আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২০:৪৭, ৭ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি :সংগৃহীত
অবশেষে গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেয়ার বিষয়ে নিজের প্রশাসনের ভিতরে আলোচনা শুরু হয়েছে মার্কিন প্রশাসনে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড দখলে বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে। বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস বলেছে, গ্রিনল্যান্ডকে অধিগ্রহণ করা ‘জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অগ্রাধিকার’। গ্রিনল্যান্ড হলো ন্যাটো সদস্য ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।
হোয়াইট হাউসের এই বিবৃতির কয়েক ঘন্টা আগে ইউরোপীয়ান নেতৃবৃন্দ যৌথ বিবৃতি দিয়ে ডেনমার্কের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ডেনমার্ক শুরু থেকেই ট্রাম্পের আর্কটিক দ্বীপটি অধিগ্রহণের আকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা করে আসছে।
সপ্তাহান্তে ট্রাম্প আবারও বলেন যে, নিরাপত্তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড ‘প্রয়োজন’। এর জবাবে ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করেন। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আক্রমণ হলে ন্যাটোর সমাপ্তি ঘটতে পারে। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস জানায়, প্রেসিডেন্ট ও তার দল এই গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিগত লক্ষ্য অর্জনে একটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন এবং অবশ্যই, সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা হলো সেই বিকল্পগুলোর একটি। এই সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রেসিডেন্ট নিজে। ফলে তার হাতে সবসময় এটা ব্যবহারের সুযোগ থাকে।
উল্লেখ্য, ন্যাটো হলো একটি আন্তঃমহাসাগরীয় সামরিক জোট। এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো বহিঃশত্রুর আক্রমণের ক্ষেত্রে একে অপরকে সহায়তা করার অঙ্গীকার করে। মঙ্গলবার ছয়টি ইউরোপীয় মিত্র দেশ ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। তারা যৌথ বিবৃতিতে বলে, গ্রিনল্যান্ড হলো তার জনগণের, এবং কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডই তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা আরও জোর দিয়ে জানায়, আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতোই উদ্বিগ্ন। তবে এটি অবশ্যই ন্যাটো মিত্রদের মাধ্যমে ‘সমষ্টিগতভাবে’ অর্জিত হতে হবে। এছাড়া তারা জাতিসংঘ সনদের নীতি- সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সীমান্তের অক্ষুন্নতা বজায় রাখার আহ্বান জানায়। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে ‘সম্মানজনক সংলাপের’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংলাপ হতে হবে এই সম্মানের ভিত্তিতে যে গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা আন্তর্জাতিক আইন ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার নীতিতে প্রতিষ্ঠিত।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ বিতর্কটি নতুন করে সামনে আসে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পর। সেখানে এই অভিযানের নিন্দা জানায় বেইজিং ও পিয়ংইয়ং। সেই অভিযানের এক দিন পর ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক মাধ্যমে আমেরিকার পতাকার রঙে রঙিন একটি গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্র পোস্ট করেন। ইংরেজিতে পাশে লিখেছেন- ‘সুন’। অর্থাৎ গ্রিনল্যান্ডেও একই রকম ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে শিগগিরই।
সোমবার স্টিফেন মিলার জানান, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা হলো ‘মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান’। সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একাধিকবার জিজ্ঞাসা করা হলেও তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেউ লড়াই করবে না।
রয়টার্সকে মার্কিন এক কর্মকর্তা জানান, বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড সরাসরি কিনে নেয়া, অথবা এর সঙ্গে ‘কমপ্যাক্ট অব ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন’ চুক্তি করা। এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, যা আমেরিকান জনগণ ও গ্রিনল্যান্ডের মানুষের জন্য উপকারী হবে। আমাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষরা ক্রমবর্ধমানভাবে আর্কটিকে সক্রিয় হচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও ন্যাটো মিত্রদের যৌথ উদ্বেগের বিষয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার কংগ্রেসে গোপন বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, প্রশাসনের গ্রিনল্যান্ড আক্রমণের পরিকল্পনা নেই। তবে ডেনমার্কের কাছ থেকে এটি কেনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক জানিয়েছে তারা দ্রুত রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করেছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বললে কিছু ভুল বোঝাবুঝির নিরসন হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর এরিক শ্মিট বিবিসিকে বলেন, তারা এখন কেবল আলোচনার পর্যায়ে আছে। আমার আশা- ইউরোপ বুঝবে যে শক্তিশালী আমেরিকা পশ্চিমা সভ্যতার জন্য ভালো।
ট্রাম্প তার প্রথম প্রেসিডেন্সির মেয়াদে গ্রিনল্যান্ডকে আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত ঘাঁটিতে রূপান্তরের ধারণা তোলেন। ২০১৯ সালে তিনি বলেন, মূলত এটি একটি বড় রিয়েল এস্টেট চুক্তি। ওদিকে, রাশিয়া ও চীনের আগ্রহ বাড়ছে দ্বীপটিতে। সেখানে রেয়ার আর্থ খনিজ বা বিরল খনিজ সম্পদের মজুদ আছে। বরফ গলতে থাকায় নতুন সমুদ্রপথের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। মার্চে ট্রাম্প বলেন, দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ পেতে যুক্তরাষ্ট্র যতদূর যেতে হয়, যাবে।
গত গ্রীষ্মে কংগ্রেসীয় শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে জিজ্ঞেস করা হয়, প্রয়োজনে গ্রিনল্যান্ড দখলে নেয়ার কোনো সামরিক পরিকল্পনা আছে কিনা। তিনি বলেন, যে কোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সাল থেকে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, যদিও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে। বেশিরভাগ গ্রিনল্যান্ডবাসী একদিন স্বাধীনতা সমর্থন করলেও, জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার ব্যাপারে তাদের বড় ধরনের বিরোধিতা রয়েছে। দ্বীপটিতে ইতিমধ্যে একটি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। ইলুলিসাতের ২৭ বছর বয়সী ইনুইট নাগরিক মর্গান আঙ্গাজু বিবিসিকে বলেন, বিশ্বনেতাকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে হাসতে শোনা ভয়ংকর ছিল, যেন আমরা কোনো বস্তু, যাকে দাবী করা যায়। তিনি বলেন, আমাদের ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডবাসীরা দাবি করে কালাল্লিত নুনাত। যার মানে গ্রিনল্যান্ডিকদের ভূমি।
তিনি আরও জানান, দুশ্চিন্তায় আছেন কী ঘটতে পারে সামনে। মাদুরোর মতো পরিণতির মুখে পড়বেন কিনা গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ‘আমাদের দেশ আক্রমণ করবে কিনা’ তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত।
সূত্র: বিবিসি,রয়টার্স