ঢাকা, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩, ১৪ সফর ১৪৪৮

সিপিডির গবেষণা

কৃষক থেকে খুচরা বাজারে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ০০:২০, ৩১ জুলাই ২০২৬

কৃষক থেকে খুচরা বাজারে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ

ছবি :সংগৃহীত

দেশের নিম্ন-আয়ের মানুষ আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই খাবার কিনতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থায় শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশন এজেন্ট ও অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। অর্থাৎ, কৃষক থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে খাদ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদায়ও কাটছাঁট করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে প্রকাশিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। এতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কৃষি অর্থনীতিবিদ এমএ সাত্তার মণ্ডল, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণায় বলা হয়, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের উপার্জনের অন্তত অর্ধেক খাবার কিনতেই ব্যয় করে। সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এ ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছে যায়। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে মানুষের প্রকৃত আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় খাদ্যের জন্য আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে পরিবারগুলো।

সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, খুচরা বাজারে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু উৎপাদন খরচ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশন এজেন্ট এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বা সিন্ডিকেট বাজারে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধামতো দাম নির্ধারণ করতে পারছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, চালের দামের পাশাপাশি কৃষক বা খামার থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছতে মসুর ডালের দাম ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজ ৮৭ শতাংশ, আলু ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচ ১১৬ শতাংশ, বেগুন ৭২ শতাংশ, ডিম ২৫ শতাংশ, গরুর মাংস ১৩ শতাংশ, মাছ ১০ শতাংশ ও ব্রয়লার মুরগির দাম ২২ শতাংশ বাড়ে।

গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এতে অনেককে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণ নিতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে, যেখানে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই পড়ছে।

গবেষণায় ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতারা প্রধানত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ও মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে। চালের ক্ষেত্রে উৎপাদক, ব্যাপারী, অটো রাইস মিলার, শহুরে আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতা- এই দীর্ঘ শৃঙ্খলে মিলারদের পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি।

তবে সিপিডি বলছে, সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ হলেই যে সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য কেবল মধ্যস্বত্বভোগীরাই দায়ী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বাজারের প্রতিটি স্তর যদি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সেই স্তরগুলোরও প্রয়োজনীয় ভূমিকা থাকতে পারে।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও পরে তা কমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর অন্যতম কারণ দেশে লজিস্টিক ব্যয় অত্যন্ত বেশি। বিশ্বে যেখানে লজিস্টিক ব্যয় গড়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ।

তিনি বলেন, টানা দুই বছর দেশে এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদিত হলেও কৃষক উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাননি। তবু তারা আবার আলু চাষ করছেন। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লজিস্টিক ও আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কোথায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করে। মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, ঘাটতি ও প্রতিযোগিতার অভাব-সব মিলিয়ে নানা কারণ কাজ করে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে ফড়িয়া, ব্যাপারীসহ একাধিক অংশীজন থাকায় প্রতিটি ধাপে দামের পরিবর্তন ঘটে।

আরও পড়ুন