ঢাকা, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২৮ মাঘ ১৪৩২, ২২ শা'বান ১৪৪৭

ক্ষমতার দাপটে ধর্ষণ-ভিডিও চক্র! দিদার ২ দিনের রিমান্ডে

আলমগীর মানিক,রাঙামাটি

প্রকাশ: ২৩:৪৬, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ক্ষমতার দাপটে ধর্ষণ-ভিডিও চক্র! দিদার ২ দিনের রিমান্ডে

ফাইল ছবি

রাঙামাটিতে চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ, পর্নোগ্রাফি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সদর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক দিদার আলমকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার রাঙামাটির সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিমু সরকার রিমান্ড শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাঙামাটি জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর সিনিয়র আইনজীবি অ্যাডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু ও রাষ্ট্রপক্ষের সাথে ভিকটিমের হয়ে অংশ নেয়া অপর আইনজীবি অ্যাডভোকেট হারুন অর রশিদ।

এরআগে রাঙামাটি সদর উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিদর্শক দিদার আলমের বিরুদ্ধে জনৈক মাঠকর্মী তাকে একাধিকবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং সে দৃশ্য ভিডিও করার পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে চলতি বছরের ২৭শে জানুয়ারী রাঙামাটি কোতয়ালী থানা মামলা দায়ের করেন ভিকটিম। যার মামলা নং-১৪।

মামলার তদন্তকারি অফিসার এস আই শম্পা হাজারি প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ভিকটিমের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর নারী শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৯(১) তৎসহ পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ এর ৮(১)৮(২)৮(৩) ধারায় মামলা দায়েরের পরপরই অভিযান পরিচালনা করে আসামীকে গ্রেফতার করা হয়। উক্ত আসামীর বিরুদ্ধে আদালতে ৫দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হলে মঙ্গলবার আদালত আসামীকে দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এদিকে, রাঙামাটি সদর উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিদর্শক দিদার আলম গ্রেফতার পরবর্তী তার বিরুদ্ধে একাধিক নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্কের পাশাপাশি তার অধীনস্থ সহকর্মী পাহাড়ি-বাঙ্গালী অন্তত চারজন নারী প্রতিবেদকের বাসায় উপস্থিত হয়ে জানিয়েছেন তাদের সাথেও দিদার অত্যন্ত বাজে অশালীন আচরণ করতো।

বয়স্ক এক চাকমা নারী জানিয়েছেন, দিদার আলমের কু-কুর্ম এবং তার অসামাজিক কর্মকান্ড তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন এবং তার বাসায় অধীনস্থ নারী সহকর্মীকে নিয়ে গিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত বসিয়ে রেখে যৌন হেনস্থা করতো সদর উপজেলার পরিদর্শক দিদার আলম দিদার। দিদারের এহেন আচরনে বাধ্য হয়ে নিজের সভ্রম বাঁচাতে চাকুরির আরো অন্তত দেড় বছর সময় থাকা সত্বেও উক্ত চাকমা নারী চাকুরি থেকে পিআরএল এ চলে গেছেন।

অপর এক পাহাড়ি সহকর্মী জানিয়েছেন, আমি লোন নিয়েছি তাই চাকুরি থেকে সরতে পারছিনা। দিদার উক্ত পাহাড়ি মাঠকর্মীকে প্রতিনিয়তই অবৈধ সম্পর্কের প্রস্তাব দিতো এতে রাজি না হওয়ায় তাকে কর্মস্থলে চরম হয়রানী করতো বলেও প্রতিবেদককে জানিয়েছেন তিনি। দিদারের মানসিক অত্যাচারে সদর থেকে সরে কুতুকছড়িতে গিয়ে দায়িত্বপালন করছে আরো এক চাকমা নারী মাঠকর্মী। উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে দিদারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দিলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা-ই নেওয়া হয়নি।

দিদারের সাথে তার সহকর্মীদের নানান সময়ে ঝামেলা হতো বলে প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে দায়িত্বপালনকারি একজন নারী চিকিৎসক।

অভিযোগকারিরা প্রতিবেদককে জানান, মূলত ছাত্রলীগের রাজনীতি করে উঠে আসা দিদার আলম বিগত পতিত সরকারের সাধারণ সম্পাদককে ব্ল্যাক মেইল করে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের চাকুরি ভাগিয়ে নেয়। এরপর থেকেই চাকুরি করা অবস্থায় তিনি কাঠের ব্যবসা থেকে শুরু করে ঋনের কিস্তি দিতেন অভাবী নারীদের।

তার অধীনে কাজ করা নারী সহকর্মীদেরকে মধ্যে যাকেই পছন্দ হতো তাকে তিনি মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন জনের বাসায় ডেকে নিয়ে যেতেন অফিসের কাজের কথা বলে। এরপর সেই সহকর্মীকে তিনি কুপ্রস্তাব দিয়ে রাজী না হলে ধারালো কিরিচসহ কুৎসিৎ ভাষায় হুমকি দিতেন।

এদিকে রাঙামাটি শহরের ওমদা হিলের এক কাঠ ব্যবসায়ি জানিয়েছেন, দিদারের সাথে তার খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো; তারই আলোকে দিদার উক্ত ব্যবসায়ির স্ত্রীকে কুপ্রস্তাব দেয়। বিষয়টি নিয়ে বাধা দিলে দিদার উক্ত ব্যবসায়ির উপর হামলা চালালে তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন প্রতিবেদককে। পরবর্তীতে এক বিএনপি নেতার অনুরোধে তিনি তার অভিযোগটি তুলে নিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন।
 
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, দিদারের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে এক প্রবাসীর স্ত্রী উক্ত প্রবাসীকে ডিভোর্স দিয়েছে। উক্ত প্রবাসি প্রতিবেদককে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন আমি আল্লাহকে বিচার দিয়েছি। দিদার অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং আওয়ামীলীগের এক প্রভাবশালী নেতার প্রভাবে আমাদের এলাকাসহ তার নিজ অফিসের সকলের উপর মাতব্বরি করে আসছে। সে যে কিরকম খারাপ প্রকৃতির লোক সেটি ভাষায় বর্ণনা করা যাবেনা।

আমার তিনটি কন্যা সন্তান ও একটি মাত্র ছেলে নিয়ে সুখের সংসারটি ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে দিদার। এদিকে,গ্রেফতার হওয়ার পরেও দিদারের পক্ষের লোকজনের দ্বারা প্রতিনিয়ত হুমকির শিকার হচ্ছেন জানিয়ে কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগি এক নারী সহকর্মী।

তিনি উল্লেখ করেন, দিদার আলম; পিতা: মৃত: আব্দুর রহমান. মাতা: খোদেজা বেগম; স্থায়ী ঠিকানা; ধনমিয়া পাহাড়, রহমান সওদাগরের বাড়ি; ৪নং ওয়ার্ড; রাঙামাটি পৌরসভা। এলাকার বাসিন্দা এবং তিনি রাঙামাটি সদর উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।

ভিকটিম উল্লেখ করেন উক্ত দিদার আলম ভিকটিমকে ব্ল্যাকমেইল করে একাধিকবার ধর্ষণ, ভিডিও করে সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং ভিকটিমের স্বামী-সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কর্মস্থলকে নিরাপদ করতে তিনি উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
 
এদিকে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সোহাগময় চাকমা জানিয়েছেন, আমরা ইতিমধ্যেই বিষয়টি অবহিত হয়েছি এবং জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও আমাদেরকে লিখিত আকারে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা দিদারের বিরুদ্ধে অফিসিয়ালি ব্যবস্থা চলমান রেখেছি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন