং ওয়ার্ডের সহসভাপতি। রাত দেড়টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে মো. আব্দুল মজিদ মিলনকে হেফাজতে নেয় ডিবি। তিনি ২৬নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। অন্যদিকে মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা তেজগাঁও থানা পুলিশ তিনজনকে হেফাজতে নেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হেফাজতে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, মুছাব্বিরের স্ত্রী মামলা করতে এসে আমাদের বলেছেন বেশ কিছুদিন ধরেই তার স্বামী জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন। তবে এই ঘটনায় কোনো জিডি বা মামলা করেননি তারা। আমরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা দুজনকে গ্রেফতারে কাজ করছি। ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ বুলেটের তিনটি খোসা উদ্ধার করেছি। এছাড়া কাওরান বাজারে চাঁদাবাজি, ফার্মগেটে গ্যারেজ দখল ও রাজনৈতিক কারণগুলো সামনে রেখে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগ আমলে বহুবার কারাবরণ করেন, এমনকি গুমের শিকারও হন। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরই কাওরান বাজারের চাঁদা নিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির শীর্ষ এক নেতাসহ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় মুছাব্বিরের। বিরোধ তৈরি হয় যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা আবদুর রহমানের সঙ্গেও। হত্যায় তার জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

মুছাব্বির দলীয় নির্দেশনায় ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির জোটের প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে সমর্থন করেছিলেন বলেও জানান তার স্ত্রী। এটি নিয়েও বিরোধ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত বছর ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ ১১ জনকে গ্রেফতার করে। হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার অভিযোগে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের এলাকায় আধিপত্য কমে গেলে মুছাব্বির সেই জায়গা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় বেশ উত্তেজনা চলছিল। এছাড়াও ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখল নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলে আসছিল। এই গ্যারেজ দখল ঘটনায় মুছাব্বিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পারে পুলিশ। যদিও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরও ছিলেন তিনি। সবকিছু মিলিয়ে মুছাব্বিরের জীবননাশের হুমকির অভিযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি হত্যার পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হত্যাকারীরা ঘটনার আগেই ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। হত্যার পর দুজন সামনের মূল সড়ক ধরে পালিয়ে যায়। পেছনের গলিতে ঢুকে পড়ে আরও দুজন। হঠাৎ এমন ঘটনায় সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সিসিটিভি ফুটেজে হত্যার পর দুই দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালাতে দেখা গেছে।

এদিকে ডিবির হাতে আটকের আগে আব্দুল মজিদ মিলন জানিয়েছেন, হত্যার আগে তারা এক সঙ্গেই ছিলেন। ওই দিন বিকালে তাদের কাছে অপরিচিত এক লোককে দেখেন, যার ছবিও তুলেছিলেন তিনি। মিলন বলেন, মুছাব্বির ভাইয়ের পরিচিত এক বিএনপি নেতাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য আমি ও আরেকজন ওয়াসা ভবনের সামনে যাই। তখন মুছাব্বির ভাই ও মাসুদ স্টার হোটেল থেকে আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির সামনে দিয়ে তেজতুরি বাজারে যাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মাসুদ আমাকে ফোন করে জানায় যে, তাদের দুজনকে গুলি করা হয়েছে এবং দ্রুত সাহায্য করতে বলে।

বুধবার রাতে ৮টা ২০ মিনিটে তেজগাঁওয়ের স্টার কাবাবের পেছনে তেজতুরি বাজার এলাকার আহছানউল্লা ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (এআইটিভিইটি) পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে গুলি করা হয় মুছাব্বির ও সুফিয়ান বেপারি ওরফে মাসুদকে। ঘটনাস্থলেই মুছাব্বির মারা গেলেও ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে সুফিয়ান। তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বুধবার রাতে কাওরান বাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন মুছাব্বির। আড্ডা শেষে ৮টা ১০ মিনিটে মাসুদকে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। তারা ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরি বাজারে আহছানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনের পাকা রাস্তায় পৌঁছালে ওতপেতে থাকা অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। তাতে মুছাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। রক্তাক্ত জখম নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে সুফিয়ান বেপারি মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও পেটের বাঁ-পাশে গুলি করে হামলাকারীরা।

মাসুদও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাদের মৃত ভেবে গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসকরা মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করার পর লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। আর মাসুদকে বিআরবি হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসকরা জানান।

উৎস: যুগান্তর

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন