আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩:০৭, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি :সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের গাজার বন্দর শহর এবং আশপাশের এলাকায় ইসরাইলের রহস্যময় অস্ত্রের হামলায় হাজারো ফিলিস্তিনির দেহ ‘উধাও’ হয়ে গেছে। আল জাজিরা আরবির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ১০ আগস্ট আল-তাবিন স্কুলে হামলার পর ইয়াসমিন মাহানি তার ছেলে সাদকে খুঁজে পাননি। তিনি বলেন, ‘দাফনের জন্য দেহাবশেষও পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল ও মর্গ ঘুরেও কিছুই মেলেনি। এটাই সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।’
মাহানি আল জাজিরা আরবিকে বলেন, ‘আমি মসজিদে ঢুকতে গিয়ে দেখি আমি রক্ত আর মাংসের উপর দিয়ে হাঁটছি।’ তিনি কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজেছেন। মাহানি জানান, ‘আমরা সাদকে কিছুই পাইনি। এমনকি দাফনের জন্য কোনো দেহও মেলেনি। এটাই সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।’
মাহানি এমন হাজার হাজার ফিলিস্তিনির একজন, যাদের প্রিয়জন ইসরাইলের গাজার ওপর গণহত্যার যুদ্ধের সময় ‘উধাও’ হয়ে গেছে। যেখানে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় দুই লাখ গুরুতর হয়েছেন।
‘দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনি সম্পূর্ণভাবে নিখোঁজ রয়েছে, তাদের দেহের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি—শুধু রক্তের ছিটা বা সামান্য দেহাংশ ছাড়া।
বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনাগুলোর জন্য ইসরাইলের আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ থার্মাল ও থার্মোবারিক অস্ত্রের ব্যবহারকে দায়ী করেছেন, যা প্রায়শই ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল বোমা নামে পরিচিত, যা সাড়ে তিন হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৬ হাজার ৩৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রা তৈরি করতে সক্ষম।
নিখোঁজদের হিসাব কীভাবে করা হলো
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, তারা প্রতিটি হামলার স্থানে ঘরবাড়িতে থাকা মানুষের সংখ্যা এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহ মিলিয়ে যাচাই করে। যদি পাঁচজন থাকার কথা থাকে এবং তিনটি দেহ পাওয়া যায়, বাকি দুজনকে ‘নিশ্চিহ্ন’ বা ‘উধাও’ হিসেবে ধরা হয়।
অস্ত্রের প্রভাব ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েল থার্মোবারিক ও থার্মাল অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণে ৩,০০০–৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ তৈরি করে। মানবদেহের প্রায় ৮০ শতাংশ পানি মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পে পরিণত হয়, টিস্যু ছাই হয়ে যায়। এই ধরনের অস্ত্রকে ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল বোমাও বলা হয়।
ব্যবহৃত বোমা
এমকে-৮৪ ‘হ্যামার: ৯০০ কেজি ওজনের বোমা, তাপ ৩,৫০০°C পর্যন্ত পৌঁছায়।
বিএলইউ-১০৯ বাংকার-বাস্টার: মাটি বা সুরক্ষিত স্থানে ঢুকে বিস্ফোরণ ঘটায়। আল-মাওয়াসিতে হামলায় ২২ জন উধাও হন।
জিবিইউ-৩৯: স্কুলে ব্যবহৃত প্রিসিশন বোমা, ভবন অক্ষত রেখে ভেতরের সবকিছু ধ্বংস করে।
আইনি ও আন্তর্জাতিক প্রশ্ন
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্ত্র নির্বিচারভাবে মানুষ হত্যা করে এবং আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলিও দায়ের অংশীদার।
আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা
যুদ্ধ চলাকালীন আন্তর্জাতিক আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরাইলের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দিয়েছে। তবুও হামলা, অবরোধ ও ক্ষুধা চালু আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজার মানুষদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।
মানসিক কষ্ট
বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের রফিক বদরান তার চার সন্তানকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার চার সন্তান উধাও হয়ে গেছে। একটিও দেহ পাইনি। তারা কোথায় গেল—জানতে পারছি না।’
এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, গাজায় যুদ্ধের প্রভাব শুধু সংখ্যা নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবনের অব্যাহত ধ্বংস ও অসীম মানবিক সংকটের প্রতিফলন।