ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০০:৫০, ৬ আগস্ট ২০২৬
ছবি :সংগৃহীত
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শিক্ষা হলো বাংলাদেশকে কখনোই পরনির্ভরশীল ‘ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। তিনি বলেন, দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ‘বাংলাদেশ প্রথম’ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো বাংলাদেশকে আর কখনো সেই অবস্থায় ফিরে যেতে না দেওয়া।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে জুলাই অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের অসীম সাহস, নির্ভীক দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশপ্রেম আমাদের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আর যারা আহত হয়েছেন, তাদের ত্যাগ ও অদম্য মনোবল প্রজন্ম পর প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই বছর আগে দেশের পরিস্থিতি ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে নৃশংস সময়গুলোর একটি। তিনি বলেন, আমরা বাইরে থেকে দেখেছি, ছোট ছোট বাচ্চারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, প্রাণ দিচ্ছে, আহত হচ্ছে। তারপর একসময় পুরো ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হয়ে গেল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা ছিল সবচেয়ে নৃশংস সময়, স্বাধীনতার পর এমন কালো অধ্যায় আমরা আর দেখিনি।
ড. খলিলুর রহমান জানান, সে সময় জাতিসংঘের মহাসচিবের দপ্তরের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আগস্টের একেবারে শুরুর দিকে আমি জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। পয়লা আগস্ট আমি ইমোশনালি এতটাই কাতর হয়ে পড়েছিলাম, আমি জাতিসংঘের মহাসচিবের দপ্তরে ফোন করেছি। বাংলাদেশে এ ধরনের একটা ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না—সেই বিষয়টি আমি তাকে বলেছি।’
ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমার ধারণা, তিনি নিশ্চুপ বসে ছিলেন না। এর কিছুদিন পরেই দেখি যে অন্তত কিছু কিছু বাহিনীর ক্ষেত্রে গুলিবর্ষণ বন্ধ হয়েছে। আমার ধারণা, পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতেও সম্ভবত এর একটি ভূমিকা ছিল।’
জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাকে সরকারে যোগ দিতে আহ্বান জানান এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেন। তিনি বলেন, আমাদের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে (গণতান্ত্রিক) উত্তরণ সম্পন্ন করা। তিনটি কাজই আমরা করতে পেরেছি।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকরাও বাংলাদেশের সর্বশেষ নির্বাচনকে উৎসবমুখর ও সফল নির্বাচন হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থানও বদলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই বাংলাদেশ ফিরে আসছে দেখে আমরা খুব আনন্দিত।’
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আজকে প্রধানমন্ত্রী যে কথাটা বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের একটা বড় বিষয়ই হচ্ছে—আমরা বাংলাদেশকে একটা ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হিসেবে দেখতে চাই না। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাটাও সেই একই বার্তার প্রতিধ্বনি।
ড. খলিলুর রহমান আরও বলেন, শুরু থেকেই আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হচ্ছে—বাংলাদেশ প্রথম। আমরা সেই ক্লায়েন্ট স্টেটের পর্যায়ে কখনো ফিরে যাব না, আর কখনো নয়। এই কাজটার একটা বড় দায়িত্ব আমাদের ওপর। কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামনে থেকে নিশ্চিত করবে, আমরা আর কখনো যেন ক্লায়েন্ট স্টেট বা পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত না হই।
বিশ্ব পরিস্থিতিকে ‘জটিল’ আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা একটা জটিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থার মধ্যে আছি। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, বিভিন্ন স্থানে একতরফা পদক্ষেপ বাড়ছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙনও স্পষ্ট হচ্ছে।
এই জটিল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতির নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় নির্বাচন শেষে তিনি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানালে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে নির্দেশ দেন।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রকে বলেছিলাম, আপনি আমাকে এক অসম্ভব কাজ (ইম্পসিবল মিশন) দিচ্ছেন। উনি বললেন, ‘ইম্পসিবল মিশনের জন্যই তো ফরেন অফিস (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)।’
ইউএনজিএ সভাপতির নির্বাচিত হওয়ার সাফল্য প্রসঙ্গে ড. খলিলুর রহমান বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে এটি খুবই কঠিন পরীক্ষা ছিল। তার মতে, ওই সাফল্য প্রমাণ করেছে—জুলাইয়ের শহীদরা দেশের কূটনীতিকদের ওপর যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, তা পালনের সক্ষমতা ও দৃঢ় ইচ্ছা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন তিনি প্রথমে হাসপাতালে গিয়ে জুলাইয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ফিরে এসে আমি অধ্যাপক ইউনূসকে বলেছিলাম, “স্যার, আমরা যেন কখনো না ভুলে যাই, আমরা কী অবস্থায় তাদের রক্তের ওপর হেঁটে এসে এখানে বসেছি।” এ কথাটি যেন আমরা সবাই মনে রাখি।’
ড. খলিলুর রহমান আরও বলেন, ‘আমাদের এই ছেলেমেয়েগুলো ভয়াবহ এক দানবের হাত থেকে দেশটাকে ছিনিয়ে এনে আমাদের হাতে দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব ভালোবাসা, নিষ্ঠা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই দেশকে আগলে রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘জুলাইয়ের যে দায়, সেই দায়িত্ব কেউ যেন ভুলে না যান। প্রতিটি মুহূর্তে মনে রাখবেন, শহীদরা আমাদের হাতে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন।’