আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০১:৫৬, ৪ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি :সংগৃহীত
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার (৩ জানুয়ারি) মধ্যরাতে দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালায় মার্কিনিরা।
এর কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে ভেনেজুয়েলা থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র আসলেই ডেল্টা ফোর্স পাঠিয়ে ভেনিজুয়েলার রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গিয়ে থাকলে-আধুনিককালের ইতিহাসে তা হবে নজিরবিহীন ঘটনা।
তবে এর সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ হতে পারে ১৯৮৯ সালে বিশেষ বাহিনীর অভিযানে পানামার সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করার ঘটনা।
লাতিন আমেরিকায় সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রথম নজির। দুজনই বিতর্কিত নির্বাচনে বিজয়ের দাবি করেছিলেন, দুজনের বিরুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল এবং দুজনের ক্ষেত্রেই এর আগে উলেখযোগ্য মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি দেখা গিয়েছিল।
ম্যানুয়েল নোরিয়েগা : পানামার সামরিক শাসক
নোরিয়েগাকে আটকের ঘটনা ঘটেছিল দুই দেশের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু পরিকল্পিত এক যুদ্ধের পর। যেখানে পানামার বাহিনী দ্রুত পরাজিত হয়। নোরিয়েগা তখন ভ্যাটিকানের দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং সেখানে ১১ দিন অবস্থান করেন। শেষ পর্যন্ত ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ কৌশল ব্যবহার করে।
বিশেষত দ্য ক্ল্যাশ, ভ্যান হ্যালেন ও ইউটু ব্যান্ডের উচ্চস্বরে রক সংগীত লাগাতার বাজিয়ে তাকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়। পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। নাগরিকদের সুরক্ষা, দুর্নীতি, অগণতান্ত্রিক শাসন ও মাদক পাচারের অভিযোগ তুলে এই হামলা চালায় মার্কিন প্রশাসন। এর আগেই ১৯৮৮ সালে মায়ামিতে নোরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র।
যেমনটি এখন মাদুরোর ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। নোরিয়েগা ১৯৮৫ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন।
একপর্যায়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নিলে ওয়াশিংটনের কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হয়ে ওঠেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর পানামা অভিযান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে ধরে নিয়ে বিচার করা হয় এবং তিনি ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে কারাবন্দি ছিলেন। পরে তাকে ফ্রান্সে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং সেখান থেকে আবার পানামায় পাঠানো হয়।
২০১৭ সালে পানামার কারাগারেই তার মৃত্যু হয়। নিকোলাস মাদুরোকে ধরতে পরিচালিত অভিযানের বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ পায়নি। তবে মনে হচ্ছে, এই অভিযান ছিল উচ্চাভিলাষী ও বড় পরিসরের। এখানে প্রচলিত স্থলবাহিনী ব্যবহার না করেই প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, তার পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কারাগারেই গিয়ে ঠেকতে পারে। মাদুরোকে বন্দি করার খবর অতীতের কয়েকটি বহুল আলোচিত ঘটনার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। এর আগেও অন্য দেশের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
সাদ্দাম: ইরাকে যুদ্ধ ও গ্রেফতার
ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর বন্দি করে মার্কিন বাহিনী। এর নয় মাস আগে ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এমন ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইরাক আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। একসময় সাদ্দাম ছিলেন ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।
বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধে। তবে ২০০৩ সালের যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, সাদ্দাম আল কায়দার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেন। তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইরাকেও কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র মেলেনি।
নিজ শহর তিকরিতের কাছে একটি গর্তে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় সাদ্দামকে আটক করা হয়। পরে ইরাকি আদালতে বিচারে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হয় এবং ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
হার্নান্দেজ : বিতর্কিত দৃষ্টান্ত
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরলান্ডো হার্নান্দেজের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলে আনে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তেগুসিগালপায় নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট ও হন্ডুরাসের বাহিনী।
মাদক পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং ২০২২ সালের জুনে তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই হন্ডুরাসের শীর্ষ কৌঁসুলি তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে দেশটিতে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি অস্থিরতা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনা সত্য হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অতীত সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতায় আরেকটি বড় সংযোজন হবে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা