ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬

২১ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২০ সফর ১৪৪৮

চুক্তির ‘কাছাকাছি’, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান-ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০১:২০, ৬ আগস্ট ২০২৬

চুক্তির ‘কাছাকাছি’, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান-ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র

ছবি :সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির কাছাকাছি এসেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বিপজ্জনক সংঘাতপূর্ণ এ অঞ্চলটি নিয়ে সংকট নিরসনের আশা জেগেছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনায় থাকা প্রস্তাবিত চুক্তিটির উদ্দেশ্য হলো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ১৭ জুনের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল করা। চুক্তির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা। যুদ্ধ শুরুর আগে এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ করা হতো। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য বিষয়ে বড় পরিসরে আলোচনার সুযোগ তৈরি করাও এ চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় আশার কথা শুনিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘খুব ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা জানতে পারব। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা জানতে পারব।’

কোনো চুক্তি হতে যাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি খুব শিগগিরই খুলে যাবে অথবা তারা (ইরান) খুব কঠিন আঘাতের শিকার হবে। তারপরেই প্রণালিটি খুলে যাবে।

এদিকে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কথা অস্বীকার করে চলেছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়েও হরমুজ প্রণালি প্রবাহিত হয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘ইতিবাচক’ হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। যদিও ইরানের সেপাহ নিউজ একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক হুমকিই প্রধান বাধা।

হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের সংস্থা মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের উপকূলে একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জলপথটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল এখনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত। গত সোমবার (৩ আগস্ট) মাত্র আটটি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এই পরিস্থিতি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত তেলের দাম অত্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টার আগে মধ্যস্থতাকারীরা জলপথটি নিয়ে অন্তত একটি অস্থায়ী চুক্তি সম্পাদনে চেষ্টা করছেন।

কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুটি প্রশ্ন রয়েছে—একটি হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? অপরটি হলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে শুল্ক আরোপের অনুমতি দেওয়া উচিত কিনা?

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর পর থেকেই এ জলপথ নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এর জবাবে তেহরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়।

পরবর্তীতে ইরান জলপথটির কিছু অংশ পুনরায় খুলে দেয়। তখন তারা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের চারপাশে ইরানি জলসীমার মধ্যে উত্তর দিকের পথ ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে। এরপরেও ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের তেল রপ্তানি করতে সক্ষম।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তির মধ্যস্থতাকারীরা এখন এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যা ইরান ও ওমান উভয়ের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের সমাধানের পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরুর সুযোগ দেবে।

ইরান কী চায়?

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো নিরাপদ অভ্যন্তরীণ ও বহির্গামী জাহাজ চলাচলের পথ প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে সার্বভৌম অধিকার সমুন্নত রাখার পাশাপাশি ইরান ও ওমান উভয়ের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনা করা।

ইসমাইল বাঘাই বলেন, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উভয় পর্যায়েই আলোচনাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনও অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জলপথটি পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া, সামুদ্রিক পরিষেবা শুল্ক এবং বৃহত্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

তেহরান বলছে, তারা কেবল ওমানের সঙ্গেই আলোচনা করছে। সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে তারা কোনো আলোচনা করছে না। দেশটির কর্মকর্তা মনে করেন, ইরান ও ওমানের উচিত নিজ নিজ জলসীমা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনা করা এবং সেখানে নৌ-চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা।

এ ছাড়া ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা জাহাজের জন্য এক ধরনের শুল্ক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে।  আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুসারে, হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক প্রণালিতে যাতায়াতের জন্য টোল আরোপ করা যায় না, তবে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রদত্ত পরিষেবার জন্য মূল্য ধার্য করতে পারে। যদি উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো নৌ চলাচল সহায়তা, পাইলটেজ এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য কোনো পরিষেবা প্রদান করে, তাহলে তারা সেজন্য মূল্য নির্ধারণ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কী চায়?

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন চায়, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে জাহাজগুলোকে তেহরানের অনুমোদন নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা যেন না থাকে।  যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া, জলপথটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকুক।  একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে যেন কোনো শুল্ক দিতে না হয়। 

আলোচনা সম্পর্কে অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, চুক্তিটি সম্পন্ন হলে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের অনুমোদন বা জলপথটি ব্যবহারের জন্য কোনো মাশুল দিতে হবে না।  ওই কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিংটন আগের ব্যবস্থাটি ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে কোনো পক্ষই নৌপথটি দিয়ে যাতায়াতের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করত না।

গত সোমবার (৩ আগস্ট) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে জাহাজগুলোকে ইরানকে শুল্ক দেওয়ার বা দেশটির কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি তাদের টোল আদায় করতে দেব না।  যদি কেউ সেখানে শুল্ক আরোপ করে তাহলে আমরাও করব।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে আলাদা। 

রুবিও বলেন, একটি বড় চুক্তি আছে, যা তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে তাৎক্ষণিক যে চুক্তি এবং যেটির ওপর আপনারা অনেক মনোযোগ দেখেছেন, তা হলো এই প্রণালি।

আলোচনার টেবিলে কী আছে?

ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর প্রকাশ্য বক্তব্য সত্ত্বেও মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী আলোচকরা আরও আপসমূলক অবস্থানের দিকে এগোচ্ছেন।

সংঘাত চলাকালীন ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের সঙ্গে কথা বলেছেন।  অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, এই প্রস্তাব অনুযায়ী উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে একটি উত্তরের নৌপথ ব্যবহার করবে, আর উপসাগর ত্যাগকারী জাহাজগুলো ইরানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ওমানের জলসীমায় একটি দক্ষিণের পথ দিয়ে যাতায়াত করবে।

অ্যাক্সিওস জানায়, এই ব্যবস্থাটি প্রাথমিকভাবে ৬০ দিন স্থায়ী হবে এবং এই সময়ে কোনো ট্রানজিট ফি (টোল) নেওয়া হবে না।

দুজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এপি জানায়, আলোচনায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য পরিষেবা ফি এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বৃহত্তর চুক্তিও রয়েছে।  যুক্তরাষ্ট্র এটি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, জলপথটি কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আগে আলোচকরা প্রণালিটির কেন্দ্র থেকে নৌ-মাইন অপসারণ নিয়েও আলোচনা করছেন।

আলোচনার সঙ্গে জড়িত একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তেহরান ইতোমধ্যে উভয় দিকে নৌচলাচলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মূল দাবিটি প্রত্যাহার করেছে, তবে তাদের অবস্থান আরও পরিবর্তন করার সম্ভাবনা কম।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, আলোচনা একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং এখন দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া হাতের নাগালে রয়েছে।

একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সম্প্রচারকারী সংস্থাটি বলেছে, এই আলোচনার লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি নতুন মধ্যবর্তী করিডোর প্রতিষ্ঠা করা, যাতে অবশেষে বিদ্যমান উত্তর ও দক্ষিণ রুটগুলো ব্যবহৃত হবে এবং একই সঙ্গে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করবে ও উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের অধিকার রক্ষা করবে।

মূল মতবিরোধের বিষয়গুলো কী কী?

নতুন চুক্তির জন্য যে কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে।  সেই চুক্তির ৫নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বিনা খরচে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল।  তবে, চুক্তির অস্পষ্ট শব্দচয়নের কারণে প্রণালিটির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং জাহাজগুলো কোন পথ ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।

এই অস্থায়ী ব্যবস্থাটি বৃহত্তর শান্তি আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।  তাই, সর্বশেষ আলোচনায় জাহাজগুলোকে অবিলম্বে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া উচিত কিনা, তার চেয়ে প্রাথমিক ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কী হবে, তার ওপরই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন কেন ইরানের দাবিতে রাজি হতে পারে?

আরেকটি সংঘাত এড়ানোর জন্য ওয়াশিংটন ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।  মার্কিন গণমাধ্যম জানায়, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের বড় আকারের হামলা না চালানোর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

হরমুজ প্রণালি বেশি সময় বন্ধ রাখলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম এবং ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।  

এদিকে, তেল বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা চলতে থাকলে অনেক দেশ রেকর্ড হারে তাদের তেলের মজুত শেষ করে ফেলতে পারে, যা জ্বালানির দামকে অভূতপূর্ব পর্যায়ে বৃদ্ধি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সময় ফুরিয়ে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন একটি অস্থায়ী চুক্তিই শ্রেয়।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেছেন, এর অর্থ হলো, প্রণালিটি পরিচালনায় ইরানের যেকোনো ভূমিকা পালনে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের আরব উপদ্বীপ বিষয়ক প্রাসাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোশ বলেছেন, ‘এখানে যা সত্যিই প্রয়োজন তা হলো এমন এক ধরনের চুক্তি, যার মাধ্যমে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে—তারা ওমান বা আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরপেক্ষ বেসামরিক জাহাজগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করবে।’

ডেভিড ডেস রোশ বলেন, তাই যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তিতে সম্ভবত এই বাস্তবতাই প্রতিফলিত হবে, ইরানকে তার উপকূলের কোনো জলপথ পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সহজে বাদ দেওয়া যায় না। আমি মনে করি, একটি চুক্তির মোটামুটি রূপরেখা হলো, ইরান তার আঞ্চলিক জলসীমার এলাকাগুলোতে অবাধ আন্তর্জাতিক চলাচল বন্ধ করে দেবে। আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে সম্ভবত এর চেয়ে ভালো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

হরমুজ চুক্তি কি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের অবসান ঘটাতে পারে?

যদিও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার একটি চুক্তি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম প্রধান একটি উৎসে প্রশমিত হবে, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এটি তাদের বৃহত্তর মতবিরোধের সমাধান করবে না।

যদি নৌচলাচল পুনরায় শুরু হয়, তবুও আলোচকদের বৃহত্তর সমঝোতা স্মারকটি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং অবশেষে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ফিরতে হবে।

অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুগুলোও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে—লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত, এই অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলা এবং ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের কারণে লোহিত সাগরে নৌ-চলাচলে অব্যাহত বাধা, সেই সঙ্গে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত আচরণ এবং সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার প্রবণতা।

সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের একজন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবাস আসলানি বলেছেন, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং কূটনীতির মধ্যে দ্রুত পরিবর্তন এই অঞ্চলকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।  আমার মনে হয়, কয়েকদিন আগেও অঞ্চলটি একটি দ্রুতগতির রোলার-কোস্টারের মতো ছিল। সবাই একটি ব্যাপক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত ছিল।

আবাস আসলানি বলেন, হরমুজ নিয়ে একটি চুক্তি একটি ভালো সূচনা হলেও, … এটি জাদুকরীভাবে সব সমস্যার সমাধান করবে না।  বরং, এটি উভয় পক্ষকে পারমাণবিক বিষয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে কাজ করার আগে জুনের সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে I

সূত্র: আল জাজিরা

আরও পড়ুন